অন্ধের ভিক্ষা

-আমি অন্ধ। আমাকে একটু সামনের রাস্তাটা পার করিয়ে দিবেন প্লিজ?
.
নিজের অসহায়ত্বের কথা অনুধাবন করে, জানিয়ে, আপনার কাছে সাহায্য চাওয়া বয়স্ক অক্ষম মানুষটার প্রতি আপনার ক্ষুদ্র হৃদয়ের সীমিত মায়ার অনুভূতিতে কেমন ঝড় উঠে? কেন পরম মমতায় অচেনা মানুষটাকে আপনি অতি যত্নে পার করে দেন? ভাবুন।
.
আর সেই ক্ষুদ্র আপনার পরাক্রমশালী স্রষ্টা, সুমহান, নিঁখুত-পবিত্র মমতাময় রবের কাছে যখন আপনি নিজের অক্ষমতা আর অন্ধত্ব তুলে ধরে হাত ধরে পথটা পার করে দেয়ার অনুরোধ করবেন, তখন…

Posted in Uncategorized

কে উনি?

একটানে নিজেকে বিছানা থেকে তুলে চেয়ারে ছুঁড়ে দিলো সে। টেবিল ল্যাম্পটা জ্বালিয়ে নোটবুক আর পেন্সিল টেনে নিলো দ্রুত অথচ অভ্যস্ত হাতে। কাগজের সাদা পাতায় মনের চিন্তা আর কথোপকথনের ঝড়টাকে খসখস শব্দে বেঁধে ফেলতে হবে এখন একমনে। কাজটা হৃদয়ের খুব পছন্দের হলেও সহজ নয় কিন্তু। মাথার ভেতরের বিতর্ক যুদ্ধটা আবার শুরু হয়ে গেছে। সারাদিন কিছু না ঘটলেও ঘুমাতে এলেই মনের ভেতরের দু’টো কন্ঠ জেগে ওঠে ঠিকঠিক। একজন প্রশ্ন করতে থাকে, আরেকজন উত্তর দেয়। আবার কখনো উত্তরদাতা প্রশ্নের গুগলি ছুঁড়ে দেয়, প্রশ্নদাতা উত্তরের ব্যাটে বল হাঁকায়। এভাবেই চলছে গত তিন বছর ধরে। তবে গত পাঁচ দিন ধরে ব্যাপারটা একটু ভিন্ন। অবশেষে হৃদয় নিজেই প্রশ্নোত্তরের যুদ্ধটাকে উপভোগ করা শুরু করেছে। এটাকে আরো জমিয়ে তুলতে সে করছে কি, যুদ্ধ শুরু হলেই নিজের হাতে যত্নে বাঁধাই করা নোটবুকে 2B পেন্সিলে চিন্তাগুলোকে লাইনে লাইনে সাজিয়ে নোট করে ফেলছে। তো, এই হচ্ছে হৃদয়ের মাথার ভেতরে চলতে থাকা যুদ্ধের সংক্ষিপ্ত পটভূমি। এর চাইতে বেশি ভুমিকা দিতে গেলে হৃদয় কুমারের আজকের কথোপকথনটা আর লিখে রাখা হবে না।

– প্রাচ্যের-পশ্চিমের ইতিহাসবিদরা যেহেতু সাক্ষী দিচ্ছেন আর মুসলিম স্কলারদের রেকর্ড করে রাখা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে লেখা বায়োগ্রাফিগুলো সেই ইতিহাসকে আরো মজবুত ভিত্তি দিচ্ছে, সেহেতু পরিষ্কারভাবেই বুঝতে এবং মানতে বাধ্য হচ্ছি যে মুহাম্মাদ নামে একজন এসেছিলেন যার জীবনের কাজ, ঘটনা আর কথামালাকে অদ্ভুত কিন্তু কার্যকরী এক উপায়ে সংরক্ষণ করে রাখা হয়েছে প্রায় দেড় হাজার বছর ধরে। খুঁটিনাটি বিশ্লেষণ নিয়ে রচিত বইপত্র আর রিসার্চ আর্টিক্যালগুলো নিয়ে বিস্তারিত পড়াশোনা করার পর এটাও মানতে বাধ্য হচ্ছি যে তাঁর ব্যাপারে রেকর্ড করে রাখা ঘটনাবলী নিয়ে ইতিহাসবেত্তা এবং মেধাবী স্কলারদের করা ক্লাসিফিকেশানগুলো অসাধারণ এবং তুলনাহীন। ওরিয়েন্টালিস্ট গবেষকরা শত্রুপক্ষ হয়েও যেখানে সুশৃঙ্খল পদ্ধতি মেনে নথিবদ্ধ করা পরিচ্ছন্ন এই ইতিহাস আর বায়োগ্রাফিগুলো দেখে অবাক বিস্ময় প্রকাশ করেছেন, সেখানে আমি না মানার কে? কিন্তু তবুও আমার একটা প্রশ্ন আছে।

-কী সেটা?

-প্রশ্নটাকে সহজ করে এক কথায় এইভাবে বলতে হয়, কে এই মুহাম্মাদ? আর ভেঙ্গে ভেঙ্গে যদি বলি তাহলে জিজ্ঞেস করতে হয় সত্যিই কি তাঁর দাবী অনুযায়ী তিনি একজন নবী ছিলেন? একমাত্র স্রষ্টার নির্বাচিত বার্তাবাহক ছিলেন? কিভাবে এই দেড় হাজার বছর পরেও আমি নির্দ্বিধায় বুঝে নিতে পারবো যে তিনি মিথ্যে বলেননি? অথবা মস্তিষ্কের কোন সমস্যার কারণে তিনি নিজেই বিভ্রান্ত ছিলেন না?

-তোমার প্রশ্ন করার ক্ষমতা সত্যিই প্রশংসনীয়। একেবারে মূল তিনটি প্রশ্নই তুমি করে ফেলেছো। মজার ব্যাপার হচ্ছে, এই তিনটা প্রশ্নের উত্তর পেলেই উনার ব্যাপারে চুড়ান্ত সিদ্ধান্তে চলে আসা যায় চোখ বুজে। উত্তরটা আমার কাছে তৈরী আছে, কিন্তু সেই উত্তর বুঝে মেনে নিয়ে সত্যকে মাথা পেতে নিতে তুমি তৈরী কিনা, সেটাই হচ্ছে আসল প্রশ্ন।

-তৈরী থাকবো না কেন? স্রষ্টার অস্তিত্বের সত্যতা আর একত্বের অকাট্যতা বুঝে ফেলার পর আমি কি যাবতীয় বস্তুপূজা তথা সৃষ্টিপূজা ছেড়ে দিয়ে নিজেকে শুধু সেই এক ও অদ্বিতীয় স্রষ্টার আরাধনায় সঁপে দিইনি?

-দিয়েছো। তবে এই ধাপটা কঠিন। তোমার এই নিজেকে এক স্রষ্টার আরাধনায় নিজেকে সঁপে দেয়ার ব্যাপারটা সমাজ জানে না, জানলেও পরোয়া করে না, কারণ সমাজের নানা ধর্মের লোকেদের মাঝে এই স্রষ্টার ধারণাটা নতুন কিংবা অভিনব না। যেহেতু স্রষ্টার ব্যাপারটা তোমার পরিবার, আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব আর মহল্লাবাসীর সবার কাছেই প্রচলিত, অর্থাৎ সার্বজনীন, সেহেতু তুমি কোন ঝামেলা পোহাচ্ছো না। কিন্তু যখনই মুহাম্মাদের সত্যি সত্যি বার্তাবাহক হবার ব্যাপারটা তুমি বুঝে-সুঝে মেনে নেবে তখনই কিন্তু খবর আছে! আর সেজন্যই জিজ্ঞেস করতে হচ্ছে “সত্যকে জানার পর, বুঝে ফেলার পর সেই পবিত্র সত্যকে নিজের জীবনে-মননে মাথা পেতে মেনে নিতে তুমি আসলেই প্রস্তুত কিনা?”

-দাঁড়াও, দাঁড়াও। এত ভয় লাগাচ্ছো কেন বলতো? কেন বলছো যে মুহাম্মাদের ব্যাপারে প্রশ্নগুলোর উত্তর পেয়ে বুঝেশুনে উনার ব্যাপারে সত্যকে জীবনে মেনে নিলে “খবর আছে”?

-কারণ, উনার ব্যাপারে সত্যকে মেনে নেয়ার পর তুমি আর দশজনের মতো নিজের পশুত্ব আর বস্তুবাদী সত্ত্বার খাঁচায় আটকে থাকবে না। আমিত্বের খোলস ভেঙ্গে জন্ম নেবে এক নতুন তুমি। এই সত্য হচ্ছে পরশপাথরের মত। পাথরও এর পরশে স্বর্ণে বদলে যায়। আর তুমিতো মানুষ! বস্তুবাদী পশুত্বের খোলস ছিঁড়ে ভেঙ্গে তুমি তখন উনাকে ভালবেসে ফেলবে, হয়ে উঠতে চাইবে উনার মত অসাধারণ একজন, সত্যিকারের মানুষ হয়ে উঠতে চাইবে, নিজেকে দেখতে চাইবে, নিজের সত্ত্বাকে বুঝে চিনে নিতে চাইবে, নিজের আপাতঃ সীমানাকে নিজেই অতিক্রম করে নিজের সত্যিকারের সীমানাটা ছুঁয়ে দিতে চাইবে প্রাণপণে, তখনই সবার সাথে শুরু হয়ে যাবে সংঘর্ষ। সবাই যেখানে নিজের ইচ্ছার পূজো করে, নিজের বস্তুসত্ত্বা অর্থাৎ ইন্দ্রিয়পুজার মোহে ডুবে থেকে তৃপ্তি খোঁজে, তখন তুমি এই বস্তুর সার-সত্য বুঝে নিজের আত্মিক শক্তিকে উন্নত আর পবিত্র করে নিতে চাইবে ঠিক পথে, ইন্দ্রিয়ের ইচ্ছের পূজোকে পায়ে দলে পিষে সবরকম ইচ্ছে আর চাওয়াকে সত্যের কষ্টিপাথরে যাচাই করে একমাত্র স্রষ্টার সঠিক ইচ্ছে জেনে নিতে চাইবে এই মুহাম্মাদের দেখানো পথ ধরেই। ব্যাপারটা ইন্দ্রিয় আর বস্তুপূজারীদের প্রতিটা পদক্ষেপের উল্টো হবে। সবচাইতে বড় ইন্দ্রিয় আর বস্তুপূজারী অভিশপ্ত শাইত্বান তোমাকে আক্রমণ করবে তার সবরকম পৈশাচিক বাহিনী নিয়ে যে বাহিনীতে মানব-দানব দুই-ই আছে। পৌরাণিক কাহিনীর কুরুক্ষেত্রের কঠিন যুদ্ধে বর্ণিত অর্জুন-কৃষ্ণের মিলিত সাধনার চাইতেও কঠোর সাধনা তোমায় করতে হবে যদি জয়ী হতে চাও। আত্মীয়রূপী দুরাত্মা দূর্যোধন, শকুনী আর কংসমামা, ভীষ্ম আর দ্রোণাচার্য কিংবা কর্ণের মত কঠিন বিপর্যয়কেও মোকাবিলা করে তোমার হারাতে হবে। বড় কঠিন এ পথ। শুধু মুখের কথায় নয়, ঘামে-রক্তে-ত্যাগে এই পবিত্র সাধনার পথ জবজবে হয়ে ভিজে যাবে। কাউকে দেখাতে নয়, নিজের পথে, নিজের অর্জনকে নিজেই পরখ করে দেখে নিতে হবে। এই পথ নির্ভুল। কিন্তু পথ হিসেবে সবচাইতে সহজ। অথচ এই সহজতম পথটাকেই এত বছরের বস্তু আর ইন্দ্রিয়পূজার মাধ্যমে তুমি কিভাবে কঠিনতম বানিয়ে বসে আছো সেটাই তুমি টের পাবে পদে পদে। নিজের তৈরী কাঁটায় নিজেরই পা ফালাফালা হয়ে ক্ষত বিক্ষত হয়ে যাবে। হাঁটতে পারবে না। অসহ্য ব্যথায় কুঁকড়ে অবশ হয়ে কতবার অসহায় হয়ে এই পথের ধারে নিশ্চল হয়ে পড়ে রবে। এই পথে তুমি হয়ে যাবে একা। সবচেয়ে একা। তবুও চোখের পানি মুছে, পায়ের ক্ষত, গায়ের ব্যথা ভুলে একা একাই হাঁটতে হবে। হাঁটতে হাটতেই একসময় আবিষ্কার করবে এই পথে আসলে তুমি কখনোই একা ছিলে না। একাকীত্বের এই ব্যাপারটা শুধুই ছিলো অজ্ঞতাপ্রসূত, ইন্দ্রিয়ের দেখা। অন্তর্যামী যখন তোমার অন্তর্দৃষ্টিকে খুলে দেবেন, সত্যকে দেখিয়ে দেবেন, তখনই বুঝবে…

-কী বুঝবো?

-সত্যি বলতে কী, এটা শব্দে, কথায়, চিন্তায় কিংবা কোনরকম ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য অনুভূতি দিয়ে বুঝানো সম্ভব না। হাঁটতে হাঁটতেই বুঝতে পারবে। এভাবেই বুঝতে হয়।

-কিন্তু আমি আর তুমিতো এক। আমি যেটা জানি না, বুঝি না, সেটা ইতিমধ্যেই তুমি যেন জেনে বসে আছো!

-তুমিও জানো। সবার মতোই যে এই লেখাটা পড়ছে সেও জানে। ইন্দ্রিয়ের ইন্দ্রজালে পেঁচিয়ে হারিয়ে সে শুধুমাত্র এই জানার ব্যাপারটাই মনে করতে পারছে না। ইন্দ্রিয়ের ভ্রান্তি আর মায়ার ইন্দ্রজাল থেকে বেরুতেই তাই এই এক জীবন মরণপণ সাধনা। সত্যকে জানতে চাওয়া, জানার পর মেনে নেয়া। মেনে নিয়ে আরও জেনে হাঁটতে থাকা। গন্তব্যে পৌঁছানো পর্যন্ত সহস্র আঘাত বাঁধা পেয়েও থেমে না যাওয়ার এই পথতো সহজ নয়। তাই জিজ্ঞেস করছিলাম, সাহস আছেতো? তুমি প্রস্তুততো?

-হ্যাঁ, আমি প্রস্তুত। সত্য যত তেতোই হোক না কেন, যতই আমার অভিজ্ঞতা আর জ্ঞানের অপর্যাপ্ততায় কঠিন মনে হোক না কেন, সেই তিক্ততা আর কাঠিন্যকে অতিক্রম করে আমি এই সত্যকে বুঝে নিতে চাই, বুঝার পর মেনে নিতে চাই। বুঝলাম এই পথ কঠিন, ঘর্মাক্ত রক্তাক্ত কঠিন, তবু বলে রাখি, আমি এই কঠিনেরেই ভালবাসিলাম।

-আহ! আর কী চাই! তাহলে শুরু করা যাক।

-তোমার প্রশ্নগুলোকে গুছিয়ে লেখা যাক। মুহাম্মাদকে নিয়ে তোমার করা সবগুলো প্রশ্নের সারাংশ হচ্ছে এরকম-

১) তিনি মিথ্যাবাদী ছিলেন ২) অথবা মানসিকভাবে বিভ্রান্ত ছিলেন ৩) তিনি একইসাথে মিথ্যাবাদী এবং মানসিকভাবে সমস্যাগ্রস্থ ছিলেন ৪) অন্যথায় উনি সঠিক ছিলেন।

অর্থাৎ তুমি যদি প্রমাণ পেয়ে যাও যে তিনি মিথ্যাবাদী ছিলেন না, মানসিকভাবে বিভ্রান্তও ছিলেন না, তাহলেই কিন্তু প্রমাণিত হয়ে যায়, ফলে মেনে নিতে হয় যে তিনি যা বলেছেন বুঝেশুনে নিষ্ঠার সাথে সত্য বলেছেন। এতে কোন মিথ্যা নেই, ভ্রান্তি নেই, সংশয় নেই। ভাবলে বুঝতে পারবে, উনার ব্যাপারে তোমার যত প্রশ্ন, দ্বিধা আছে সবগুলোই তিনি মিথ্যাবাদী হওয়া অথবা মানসিকভাবে সুস্থ না থাকার অধীনে চলে আসে। কাজেই এইটুকু পরিষ্কার হওয়াই যথেষ্ট যে তিনি মিথ্যাবাদী ছিলেন কিনা, মানসিকভাবে সুস্থ ছিলেন কিনা, অথবা একসাথে দু’টোই ছিলেন কিনা। ঠিক?

-হুম্ম! জটিল ব্যাপার। একটু দাঁড়াও। ভাবতে হবে।… ওয়েইট ওয়েইট, তুমিতো ঠিকই বলেছ! যে প্রশ্নই করছি উনার বিরুদ্ধে, যেটাই মনে আসছে সেটাই দেখছি এই দু’টো কথাকেই ঘুরিয়ে ফিরিয়ে বলতে চাইছে। হয় বলছে যে তিনি মিথ্যাবাদী ছিলেন, আর নাহয় বলতে চাইছে যে তিনি মানসিকভাবে সুস্থ ছিলেন না। উফফফ, ভাবতেই শান্তি লাগছে এখন। আমিতো টেনশানেই পড়ে গিয়েছিলাম যে এত হাজার হাজার প্রশ্ন উনার বিরুদ্ধে, কোনটা দিয়ে আগে শুরু করবো! আর শুরু করলেও কয় বছর লাগবে এতগুলো প্রশ্নের উত্তর শেষ হতে! এত বিশাল সব সমস্যাকে যে এইভাবে দেড় লাইনে বেঁধে ফেলা যাবে সেটা কখনো কল্পনাই করিনি।

-ইউ আর মোস্ট ওয়েলকাম! বাই দ্য ওয়ে, এই কৃতিত্ব কিন্তু আমার না। এতদিন যে বইগুলো পড়েছি আর বিভিন্ন লেকচার শুনেছি, সেমিনারে গিয়েছি, নাস্তিক আর মুসলিমদের সাথে আলোচনা করেছি, কথাগুলো কিন্তু সব ওখানেই ছিলো। এতোদিন হয়তো খেয়াল করোনি, আজ তাই একটু ভাবতে বসেই অবাক হয়ে যাচ্ছো।

-হবে হয়তো। আচ্ছা, এ নিয়ে এতো ভ্যাজর ভ্যাজর না করে চল মূল কথায় চলে যাই।

-যাচ্ছি। দাঁড়াও। একটু ওয়াশরুমে যাওয়া দরকার।

ওয়াশরুম থেকে বের হওয়ার সময় হৃদয় ভাবছিলো ভাইয়ার সাথে আজকে যোগাযোগ করবে কিনা। ভাইয়া এমনিতে ওর সব কথা জানে। সবই শেয়ার করে সে ভাইয়ার সাথে। কিন্তু এই কথাগুলো এখনো বলা হয়নি। মূহুর্তেই একটা সিদ্ধান্ত নিয়ে নিলো সে। কথাগুলো ভাইয়াকে পাঠাবে সে। ভাবতে ভাবতেই আবার চিন্তাগুলোকে শব্দবন্দী করতে লাগলো হৃদয়।

-তো, যা বলছিলাম। উনার জীবনের সংরক্ষিত ঘটনাবলী থেকে যাচাই করে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখে জেনে নিতে হবে যে তিনি মিথ্যাবাদী ছিলেন, নাকি মানসিকভাবে ভারসাম্যহীন ছিলেন, নাকি দু’টোই ছিলেন একসাথে। অন্যথায় বুঝা যাবে যে তিনি ছিলেন একনিষ্ঠ একজন সত্যবাদী মানুষ। ঠিক?

-একদম।

-তাহলে প্রথমেই দেখা যাক তিনি মিথ্যাবাদী ছিলেন কিনা। এটা বুঝার জন্য চলে যেতে হবে উনার সমসাময়িক মানুষদের কাছে। জেনে নিতে হবে উনার সমসাময়িক মানুষজন উনাকে কী হিসেবে জানতো চিনতো।

-সমসাময়িক মানুষ বলতে কি উনার আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব আর পাড়া-প্রতিবেশীর কথা বলছো?

-ঠিক তাই। জানো, ওরা উনাকে ডাকতো “আল-আমীন” বলে? শব্দটা এরাবিক। ইংরেজীতে The Trustworthy। বাংলায় বিশ্বস্ত, সৎ এবং আমানতদার। খেয়াল কর, আমি ইংলিশে কিন্তু The দিয়ে বলেছি, শুধু Trustworthy বলিনি। অর্থাৎ যেকোন বিশ্বস্ত, আমানতদার বা Trustworthy নয়, বরং এমন নির্দিষ্ট একজন বিশ্বস্ত মানুষ যার মাঝে আমানতদারীতা পূর্ণতা পেয়েছে। কেমন পূর্ণতা? এ পূর্ণতা এমনই যে এখানে “আমীন” শব্দের আগে “আল” বসিয়ে মানুষটার সাথে এমনভাবে নির্ধারিত করা হয়েছে যে “আল-আমীন” বললে শুধুমাত্র এবং কেবলমাত্র আবদুল্লাহর ছেলে মুহাম্মাদকেই সবাই চোখ বুজে বুঝে নেবে, অন্য কাউকে নয়। এই সুযোগে জিজ্ঞাসা করি, তুমি কি জানো ওই সময়ের আরবদের ভাষার দক্ষতা কেমন ছিলো?

-আরবী ভাষার উপর? অবশ্যই তুলনাহীন। তৎকালীন আরবদের মাঝে সবচাইতে গর্বের বিষয়গুলোর একটা ছিলো আরবী ভাষায় গভীর দখল। ব্যাপারটা নিয়ে ওরা এত্ত সিরিয়াস ছিলো যে তাদের মাঝে ভাষায় যারা শ্রেষ্ঠ তারা মুখে মুখে অসাধারণ সব কবিতা বানিয়ে ফেলতো। কথায় কথায় ছন্দমাত্রা ঠিক রেখে কবিতা বানাতে পারা যে কী পরিমাণ কঠিন মেধা আর পরিশ্রমের কাজ তা ভাষা নিয়ে যারা কাজ করেনি তাদের পক্ষে বুঝে নেয়াটাও কম ঝামেলার না। শুধুমাত্র ছন্দমাত্রা ঠিক রেখে কবিতা বানালেই হবে না, কবিতার মাঝে শব্দের ব্যবহার কতটা যথাযথ, নির্ভুল এবং যৌক্তিক সেটারও তারা নিখুঁত বিশ্লেষণ করত, আলোচনা-সমালোচনা করত।

বলে রাখা দরকার, কাবা কিন্তু তখনও সবচাইতে সম্মানিত স্থান ছিলো আরবদের কাছে। পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে তখনও মানুষ ছুটে আসত কাবার প্রাঙ্গনে। শুধু কাবা নয়, কাবার দেখাশোনাকারীরাও ছিলো সবার কাছে সম্মানিত। সেই সম্মানিত কাবার গায়ে তারা সবচাইতে শ্রেষ্ঠ আর অসাধারণ কবিতাগুলোকে প্রদর্শনীর জন্য ঝুলিয়ে রাখত। এই কবিতাগুলো দেখতে পেত দুনিয়ার একেক প্রান্ত থেকে ছুটে আসা মানুষগুলো। নিঃসন্দেহে এটা ছিলো একজন কবির জন্য, এবং সেই কবির গোত্রের জন্য অসম্ভব সম্মানের ব্যাপার। এত বেশি সম্মানের যে এরকম একজন কবি হিসেবে যদি কেউ স্বীকৃতি পেত, তাহলে তার পুরো গোত্র তার সম্মানে ভোজ আর আনন্দ উৎসবের আয়োজন করতো। একটা গোত্রের মাঝে এরকম একজন কবির উত্থানটা অনেকটা আজকের যুগে নোবেল জয় করার মত একটা বিষয় ছিল বলা যায়।

আরবী ভাষায় এই সুনিপুণ দক্ষতা আর পান্ডিত্যের শিখরে পৌঁছানোর জন্য তারা যে কী পরিমাণ গুরুত্ব দিত আর পরিশ্রম করত সেটা বুঝানোর জন্য আরেকটা উদাহরণ না দিলেই নয়। মক্কা নগরী একটা মরুভূমি অঞ্চল হওয়ায় এখানকার লোকেরা মূলত ব্যবসার উপর নির্ভরশীল ছিল। বছরের দু’টো সময়ে, শীতে আর গ্রীষ্মে মক্কা নগরীর কুরাইশরা বাণিজ্যের জন্য সিরিয়া আর আবিসিনিয়ায় যেত। এই ব্যবসার উপরেই নির্ভর করতো তাদের সমগ্র অর্থনীতি। তো, ব্যবসার জন্য এই যে বছরে দুইবার বিদেশ যাওয়া, বিদেশী মানুষদের সাথে বেচাকেনার জন্য কথাবার্তা বলা, এর প্রভাব যে দৈনন্দিন জীবনের কথ্য আরবীতে গিয়ে পড়বে সেতো বলাই বাহুল্য। ভাষার দক্ষতা আর ব্যবহারের গভীরতা নিয়ে অসম্ভব সিরিয়াস কুরাইশরা তাদের ব্যবহৃত আরবীর উপরে এই প্রভাব চুপচাপ দেখবে, কিছু করবে না, এতটা উদাসীন হওয়াতো তাদের পক্ষে সম্ভব না! নিয়ম নাই। তাই যে ক’টা কারণে তারা তাদের সদ্য জন্ম নেয়া শিশু সন্তানকে গ্রামের বেদুইনদের কাছে লালন-পালনের জন্য পাঠিয়ে দিত, তার মাঝে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ছিল ভাষার বিশুদ্ধতার লালন আর সঠিক পরিচর্যা।

গ্রাম্য বেদুইনরা যেহেতু ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য বিদেশ যেত না, তাই স্বাভাবিকভাবেই এরাবিকের প্রতি সংরক্ষণশীলতা আর অতিযত্ন তাদের ভাষাকে আরো পরিশীলিত আর শানিত করত, নির্মল আর বিশুদ্ধ রাখত। এই পরিচর্যার কারণে আরবী ভাষা হয়ে উঠেছিল অসম্ভব সমৃদ্ধ, গম্ভীর এবং একই সাথে প্রবহমান। এই সমৃদ্ধ ভাষাচর্চার পরিবেশে যে শিশু বেড়ে উঠবে, কথা শিখবে, তার ভাষা যে নির্মল, সুন্দর আর বাঙময় হবে তা নিশ্চয়ই আর বলার অপেক্ষা রাখে না! ফলে, গোত্রে-গোত্রে, পরিবারে-পরিবারে গড়ে উঠতে লাগলো এরাবিকের একেকজন গুরু। এই ভাষাবিদ পন্ডিত সব দক্ষ আর খুঁতখুঁতে কবিদের মুখ দিয়েই যে মুহাম্মাদের জন্য “আল-আমীন” বিশেষণটা বেরিয়ে এসেছিল আর পুরো মক্কাবাসী সেই অনন্যতম বিশেষণকে এক বাক্যে মেনে নিয়ে উনাকে এই চরম সম্মানিত বিশেষণে ভূষিত করেছিল, ইতিহাসের এই দ্ব্যর্থহীন সাক্ষ্য আমার কাছে এত্ত বেশি অবাস্তব লাগে যে বিস্ময়ে হা হয়ে যাই মাঝে মাঝে।

-কেন? অবাস্তব মনে হয় কেন?

-হবে না কেন? আমাদের এলাকার কাউকে যদি আমরা সবাই মিলে এরকম একটা বিশেষণ দিই সেটা কখন দিব? কেমন মানুষকে দিব? গভীরভাবে ভাবো। আর এলাকার ভাল-খারাপ সব মানুষ যদি সেই বিশেষণকে এক বাক্যে বিনাতর্কে মেনে নেয়, তার উপরে তাকে সেই বিশেষণে ভালবেসে ডাকতেও শুরু করে, এটা সেই বিশেষণকে যথার্থতাকে কোন পর্যায়ে নিয়ে যায় বুঝতে পারছ? আমার এলাকার কাউকে নিয়ে এমন ভাবনা আমার কাছে এতোটাই অসম্ভব মনে হচ্ছে যে আমি আসলে ব্যাপারটা কল্পনাও করতে পারছি না। তো, এক্ষেত্রে আমার কাছে একজন মানুষের এমন জীবনের সবচাইতে বড় সাফল্য আবার একই সাথে চরম অবাস্তব আর বিস্ময়কর মনে হবে না, বলো? আবার অবাস্তবও বলি কী করে? কারণ ইতিহাস এই তথ্যের ব্যাপারে এত শক্তভাবে সাক্ষী দিচ্ছে যে এটা ধ্রুবসত্যের মত এই হাজার বছরকে হারিয়ে দিয়ে আজও জ্বলজ্বল করছে। আজিইইব!

-তাহলেতো তুমি বুঝেই ফেললে যে এই মানুষটার আমানতদারীতা, বিশ্বস্ততা আর সততা কোন পর্যায়ের ছিল। উনার সততা নিয়ে তোমার মধ্যেতো অন্তত আর কোন দ্বিধা থাকা উচিৎ নয়।

-কিন্তু আছে যে!

-ওমা! কেন?

-দেখ, চল্লিশ বছর বয়সে উনি এক বিশাল অলৌকিক অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হন। ইতিহাস এভাবেই বলছে ব্যাপারটা। সেই অভিজ্ঞতায় ওলট-পালট হয়ে যান মানুষটা। এতক্ষণতো আমরা উনার চরমতম সততা আর অন্যান্য অনন্য সব গুণের স্বীকৃতিস্বরূপ নগরবাসীর পক্ষ থেকে উনাকে দেয়া “আল-আমীন” উপাধির ভাষাতাত্ত্বিক আর ইতিহাসভিত্তিক আলোচনা করলাম। ঠিক?

-ঠিক।

-দেখ, সেই একই গুণ, একই শক্তিশালী বিশেষণধারী অনুপম আর কোমল চরিত্রের মানুষটার সাথে তাঁর সমাজ কেমন আচরণ করেছিল। এই বিচিত্র আর অদ্ভুত অভিজ্ঞতাপ্রাপ্তির পর তিনি যখন নিজেকে এক স্রষ্টার নির্বাচিত বার্তাবাহক হিসেবে ঘোষণা দিলেন, উপাস্যের জায়গায় শুধুমাত্র এক স্রষ্টাকে স্থান দিয়ে বাদবাকি সবকিছু উপাস্য হিসেবে মিথ্যা আর উপাসনার অযোগ্য বলে জানিয়ে দিলেন, তখন কিন্তু সবাই মুখ ঘুরিয়ে নিল, শুরু করল চরমতম বিরোধিতা। এটা কি স্ববিরোধী না?

-কখনোই না। তোমার কাছ থেকে এত অগভীর মন্তব্য পেয়ে অবাকই হয়েছি আসলে। ঠান্ডা মাথায় চিন্তা করে দেখ, সত্যটা তোমার তেতো লাগায়, মন মত না হওয়ায় তুমি যদি মানতে না চাও, সেটা একান্তই তোমার নিজস্ব চারিত্রিক সমস্যা। সত্যবাদী আর তাঁর বলা সত্য তাতে কি মিথ্যা হয়ে যায়? কক্ষনো না।

দেখ, সবাই নিজের ইচ্ছা আর ইন্দ্রিয়পূজার বিরুদ্ধে গিয়ে সত্যকে মেনে নেয় না, নেয়নি, নিবে না। তুমিও সেই দলের যেন না হও সেজন্যেই আলোচনার শুরুতে তোমাকে বলতে চেয়েছিলাম, জীবনের উদ্দেশ্য আর সেই উদ্দেশ্যের সাথে জড়িত সত্যগুলো বড় কঠিন। তোমার জীবনের সব চিন্তাচেতনা, অভিজ্ঞতা আর দর্শনকে এই সত্য এক ধাক্কায় উল্টেপাল্টে এলোমেলো করে দেবে। জিজ্ঞেস করেছিলাম, সত্য জানার পর, এর ধাক্কাটা খাওয়ার পর, অবিরাম যন্ত্রণার দূর্গম রাস্তাটা বুঝে নেয়ার পর সেই রাস্তাকে মেনে নিবে কিনা, নিজেকে সত্যের একনিষ্ঠ সাধক হিসেবে পুরোপুরি সমর্পন করবে কিনা। তুমি কিন্তু উত্তর দিয়েছো। বলেছ, তুমি প্রস্তুত। তুমি তৈরী। এটা তোমার চরিত্রে সযত্নে গড়ে তোলা সততা আর সাহসের প্রকাশ। নিষ্ঠাপূর্ণ সচেতন জবাব। তোমার অন্তর সত্যকে গ্রহণ করতে প্রস্তুত, সেটা নিজের খেয়াল-খুশি অনুযায়ী জীবনকে উদ্দাম ভোগ করবার তীব্র ইচ্ছাকে বিসর্জন দিয়ে হলেও। সব হৃদয়তো এমন সাহসী নয়। এখন যেমন সাহসী আর নিজের প্রতি সৎ আর সুবিচারক নয়, তখনও ছিল না। নিজের সাবলীল সুন্দর আরামের জীবনে ধাক্কা খেয়ে এক কথায় সত্যকে মেনে নিবে, মাথা নুইয়ে দিবে, এমন মানুষ এই ইন্দ্রিয়পূজা আর চরম ভোগবাদী যুগে খুবই বিরল।

এদের কথা বাদ দিলাম। এমনকি যারা সত্যকে চিনে, বুঝে, নিজেকে সমর্পনকারী হিসেবে ঘোষণা দিয়ে থাকে, তাদের বেশিরভাগের দৌড়ই কিন্তু ওই মৌখিক কিংবা লিখিত ঘোষণা পর্যন্ত। নিজের জীবনে, কাজে-কথায় ভারসাম্য রক্ষা আর সত্যের প্রতি সুবিচার খুব খুব মানুষই করে। করতে চায়। সেটা মানুষের দোষ। চরিত্রের দূর্বলতা। মানসিক অক্ষমতা। মানুষের আত্মপূজা আর লোভের ফলাফল। এই দোষ সত্যের আর সত্যবাদীর নয়। কক্ষণো নয়। আশা করি বুঝাতে পেরেছি।

-হ্যাঁ, বুঝেছি। অনেক ধন্যবাদ এই উলটাপালটা বুঝের ফাঁদ থেকে আমাকে তুলে আনার জন্য। মূল আলোচনায় ফিরবো?

-অবশ্যই।

-থ্যাঙ্কস। বলছিলাম যে নিজেকে এক স্রষ্টার নির্বাচিত বার্তাবাহক হিসেবে দাবী করবার আগে উনাকে সবাই আমানতদার, বিশ্বস্ত আর সবচাইতে সৎ হিসেবে স্বীকৃত দিত। বুঝলাম। কিন্তু এই দাবীর পর? বার্তাবাহক হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার পর? এমন যদি হয়, এই দাবীটাই ছিল উনার জীবনের প্রথম অসততা, তখন? যেটা ঐ সময়ের লোকেরা বুঝতে পারায় তাঁকে মানতে চায়নি। এমন হতে পারে না?

-না পারে না। ইতিহাস দেখ। তাহলেই বুঝতে পারবে। খেয়াল করলে দেখবে উনাকে সবাই নানারকম বিশেষণে ডাকা শুরু করলেও মিথ্যাবাদী বলে কেউ ডাকেনি। পাগল ডেকেছে, জাদুকর বলে গুজব ছড়িয়ে সত্যকে ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টা করেছে, কিন্তু মিথ্যাবাদী ডাকেনি।

আর তুমি শুধু মনগড়া নেতিবাচক দিকটাই নিজে নিজে ভেবে নিচ্ছ, অথচ পরিস্কার আর স্বচ্ছ ইতিহাস নিয়ে ঠিকমত ভাবছ না! কী অদ্ভুত! এটা কিন্তু তোমার বুদ্ধিমত্তা আর সততার পরিচয় হল না। একটা ব্যাপার তুমি কেন খেয়াল করছ না? সেটা হচ্ছে, উনাকে কিন্তু সবাই শুরুতেই অস্বীকার করেনি। অনেকেই উনার দাবীর স্বীকৃতি দিয়ে উনাকে মেনে নিয়েছিল একেবারে প্রথম থেকেই।

-আরে, এটাতো চোখে পড়েনি! জানতাম, কিন্তু মানুষের বিরোধিতা আর অত্যাচারগুলোই বেশি বেশি মাথায় ঘুরছিল।

-এমনই হয়। চোখ বুজে ভাবো, সবচাইতে বৈরী আর প্রতিকূল পরিবেশে, নিজের আর পরিবারের সদস্যদের জীবন বাজি রেখে, অত্যাচারের মুখে নিজের জীবন বিলিয়ে দিয়েছে কিন্তু উনার উপরে আস্থা হারায়নি এরকম উদাহরণগুলো নিয়ে ইতিহাস আজও চিৎকার করছে, রক্তে রক্তে জমীন ভিজে গেছে, অথচ তোমার চোখে পড়ছে না! সিরিয়াসলি! কী হয়েছে তোমার চোখে? প্লিজ অন্ধের মত প্রশ্ন করো না। জানো, দেখো, ভাবো। পরিচিত মানুষগুলো উনাকে বিশ্বাস করেছে, আমৃত্যু আস্থা রেখেছে, এমনকি নিজের জীবননাশের সময়ে, খুন হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনায়ও এই মানুষগুলো সুবিশাল হিমালয়ের মত অটল ছিল, অবিচল ছিল। অত্যাচারে, নিপীড়নে ভেঙ্গে গেছে, মরে গেছে, তবু মচকায়নি এই মানুষ হয়ে ওঠা আশ্চর্য প্রাণগুলো। ভাবো প্লিজ।

ভেবে দেখ, এই যাচাই করে নেয়া অবিচল বিশ্বাসের ইতিহাস আর আস্থার জায়গাটা, কষ্টিপাথরে পরখ করে বুঝে মেনে নেয়া সত্যের উপরে জীবনকে আক্ষরিক অর্থেই বাজি রেখে, মৃত্যুর শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত অটল নির্ভরতার মর্মটা বুঝতে পারলেতো তোমার অন্তরাত্মা থরথরিয়ে আমূল কেঁপে উঠার কথা, তাই না?

এই ভয়ংকর অত্যাচার আর আত্মত্যাগের মধ্য দিয়েও সত্যকে বুঝবার, মৃত্যুর মত ভয়াবহ আর চরমতম দুঃসহ পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েও সত্যকে বুঝে, মাথা পেতে মেনে নিয়ে দাঁত কামড়ে আঁকড়ে ধরবার, অটল থাকবার উদাহরনগুলো যদি আজ তোমাকে না ভাবায়, না কাঁদায়, বিচলিত না করে, তাহলে আমার সন্দেহ হয়, তোমার অন্তরাত্মা আছে তো? থাকলেও কি জীবিত আছে আর? ভাবো। প্লিজ। প্রশ্ন যদি করতেই হয়, তাহলে নিজের সততাকে প্রশ্ন কর, সন্দেহ যদি করতেই হয় তাহলে নিজের চারিত্রিক দৃঢ়তা আর অন্তরের দৃষ্টিকে বিচারের কাঠগড়ায় তোল। উত্তর পেয়ে যাবে। নেতিবাচক সব বানোয়াট ভাবনা দিয়ে মনটাকে কলুষিত করে হয়রান না হয়ে, ইতিহাসের দিকে তাকাও। খোলা চোখ নিয়ে তাকাও আর খোলা মন নিয়ে ভাবো। ঠকবে না।

-এভাবে আর বকা দিও না প্লিজ। আমি ভাবছি। ভাববো। কথা দিয়েছি।

-ঠিক আছে। আরও আছে, নগরীর এই মানুষগুলোর পাশাপাশি নিজের পরিবার আর বন্ধুবান্ধবদের মাঝে এমন সব মানুষ উনাকে, উনার দাবীকে মেনে নিয়েছিল, যাদের মেনে নেয়াটাও প্রমাণ করে দেয় যে উনি তখনও পুরোপুরি সত্যবাদী, আমানতদার আর বিশ্বস্ত ছিলেন। উনার চরিত্রে, মানসিক স্বাস্থ্যে এবং দাবীতে কোন খুঁত-ভুল ছিল না।

-পুরোপুরি বুঝলাম না। মানসিক স্বাস্থ্যের কথাও নিয়ে এসেছ এইখানে। বিস্তারিত বুঝিয়ে বলবে প্লিজ?

-অবশ্যই বলব। তবে, একটু ক্লান্ত লাগছে। ওয়েইট।

ভাইয়ার মুখে ক্লান্তি থেকে হাসি, হাসি থেকে উত্তেজনা আর সেখান থেকে একরাশ আনন্দকে গলা দিয়ে বেরিয়ে আসতে শুনলো হৃদয়।

-তুই তো দেখি মাথার ভিতরের তর্ক ভাবনার সবই লিখে ফেলতেসিস! ক্যামনে কী?

পুরোটা পড়া শেষে নোটবুকটা হৃদয়ের হাতে তুলে দিতে দিতে বললো ভাইয়া। এই ভাইয়াটা হৃদয়ের আপন মায়ের পেটের ভাই না হলে কী হবে, পেটের নাড়িভুঁড়ির সবকিছু এই ভাইয়াকেই বলে সে। ব্লগে ভাইয়ার লেখালেখির কারণে ভাল লাগা, এরপরে ইমেইলে যোগাযোগ, অতঃপর একদিন সামনাসামনি দেখা। খুবই ইন্ট্রোভার্ট হওয়ায় অপরিচিতদের সামনে একদমই আসতে চান না ভাইয়া, কিন্তু কিভাবে কিভাবে যেন হৃদয়ের সাথে দেখা আর কথা হয়ে গেল। আর সেই থেকেই ভাবনা-চিন্তা আর ধর্মের সত্যতা নিয়ে পড়াশুনার আগ্রহের মিলের কারণে সিনিয়র-জুনিয়র বন্ধুতা। সবকিছুই তাই প্রাণখুলে ভাইয়াকে বলা হয়। উনিও শুনেন। আলোচনা করেন লজিককে সামনে রেখে। শিক্ষক বলেই হয়তো কথা শুরু হলে আর থামে না ভাইয়ার। নদীর মত কথার স্রোত বইতেই থাকে একের পর এক, আর হৃদয়ও কেন যেন তন্ময় হয়ে শুনে। হারিয়ে যায়।

-লিখতেসি ঠিক আছে, বাট এখন মনে হইতেসে কারও সাথে কথা বললে, আলোচনা করলে আরও বেশি ভাল হইত। সেইক্ষেত্রে আপনারে ছাড়া আর কাউরে ঠিক ভরসা করতে পারতেসি না।

-ঠিক আছে। কিন্তু আমিতো মুসলিম। আমিতো পক্ষেই কথা বলবো, তাই না। তোরতো নিউট্রাল কাউরে ধরা উচিৎ ছিল।

-কেউই নিউট্রাল না আসলে ভাইয়া। দিনশেষে সবাই খালি নিজেরটাই বলে, এরপর চাপায়ে দিতে চায়। না মানলে এরপরে রাগ করে। বাট আপনারে কোনদিন চাপাচাপি করতে দেখি নাই। বলসেন, আলোচনা হইসে। ভাবাইসেন। আলোচনার টাইম না থাকলে বই ধরাই দিসেন। পরে সেইটা নিয়া প্রশ্নের উত্তর দিসেন। এই সবের জন্যে আপনার কাছে ভাই আমি কৃতজ্ঞ।

-বইতো বহুত দিসি। কিন্তু বেশি উপকার হইসে কোনটাতে?

-সবগুলাতেই। তবে রিসেন্ট বইগুলার মধ্যে ডাবল স্ট্যান্ডার্ড, প্যারাডক্সিক্যাল সাজিদ, অন্ধকার থেকে আলোতে, আর্গুমেন্টস অব আরজু, রেইনড্রপ্সের সীরাহ আর মাজিদা রিফার লেখা মহানবী বেশি দাগ কাটসে। গুরুদত্ত সিং এর লেখা ছোট্ট বই তোমাকে ভালবাসি, হে নবী পড়ে ফেলেছি তাই এক বসাতেই, আর বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেছি। বাধ্য হয়ে সত্যটাকে ভালভাবে বুঝার জন্য বিখ্যাত The Sealed Nectar আর আলী সাল্লাবীর The Noble Life of The Prophet পড়ে ফেলসি আগাগোড়া, খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে। সবমিলায়ে ভিতরে এক বিশাল উথাল পাথাল শুরু হইসে, কিন্তু শান্তি পাইতেসি না কোনভাবেই।

-বেশি পড়তেসস, ঢেউতো উঠবেই নিউরণে। শান্ত হবার সময়তো দে!

-সেটা আর পাচ্ছি কই। দেখতেসেন না, মাথার ভিতরের ঝড় গুলা একের পর এক লেখা শুরু করসি। বাট পোষাইতেসে না ভাইয়া। চিন্তার স্পীডের সাথে লেখার স্পীড মিলতেসে না। লাস্ট টাইমতো টায়ার্ড হয়ে টেবিলেই…

-কিন্তু বিশ্বাস কর, ভাল লিখতেসিলি। অন্তত নিজের চিন্তাগুলার গুছানো গতিপথ পরে দেখে মজা পাইতি। যাইহোক, যে জায়গায় থামসস, তারপরে আর কী ভাবলি?

-আর ভাবলাম কই? সকালে উঠেই তো নাস্তা করতে করতে আপনারে কল দিয়ে নোটবুক বগলে নিয়ে সোজা এইখানে।

-আজকে না তোর গীটারের ক্লাস ছিল?

-ছিল। বাট যাচ্ছি না আর। শখ পুরণের জন্য শিখসিলাম। নিজের জন্য বাজাইতে পারি। হইসেতো। আর কী লাগে?

-এখানে আসার আগে সিগারেটটাতো অন্তত না খাইতে পারতি। জানস যে আমার কষ্ট হয়।

লজ্জায় জিভ কাটল হৃদয়। এতবার ট্রাই করে সে, তাও মনে থাকে না। ভাইয়া প্রায় এক দশক আগে নাস্তিকতা ছেড়ে মুসলিম হয়েছেন। বছর দেড়েক হয়েছে সিগারেট খাওয়া ছেড়ে দিয়েছেন। উল্টাপাল্টা কিছু খেলে, শুনলে কিংবা বললে উনার সাধনা আর প্রাপ্তির ক্ষতি হয় নাকি! ভাইয়া অবশ্য “সাধনা” বলেন না। কিন্তু শব্দটা এখন মনেও যে আসছে না! লজ্জায় হেট হওয়া মাথাটা না তুলেই হৃদয় বললো,

-স্যরি যে বলব, সেই মুখও নাই।

-বাদ দে! বার্তাবাহক-শিক্ষক হিসেবে সিলেক্টেড হবার পর রাসুলুল্লাহ সল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লামের বিশ্বাসযোগ্যতা আর সততা নিয়ে ভাবতেসিলি। এইটাও বুঝছস যে অন্যের এক্সেপ্টেন্সের উপরে কারো সততা নিরূপণ করাটা ভুল। উনার সততা নিয়ে বার্তাবাহক হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার পরেও যে ওই সময়ের মানুষদের মনে কোন সন্দেহ ছিল না, তার সবচাইতে বড় প্রমাণ কী জানস?

-কী?

-দিনরাত উনাকে উনার বার্তার যে সত্যতা, সেই সত্যতার তীব্রতার কারণে অস্বীকার করলেও দিনশেষে আস্থার জায়গাটা উনার উপরেই ছিল তখনও। উনাকে যখন রাস্তাঘাটে, পাবলিক প্লেইসে শারিরীক নির্যাতন, অপমান করা শুরু হয়, উনার চরিত্র আর ঘটনাবলীর সত্যতা বুঝে শুনে জীবন বাজি রেখে উনাকে বিশ্বাস করা মানুষগুলোর উপরে যখন একের পর এক অমানুষিক নির্যাতনের স্টীমরোলার শুরু হয়, উনার বিশ্বস্ত সাথীদেরকে পাবলিকলি মার্ডার পর্যন্ত করতে যখন মানুষগুলোর হাত কাঁপে না, অন্তরে দ্বিধা আসে না, এমনকি যখন রাতের অন্ধকারে উনাকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে গোপনে চিরতরে শেষ করে দেয়ার ফাইনাল প্ল্যান বাস্তবায়ন করতে আসে, ঠিক তখনও দেখা যায় যে উনার কাছে মক্কার অবিশ্বাসীদের পক্ষ থেকে গচ্ছিত রাখা আমানত, আর উনি সেই আমানত ক্যামনে আমানতের আসল মালিকের কাছে পৌঁছায়ে দিবেন সেইটা নিয়ে চিন্তিত। শেষ পর্যন্ত ছোটবেলা থেকে একসাথে বেড়ে ওঠা মানুষ-মাটি-কা’বা, আত্মীয়-স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশি, ভিটেমাটি, সহায়-সম্পত্তি সব ছেড়ে যখন তিনি নগরী ত্যাগ করছেন খুনিদের খোলা তলোয়ার এড়িয়ে, তখনও কিন্তু উনি উনার কাছে গচ্ছিত রাখা সম্পদগুলো ঠিক জায়গায় পৌঁছে দেবার ব্যবস্থা করতে ভুলেননি। উনি যদি সৎ না হতেন, তাহলে কি একজন সত্য নবী, সত্য বার্তাবাহকের মত এইখানেও সুবিচার নিয়ে মাথা ঘামাতেন, নাকি আর দশটা মানুষের মত স্বাভাবিকভাবেই প্রতিশোধ নেয়ার জন্য হলেও আমানতগুলো সব নিয়ে… মন দিয়ে ভেবে দ্যাখ। ঠান্ডা মাথায়।

শুধু তাই না, যাকে আমি মানিই না, যার মেসেজ আমি অবিশ্বাস করি বলে ঘোষণা দিচ্ছি, তা আসলে কেন দিচ্ছি? নিজের মন-চাহি ভোগবাদী জিন্দেগীর বিরুদ্ধে বলে, নাকি সমাজপতিদের অত্যাচারের যে খড়গ আমার ঘাড়েও নেমে আসবে, আমারও যে উনার সঙ্গি-সাথীদের মত নগরছাড়া উদ্বাস্তু হয়ে অন্য কোথাও আশ্রিত হতে হবে রোহিঙ্গাদের মত, সেইজন্যে? উনার কথা যদি সত্যি নাই হয়, উনি যদি মিথ্যাবাদীই হয়, তাহলে এমন একটা লোকের কাছে কি আমি আমার মূল্যবান সব জিনিসপত্র আমানত হিসেবে গচ্ছিত রাখবার কথা? মুখে বলছি যে তাঁর কথায় আমি বিশ্বাস করি না, অথচ দামী সম্পদ গচ্ছিত রাখবার সময় তাঁকে ছাড়া আর কাউকে পেলাম না?

এই ঘটনায় দুইটা দিক থেকেই কিন্তু প্রমাণ হয়ে যাচ্ছে যে নবীজি সল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার সততা আর সুবিচারের পয়েন্ট থেকে কখনোই নড়েন নাই, এত ভয়ংকর নির্যাতন আর দুঃসময়েও না। ক্লিয়ার?

-হ্যাঁ, ক্লিয়ার। দুইটা দিক মানে অবিশ্বাসীদের মুখে অবিশ্বাস সত্ত্বেও তাদের কাজেকর্মে এটাই প্রমাণ পাচ্ছি যে ওরা উনাকে ছাড়া আর কারো উপরেই এত্ত ভরসা আর আস্থা রাখত না। কার্যত যাবতীয় আস্থা আর বিশ্বাসের জায়গা অন্তরের মাঝে উনার জন্যেই ছিল, যদিও পলিটিক্যাল সিচুয়েশান, সাথে ব্যক্তিগত চারিত্রিক দূর্বলতার কারণে উনাকে নিজেদের লাইফে মেনে নিতে পারতেসিলো না।

আর দ্বিতীয়ত, জীবনের সবচাইতে ভয়াবহ মূহুর্তেও উনি আদর্শিক জায়গা থেকে নড়েন নাই, তাদের আমানত নিয়ে ভেগে যাওয়াটা যেখানে একটা সাধারণ মানুষের পক্ষ থেকে খুবই স্বাভাবিক রেসপন্স ছিল, সেইখানে উনি কাজিন ‘আলীকে দিয়ে আমানতের সম্পদগুলা ঠিক জায়গায় পৌঁছানোর ব্যবস্থা করসেন। আসলেই আজীব সুন্দর এক চরিত্র বলতে হচ্ছে উনাকে ভাই! এই ঘটনা উনার জীবনী পড়ার সময়ে দুই-এক প্যারাগ্রাফে শেষ করে ফেলসি পড়ে, অথচ ভাবিই নাই যে এইটার ভিতরেও…

-শুধু এইটার ভিতরেই না। উনি মেসেঞ্জার হিসেবে সিলেক্টেড হওয়ার পর থেকে উনার জীবনে যতগুলা বড় বড় ঘটনা ঘটসে সেগুলার বিশ্লেষণ করে দেখাইতে পারব যে উনি মিথ্যুক হওয়ার তো প্রশ্নই আসে না, বরং উনি একজন চরম লেভেলের সৎ মানুষ ছিলেন। আদর্শতম মানুষ ছিলেন। তারচেয়েও বড় কথা মহাবিশ্বের যিনি স্রষ্টা সেই মহান স্রষ্টার নিজের নির্বাচিত একজন মহাসম্মানিত সত্য নবী ছিলেন, সর্বশেষ নবী ছিলেন, যার পরে আর কোন মেসেঞ্জারকেই আর পাঠানো হবে না।

-আপনি কি আমাকে প্রতিটা ঘটনা থেকেই এইভাবে উদাহরণ দিয়ে দিয়ে বুঝাইতে পারবেন? উনার জীবনীতে ব্যাপারগুলা এইভাবে নাই।

-আল্লাহ চাইলে অবশ্যই পারবো। তবে প্রব্লেম কী জানস, এই ব্যাপারগুলাই ক্লাসে ইন ডিটেইলস টাইম নিয়ে পড়াই যখন তখনই লাগে দুই বছর। তোরে নিয়ে টানা আলোচনায় যদি রেগুলার বসি, তাও মাসখানেক লেগে যাবে। তবে একটা প্ল্যান আছে। লিখে ফেলব চিন্তা করতেসি। তুই যেইভাবে নিজের চিন্তাগুলা লিখে ফেলসস ধুপধাপ, আমিতো পুরাই মোটিভেইটেড ব্যাডা! যদি লিখে ফেলতে পারি, তাইলে এর প্রথম পাঠক হবে একটা সনাতন ছেলে। হৃদয় কুমার সাহেব! ইন্টারেস্টিং হবে, কী বলস!

-আরো ইন্টারেস্টিং হবে যদি সেই হৃদয় কুমার বদলে গিয়ে আল্লাহর একজন সংগ্রামী দাস হয়ে যায় আর তারপরে আপনার সেই লেখাটা পড়ে। হাহাহাঃ

-আরি বাপরে! কী হাসিটাই না দিলি! এরকম চিন্তা করতেসস নাকি সত্যিসত্যি? বলে যে ফেলসস, এইটাতেই দ্যাখ গায়ের লোম দাঁড়াই গেসে গা! দ্যাখ!

-হাহাহাঃ সিরিয়াসলি ভাইয়া! গায়ের লোম দেখি আসলে দাঁড়াই গেসে আপনার। কেন বলেনতো?

-তুই বুঝতেসস, তুই কী বলসস? তোর সোসাইটি মানবে? হুলুস্থুল শুরু হয়ে যাবে না?

-শুরু হলেতো কিছু করার নাই। সত্য হিসেবে যেটা প্রমাণিত হবে সেটা যদি বুঝেশুনেও মানতে না পারি তাইলে নিজের কাছেইতো লজ্জায় কোনদিন মুখ দেখাইতে পারবো না, তাই না? মানুষ হিসেবে জন্মটাই তো বৃথা হয়ে যাবে। মানুষ হিসেবে সৃষ্টি হয়ে বুদ্ধিমত্তা কাজে লাগায়ে যদি সত্যটাকে নিজের লাইফে স্টাবলিশই না করতে পারলাম, তাইলে তো আমি মানুষ হিসেবেই ফাংশানাল হইতে পারব না। গরু, ছাগল, বিলাইর সাথে নিজের বুদ্ধিমত্তারে মিলাইলে তখন চিংড়ি পোকার চাইতে আমার খুলিতে ব্রেইন বেশি আছে বলে আর ভাবতে পারব না। আর ভাবতে পারলেও কাজকর্মের কারণে সব প্রমাণ যে তার বিপক্ষে যাবে ভাইয়া! তখন আর এত শিক্ষা-দীক্ষা আর সার্টিফিকেটের অর্থ কী? আত্মমর্যাদার স্থান কোথায় হবে? আপনিই বলেন। আর আপনি নিজেওতো নাস্তিকতা থেকে সত্য বুঝে মেনে নিসেন, সেই আপনি যদি এই কথা বলেন!

-আমার হিসাব আলাদা। ফ্যামিলি ব্যাকগ্রাউন্ডতো মুসলিমই আমার, তাই না? তোর হিসাব তো অন্যরকম।

-মোটেও অন্য না ভাইয়া, একই। ভয় আর ফিউচারের হাবিজাবি ক্যালকুলেশান, এইগুলা আমাদের কল্পনায় তৈরী, রিয়েলিটি না। ভ্রম। এইগুলারে পাত্তা দিলে লাইফ আর ঠিকভাবে লীড করা সম্ভব না। কারো পক্ষেই না। আর আমি যে মুসলিম হবোই এমন কোন গ্যারান্টি এখনও নাই। আপনি উল্টো নির্ণয় বইটার প্রথম দিকের চ্যাপ্টারগুলা পড়তে বলার পরে, আপনার সাথে আলোচনা শেষে পুরোপুরি ক্লিয়ার হওয়ার পর, আমি কিন্তু স্রষ্টার একত্বের ব্যাপারটা ক্লিয়ারলি বুঝছি। কুরআনের সত্যতা নিয়েও ভাবসি। বাট নবিজীর সত্যতার ব্যাপারে পরিস্কার না হওয়া পর্যন্ত ব্যাপক পেইন খাচ্ছি। সো, এই আলোচনাটা শেষ হওয়া দরকার।

-হুম! কিন্তু মাথায় রাখিস, বিশাল জীবনী উনার। ডিটেইলে এতগুলা উদাহরণ দিতে গেলে ম্যালা সময় লাগবে।

-সময় আছে। আমিও আছি। তুমি এক কাজ কর। উনার লাইফের মেজর ঘটনাবলী বিশ্লেষণ করে উনি যে সত্য নবী ছিলেন সেটা নিয়ে লেখাটা দ্রুত শুরু করে দাও। আমাকে এত বিশাল পরিসরে না বলে জাস্ট আর দুই তিনটা এক্সাম্পল দাও, আমি বাকিটা ধরে ফেলতে পারব বলে মনে হচ্ছে।

-হ্যাঁ, সেটা তুই পারবি। দুই-তিনটা না, দুইয়ে তিনে অন্তত আরো পাঁচটা উদাহরণ তোরে আপাতত উপহার হিসেবে দিচ্ছি। যেভাবে ধাম করে আপনি থেকে তুমি ডাকা শুরু করসস আমাকে, এই সামান্য উপহারটাতো তোরে দেয়াই যায়। কী বলস?

হৃদয়,

তোমাকে এই চিঠিতে ‘তুমি’ করে লিখছি একটা গুরুত্বপূর্ণ কারণে। সেটা হচ্ছে, এই চিঠিতে আমি তোমার শিক্ষক বলতে পার। তোমাকে বেশ কিছু ইম্পর্ট্যান্ট ব্যাপার ভাবতে শেখানোর চেষ্টা আমি করব শিক্ষক হিসেবে। এবং শিক্ষক হিসেবে আমি যেহেতু ছাত্রদেরকে ‘তুমি’ ডেকেই অভ্যস্ত তাই এখানে সেই সম্বোধনই ব্যবহার করব। আশা করছি, চিঠি হওয়ায় তোমার কাছে এটা একটুও দৃষ্টিকটু লাগবে না। আর যদি লাগেও, কিচ্ছু করার নাই এখন, কারণ টাইম নাই এটা ঠিক করার। মূল চিঠি আমি লিখে ফেলেছি। এটাচমেন্ট হিসেবে এই চিঠির প্রথমাংশের পরে সংযুক্তও করে দিয়েছি। অসম্ভব হাত ব্যথা করছে।

মূল আলোচনায় তোমাকে আমার পাঁচটা পয়েন্ট বলার কথা ছিল, মনে আছে? কী নিয়ে তা নিশ্চয়ই ভুলে যাওনি? রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম যে মিথ্যাবাদী ছিলেন না, সত্যবাদী, ফলে সত্য নবী ছিলেন, এটার পক্ষেই উনার জীবনী থেকে পাঁচটা পয়েন্ট দেয়ার কথা ছিল ভাবার জন্য, বুঝার জন্য। আমি পাঁচটার বেশি পয়েন্ট এখানে তোমাকে লিখেছি। থ্যাঙ্কস টাইপের চেহারা বানানোর কিছু নাই, কারণ এটা কোন ব্যাপার না। আসল ব্যাপার হচ্ছে, তোমার কল্পনাশক্তি এবং ভাবনাশক্তির ব্যবহার। অসম্ভব শক্তিশালী একটা ইতিহাসকে তোমার এখন গভীরভাবে ভাবতে হবে, বুঝতে হবে, নিজেকে প্রফেট মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লামের জায়গায় হুবহু দাঁড়া করাতে পারতে হবে, উনার পরিস্থিতিটা উনার চোখ দিয়েই দেখবার চেষ্টা করতে হবে, একজন মানুষের হৃদয় নিয়ে এই ইতিহাসকে অনুভব করার সাহস থাকতে হবে।

পারবে তুমি? তোমাকে পারতে হবে। যিনি সর্বস্নেহশীল এবং নিরন্তর মমতাময়, আমি তাঁর দরবারে প্রার্থনা করছি তিনি যেন তোমাকে এই ইতিহাসকে, ইতিহাসের সত্যকে নিজের হৃদয় দিয়ে দেখবার, বুঝবার, সত্যি সত্যি অনুভব করবার সামর্থ্য দেন, ইন্দ্রিয়ের ফাঁদ আর চাওয়া পাওয়ার নীচতাকে অতিক্রম করে সত্যকে বুঝার পর একে সত্যের মর্যাদা দিয়ে মাথা পেতে মেনে নিয়ে সম্মানিত হবার সততা আর সৎসাহস দেন।

আর শোন, চিঠিটা এখনই পড়বার দরকার নেই। ভাল করে পবিত্র হয়ে, হাতমুখ ধুয়ে ফ্রেশ হয়ে, খোলামন নিয়ে তারপরে পড়তে বসবে প্লিজ। ঠিক আছে? একটাই অনুরোধ, একটা পয়েন্ট ভালভাবে সততার সাথে বুঝে নিয়ে শেষ করার আগে, পরের পয়েন্টে যাবে না, তাড়াহুড়া করবে না। ওকে?

প্রথম চিন্তা

একজন মানুষ মিথ্যা কথা কেন বলে? কিছু অর্জনের জন্যেই তো? তো একজন পুরুষ জীবনে কী কী অর্জন করতে চাইতে পারে? কর্তৃত্ব-ক্ষমতা, ধন-সম্পদ, জায়গা-জমি এবং নারী, ফলশ্রুতিতে উন্নত সামাজিক স্ট্যাটাস, সম্মান। এইতো? তো, মুহাম্মাদকে তো এর সবগুলোই সম্মান আর মর্যাদার সাথে তৎকালীন ক্ষমতাবানদের পক্ষ থেকে অফার করা হয়েছে, তাই না? বিনিময়ে জাস্ট মানুষকে সত্য জানানোর ব্যাপারে চুপ থাকতে বলা হয়েছে। মিথ্যা কথা বলার মাধ্যমে এক জীবনে সর্বোচ্চ যা কিছু অর্জনের স্বপ্ন দেখা সম্ভব, তার সবগুলোই যখন অনায়াসে পাওয়া যাচ্ছে শুধুমাত্র সসম্মানে আপোষের চুক্তির মাধ্যমে, তখনতো আর মিথ্যা বলার প্রশ্নই আসে না। তাই না?

কিন্তু ইতিহাস ঘেঁটে দেখ। উনার উত্তর ছিল কড়া ঋণাত্মক এবং আপোষহীন। কেন? কারণ, উনি একজন নির্বাচিত বার্তাবাহক, মানবজাতির শিক্ষক। এই নির্বাচন উনার নিজের করা না, এই গুরুদায়িত্ব উনি নিজে নেননি, কেউই নিবে না। মানবজাতিকে ভয়ংকর পঙ্কিলতার অন্ধকার থেকে তুলে সেবা-যত্ন, ভালবাসা, এমনকি প্রয়োজনে শল্যচিকিৎসার মাধ্যমে বাঁচিয়ে তুলবার এই পবিত্র দায়িত্ব যিনি দিয়েছেন, সেই অসম্ভব ক্ষমতাবানের কথার বাইরে যাবার দুঃসাহস কোন সুস্থ মানুষেরই হবে না ভয়ে, আর উনিতো সত্য নবী, যিনি আল্লাহকে চিনেন, জানেন, বুঝেন, ফলে অসম্ভব ভয়ও করেন!

তাই না?

দ্বিতীয় পয়েন্ট

একটা মানুষ। সৎ মানুষ, ভাল মানুষ, নরম মনের মানুষ হিসেবে পুরোটা জীবন কাটিয়েছেন। তিনি যদি বার্তাবাহক হবার ব্যাপারে মিথ্যা বলতেন, তাহলে কি অন্যায়ভাবে এতগুলো কাছের মানুষকে চোখের সামনে প্রতিদিন নির্যাতিত হতে দেখে, খুন হতে দিয়ে, ভিটেবাড়ি ছেড়ে অন্যত্র চলে গিয়ে হলেও সত্যকে লালন করবার কষ্ট-যন্ত্রণা দেখে চুপ থাকতে পারতেন? কোন সাধারণ ভাল মানুষই তো এইক্ষেত্রে চুপ থাকতে পারবে না, ঠুনকো মিথ্যার বেসাতি থেকে বেরিয়ে আসবে, নিজের মিথ্যার কারণে মানুষের নির্যাতন, শাস্তি, যন্ত্রণা আর খুন একজন ভাল মানুষকে কুরেকুরে খাবে। আর সেখানে ইতিহাসের পাতা সাক্ষী যে, তিনি ছিলেন ঐ সময়ের সবচাইতে ভাল মানুষ, আস্থাবান মানুষ, কোমল হৃদয়ের মানুষ। সারাজীবন মানুষের প্রতি তাঁর সহানুভূতি, ভালবাসা, অসহায়ের পাশে দাঁড়ানো আর গোত্রবাদ-জাতীয়তাবাদের বিপক্ষে দাঁড়িয়ে হলেও ন্যায়প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে এলাকার তরুণদের নিয়ে তরুণ বয়স থেকেই হিলফুল-ফুযুল নামক সংগঠনের সূচনা, এগুলো কি কাছের মানুষগুলোর অযথা নির্মম অত্যাচার মুখ বুজে সইবার সাথে সাংঘর্ষিক না? সৎভাবে চিন্তা করে দেখ, দেখবে একটাই উত্তর পাবে বারবার। হ্যাঁ, একটাই উত্তর-

উনি সত্য নবী ছিলেন।

তিন নং খোরাক

মক্কার সব কিছু ছেড়েছুড়ে মদীনা চলে যাওয়ার পরেও শান্তি ছিল না। মদীনার ইহুদীরা আর মক্কার কুরাইশরা যেকোন সময় গুপ্ত হামলা করে জীবন শেষ করে দিতে পারে, এমন বেশ কিছু ঘটনা আর ইঙ্গিত পাওয়ার পর উনার এবং উনার সাথীদের সবার জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। রাতে উনিও ঘুমাতে পারেন না, উনার সাথীরাও না। কারণ, অসাধারণ এই মানুষটার সত্যতা তাঁর কাছের সাথীদের চাইতে বেশি আর কে দেখেছে, কে বুঝেছে? ফলে, পৃথিবীতে উনার প্রয়োজনীয়তা যারা বুঝে, উনার অসাধারণ স্নেহময় আর ব্যক্তিত্ববান চরিত্র যারা কাছ থেকে দেখে প্রতিদিন, তারা যে উনাকে নিজের জীবনের চাইতেও বেশি ভালবাসে! আর তাই তাদের চোখেও টেনশানে ঘুম আসে না। উনার তাঁবুর পাশে তাই সশস্ত্র প্রহরী হয়ে দাঁড়িয়ে রাত কাটানোতেই যে শান্তি! নিরাপত্তা দিয়ে উনাকে ঘুমানোর সুযোগ করে দেয়াটাই যে একজীবনের পরম সৌভাগ্য!

তো, এক রাতে কী হল, উনি বললেন আর পাহারার প্রয়োজন নেই। কেন? কোন নেতা কি এরকম ভয়াবহ অবস্থায়ও পাহারার প্রয়োজন নেই বলবে? কেন তিনি চলে যেতে বললেন পাহারার দরকার নেই বলে? কারণ, ঐশীবাণী এসেছে যে! যে বাণীতে বলা হয়েছে উনার জীবনের নিরাপত্তার দায়িত্ব স্বয়ং আল্লাহ নিজেই নিয়ে নিয়েছেন। কী? আল্লাহই উনার নিরাপত্তা দিবেন! আচ্ছা, ভেবে দেখ তো, একজন মিথ্যাবাদী লোভী নেতা কি কখনোই নিজের পাহারাদারকে বিদায় দিয়ে নিজের বিপদকে ডেকে আনবে? নিরাপত্তাহীনতার ঝুঁকি নিবে? কক্ষনো না। কিন্তু উনিতো আর মিথ্যাবাদী নেতা নন। আয়াতের ব্যাপারেও মিথ্যা তিনি বলেননি, বলতে পারেন না। আর তাই সেই সত্য আয়াতে উনার আস্থাই সবচাইতে বেশি ছিল। নিশ্চিন্তে সবাইকে বিদায় করে দিয়ে উনি নিজে শান্তিতে ঘুমাতে পেরেছিলেন, উনার সাথীরাও। এটাই কি প্রমাণ করে না যে উনি সত্য নবী, মিথ্যাবাদী নন? মিথ্যাবাদী হলে তো ইচ্ছেমত আয়াতের কথা বলে তিনি আরো নিরাপত্তা আর সশস্ত্র পাহারাদারের ব্যবস্থা করতেন, তাই না? তিনি সত্য নবী বলেই, সত্য আয়াতের ধারক-বাহক বলেই আয়াত অনুযায়ী কাজ করেছিলেন নিশ্চিন্তে আর জীবনের শেষ মূহুর্ত পর্যন্ত উনার জীবনকে আল্লাহ সব শত্রুর হাত থেকে আসলেই হিফাজাত করেছিলেন।

উনি যে সত্য নবী ছিলেন, এটা মেনে নিয়ে সত্যের কাছে মাথা নুইয়ে দেবার জন্য এই একটা ঘটনাই তো একজন সৎ আর বিবেকবান বুদ্ধিমান মানুষের জন্য যথেষ্ঠ!

ঘটনা চার

যুদ্ধের ডামাডোল আর খাবারের অভাবে গরীব সাথীদের যখন ক্ষুধায় অস্থির লাগছে তখন মিথ্যাবাদী নেতা হিসেবে উনার আয়েশ করার কথা। কিন্তু না, উনি সাথীদের সাথে একসাথে ময়দানে নেমে এসেছেন। সবার আপত্তি সত্ত্বেও কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাদা-পানি-ধুলায় মাখামাখি হয়ে কাজ করেছেন একসাথে। যেটা এখন তো বটেই, তৎকালীন নেতারাও করতেন না। কিন্তু তিনি যে নেতা হয়ে কর্তৃত্ব ফলিয়ে সম্মানের আসনে বসতে চাননি সেই প্রমাণ এখানেই।

সেই ভয়ংকর দূর্দিনে সবার ক্ষুধার তীব্রতা এত বেশি ছিল যে অনেকেই পেটের ব্যথাকে চাপা দিতে পেটে একটা করে পাথর বেঁধেছিল। আর উনি? উনার ব্যথা ছিল এর চাইতে অনেকগুণ বেশি। এত বেশি ছিল যে অন্যদের চাইতে শারিরীক ভাবে মজবুত হওয়া সত্ত্বেও ব্যথার তীব্রতায় উনার পেটে বাঁধা ছিল দু’টো পাথর। এরপরেও যদি কেউ বলে যে উনি এই কারণে, সেই কারণে মিথ্যা বলেছেন, তাহলে এর চাইতে বড় মিথ্যা আর কী হতে পারে? সাথীদের নির্যাতন, খুন হওয়া দেখে, দেশছাড়া হতে দেখে, নিজে নির্বাসনে গিয়ে, নিজে দেশ ছেড়ে অন্য জায়গায় গিয়েও, বারবার যুদ্ধে আর স্বজন হারানোর ব্যথার মুখোমুখি হয়েও পনের বছরের বেশি সময় ধরে একটা মিথ্যাকে চালিয়ে নেবেন এমন কোন মানুষ কি হতে পারে? কক্ষনো না। কেউ মিথ্যাবাদী হলে এমন দুঃসহ পরিস্থিতির মুখোমুখি হবার অনেক অনেক আগেই যে হাল ছেড়ে দিয়ে জীবনের মায়ায়, ভোগের লোভে ঠিক হয়ে যেত, কিংবা নতুন জীবন শুরু করত! কিন্তু উনি তা করেননি। কেন?

কারণ একটাই। উনি সত্য ছিলেন। নবী ছিলেন।

পঞ্চম অনুরণন

এখানে পাঁচ নং পয়েন্টে কয়েকটা ভাবনার খোরাক দিব। যদিও আর পয়েন্ট দেয়ার প্রয়োজন নেই। একজন ঠান্ডা মাথার চিন্তাশীল মানুষের জন্য এতক্ষণ দেয়া উদাহরণগুলো যথেষ্টর চাইতেও বেশি। উপরের পয়েন্টগুলো আবার ভাবো। ভেবে দেখ, কিসের লোভে উনি মিথ্যা বলবেন? কেন মিথ্যা বলবেন? নির্ঝঞ্ঝাট জীবন বাদ দিয়ে তীব্র অনিশ্চয়তায় আর অসম্ভব নির্যাতনের মুখে নিজের জীবন, নিজের পরিবার-পরিজন, সঙ্গী-সাথীর জীবনকে ঠেলে দেয়ার জন্য? নিজেকে নির্বাসনের অনিশ্চিত জীবনে অনিশ্চিত সময়ের জন্য ঠেলে দিয়ে কি বছরের পর বছর কেউ মিথ্যায় অটল থাকে? অথচ যেহেতু উনার জীবনী তুমি পড়েছো, তুমি ভালভাবেই জান মক্কার সেই নির্বাসনের সময়টা কী দুঃসহ যন্ত্রণার ছিল। এরপরে ভিটেমাটি ছেড়ে অন্য ভূমিতে চলে যেতে বাধ্য হওয়া। তবুও একটা বার্তাকে সত্য জেনে আঁকড়ে ধরে থাকা। কেন?

সেই নতুন ভূমিতে গিয়েও তো শান্তি মেলে না! গুপ্তহত্যার টেনশান, ইহুদীদের একের পর এক কুৎসিত ষড়যন্ত্রের মোকাবিলা, মক্কা থেকে কুরাইশদের একের পর এক হামলা। সেই যুদ্ধগুলোর প্রথমটাতেই অংশগ্রহণ করতে হয় সামরিকভাবে প্রস্তুতিবিহীন অবস্থায়। তবুও কেন তিনি অংশ নিয়েছিলেন? কেন পালাননি? কিভাবে সেই গুটিকয়েক সাথী নিয়ে সামরিক সাজে সজ্জিত তিনগুণের চাইতেও বিশাল বাহিনীর মুখোমুখি হয়েছিলেন? কার উপর আস্থা রেখে? আল্লাহ বিজয় তো দিয়েছেন পরে, কিন্তু তাঁর সাহায্যের উপরে আস্থা রেখে কোন মিথ্যেবাদী বুদ্ধিমান কি প্রস্তুতি ছাড়াই রণক্ষেত্রে অংশ নিবে এক বিশাল প্রস্তুত আর্মির বিরুদ্ধে? কখনোই না। তাহলে কেন?

কারণ উনি একজন সত্য নবী ছিলেন। উনি জানতেন আল্লাহর জন্য, সত্যের জন্য যে লড়াই, সেখানে সত্যপন্থীরা কখনোই পরাজয় বরণ করতে পারে না।

নিজের হৃদয়ের চোখের আরও একটা ভীষণ যুদ্ধক্ষেত্রের চলচ্চিত্র গড়ে নাও আজকে, যেখানে তোমার সঙ্গীসাথীর বিশাল এক অংশ, বলা যায় প্রায় সবাই দিশেহারা হয়ে পালাচ্ছে ছত্রভঙ্গ হয়ে। কী চিন্তা আসবে ঐ মূহুর্তে তোমার? আমি হলে তো পালানোটাকেই যুদ্ধের স্ট্র্যাটেজি বলতাম! আর যদি মিথ্যাবাদী, ভোগী, লোভী হতাম? তাহলেতো সেই পালিয়ে যাওয়া সাথীদের মাঝে আমি নিজেই সবার আগে থাকতাম। কারণ, বেঁচেই যদি না থাকি, যুদ্ধক্ষেত্রে যদি মারাই যাই, তাহলে লোভের সম্পদ, এই সুন্দর জীবনটা ভোগ কে করবে? কিন্তু হুবহু এমন পরিস্থিতিতে তিনি ঠিক উল্টোটা করেছিলেন।

সবাই যখন তিরবৃষ্টিতে দিশেহারা হয়ে পালাচ্ছে পড়িমরি করে, তখন তিনি নিজের ঘোড়াকে হাঁকিয়ে দিয়েছেন শত্রুদের দিকেই। তিরবৃষ্টির তীব্র ধারাকে উপেক্ষা করে কে এভাবে এগিয়ে যেতে পারে? কে মৃত্যুর মুখে নিজে দাঁড়িয়ে পালিয়ে যাওয়া সাথীদেরকে উদ্ধুদ্ধ করতে পারে নির্দ্বিধায় এই বলে চিৎকার করে যে-

“আনান-নাবিয়্যু লা- কা-জিব, আনা-বনু আব্দুল মুত্তালিব”

“মিথ্যাবাদী নই, বরং আব্দুল মুত্তালিবের পৌত্র সত্যনবী আমি।”

একজন মিথ্যাবাদী কি মৃত্যুমুখে দাঁড়িয়ে এই ঘোষণা দিতে পারবে? কখনোই না। উনার এই রণচিৎকার শুনে সাথীদের হুঁশ ফিরেছিল। তারা দলেদলে আবার ময়দানে যোগ দিয়ে বীরবিক্রমে বিজয়লক্ষ্যে যুদ্ধ করতে ফিরে আসেন দলে দলে। কেন? কারণ, তারা ভালভাবেই জানতেন যে উনি সত্য নবী। উনার রণহুঙ্কার শুনে জীবনভয়ে ময়দান ছেড়ে পালিয়ে যাওয়া মানুষগুলোর হুঁশ ফিরে আসে, মনে পড়ে যায় যে সত্য নবীর পাশে থাকার সম্মান ছেড়ে কোন জিল্লতির জীবনকে আমরা বেছে নিচ্ছি? কোথায় গিয়ে বাঁচবো, কে আমাদেরকে সত্যি সত্যি বাঁচাবে যদি আল্লাহর প্রেরিত সত্য নবীকেই ছেড়ে উনাকে বিপদের মুখে রেখে পালিয়ে যাই? কোন আসমান আমাকে ঠাই দিবে, কোন জমীনের উপরে আমি দাঁড়াবো, যদি বাঁচতে গিয়ে খোদ আল্লাহর ক্রোধকেই কিনে নিই? তাকিয়ে দেখলেন, নির্ভীক আহবান জানাতে জানাতে তিরের দিকেই ঘোড়া ছুটিয়ে তীব্রবেগে এগিয়ে যাচ্ছেন প্রাণের চাইতে প্রিয় নবীজি আর সেটা দেখার পরেও আমি কিনা পালাবো? কক্ষনো না। কোনদিনও না।

স্ট্যাটাস আর সম্পদ ভোগের জন্য মিথ্যা? কোন নীতিবান সুন্দর আদর্শ প্রতিষ্ঠার জন্য মিথ্যা? তাও নিজের পরিবার পরিজন, আত্মীয় স্বজন সহ, সঙ্গীসাথী সবার জীবনকে মৃত্যুর সামনে সঁপে দিয়ে? নেতা হবার জন্য, মানুষের হৃদয়ে স্থান পাবার জন্য মিথ্যা? মানুষ হত্যা হতে দেখেও? উনার মত সারাজীবন সহানুভূতিশীল কোমল অন্তরের হৃদয়বান মানুষের পক্ষে সম্ভব? সৎভাবে ভাবলেই উত্তর পেয়ে যাবে। আরে, যে মানুষটা মদীনায় নেতা হবার পর অন্যের জন্য নিজের সব বিলিয়ে দিয়ে এমন অবস্থায় দিন কাটাতেন যে সেই নেতার ঘরেই টানা দুই মাস চুলায় রান্না করার মত খাবার থাকত না, শুধু খেজুর আর পানি দিয়ে মাসের পর মাস পার করতে হতো, কখনোবা টানা দুই-তিন দিন পেটে একটা দানা পড়তো না, তবুও সত্যের বার্তা ছড়িয়ে দিতে তিনি একদিনের জন্যেও পিছু হটেননি, সেই তাঁকে যারা লোভী আর মিথ্যাবাদী বলবে তাদেরই তো লজ্জায় অপমানে মরে যাওয়া উচিৎ।

এই মানুষটাই তো আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করতেন বিনয়ী হবার জন্য, বিনয়ীদের মাঝে মৃত্যুবরণ করার জন্য। যে মানুষটা মনেপ্রাণে এই দুয়া করতেন, গরীবদের মাঝে থাকতেই ভালবাসতেন সাদাসিধে হয়ে, একসাথে বৈঠকে থাকা অবস্থায় যে নেতাকে বাইরের মানুষ এসে আলাদা করে নেতা হিসেবে কখনো চিনে নিতে পারতো না, সেই মানুষটা ক্ষমতা আর সম্পদের লোভে উদ্ধত হয়ে মিথ্যা বলবেন, এও কি সম্ভব?

এক বেদুইন মহিলা যে মানুষটাকে খুঁজতে এসে পেয়ে সম্মানে, ভয়ে জড়সড় হয়ে গেছে, যে মানুষটা তখন এই বলে উনাকে আশ্বস্ত করেছেন, সহজ করে নিয়েছেন যে, ‘আরে! আমিতো এমন এক সাধারণ মহিলার সন্তান যে কিনা শুকনো মাংস খেত!’ সেই মানুষটাকে যদি কেউ বলে যে “এ লোক খ্যাতি-প্রতিপত্তি আর সম্মানের লোভে মিথ্যা বলছে”, তাহলে আমিও জগতের কাছে প্রশ্ন করতে চাই, এই সাদাসিধে সবাইকে আপন করে মানুষটা যদি মিথ্যাবাদী হয় তবে এ জগতে সত্যবাদী কে?

আর কত বলবো? কত উদাহরণ চাও তুমি? উনার জীবনীর পবিত্র অধ্যায়গুলো থেকে যে বড় ঘটনা ইচ্ছে নিয়ে এসো, প্লিজ। আমি তোমাকে দেখিয়ে দেব যে তিনি সত্য নবী ছিলেন।

ঐশী বার্তাবাহক আর শিক্ষক হিসেবে মনোনীত হবার সেই প্রথম ক্ষণটার বর্ণণা আরেকবার মনে করে দেখ। হৃদয়ের আয়নায় নিজেকে সেখানে কল্পনা কর। পড়তে, লিখতে জানতেন না যে মানুষটা, যে মানুষটার কোন শিক্ষক ছিলো না, সেই মানুষটা পাহাড়ের কোলের নির্জন গুহায় দিনযাপন বেছে নিয়েছিলেন। অন্তরের অস্থিরতাকে অনুভবের স্থিতিতে নিতে, জীবনের উদ্দেশ্যকে চিন্তার মাত্রা ছাড়িয়ে অনুভবে পৌঁছাতে, অন্তরের শূন্যতা পূরণ করতে যাকে প্রয়োজন তাঁকে হৃদয়ের গহীনে খুঁজে পাওয়ার জন্য, বুঝে নেয়ার জন্য হৃদয়কে যে স্থির আর শান্ত হতে হবে আগে! মানুষের যান্ত্রিক কোলাহল আর আত্মিক দূষণে তা যে অসম্ভব! আর তাই মানবিক দূষণের ধূম্রজাল পেরিয়ে প্রকৃতির নির্মলতার কোলেই ফিরে যেতে হয়, আর সেই হিসেবে পাহাড়ের কি বিকল্প আছে? সেই পাহাড়েই যখন পবিত্র মানুষটার কাছে ঐশী বার্তা নেমে এল তখন ঘটনার আকস্মিকতায় ভয়ে তিনি অসুস্থ হয়ে গিয়েছিলেন। মারাই যাচ্ছিলেন প্রায়। সেই অবস্থাতেই কাঁপতে কাঁপতে ঘরে ফিরে এসেছিলেন তিনি, মিথ্যা নবুওয়্যাত প্রাপ্তির আনন্দে নাচতে নাচতে নয়।

প্রিয়তমা স্ত্রী উনাকে তৎকালীন প্রাজ্ঞ স্কলার ওয়ারাকা বিন নাওফালের কাছে নিয়ে যান। সব বর্ণণা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে বিশদ শুনে বুঝে বিজ্ঞ স্কলার যখন বলেন, এ যে সেই ফেরেশতা, সেই এইঞ্জেল, যে তোমার আগে অন্য নবীদের কাছে বার্তা নিয়ে আসতো, তখন মুহাম্মাদের মুখে হাসি ফোটেনি। আনন্দের ছাপের জায়গায় সেই পবিত্র মুখে ছিল অপার বিস্ময় আর ভয়। অজানার ভয়। তিনি যে এই ফেরেশতার কথা আগে শুনেননি, পূর্ববর্তী নবীদেরকে চিনেন না! কী হবে এখন? স্কলার যখন আরো যোগ করেন, তোমার জাতির লোকেরা তোমাকে বের করে দেবে, তখন কষ্টে অবিশ্বাসে তিনি কিছুই মেনে নিতে পারছিলেন না। কিভাবে মানবেন? তিনি যে সবার শ্রদ্ধেয়, সবার ভালবাসার মানুষ! আর তাঁকেই কিনা তারই জাতির লোকেরা অপমান করবে, বের করে দেবে? কিভাবে সম্ভব? ওয়ারাকা এই ঘোষণা দিতেও ভুলেননি যে, যখন সত্যপ্রচারের এই দায়িত্ব মুহাম্মাদকে বুঝিয়ে দেয়া হবে, দুঃসহ দিনগুলি নেমে আসবে, বেঁচে থাকলে ওয়ারাকা অবশ্যই সেই দিনগুলিতে মুহাম্মাদের পাশে থাকবেন নিজের সবটুকু নিয়ে।

জীবনীর এই জায়গাতে আমরা মানব মুহাম্মাদের নবী হয়ে উঠার সংবাদ পড়ে আনন্দে উদ্বেলিত হই, শিহরিত হই। ওদিকে মুহাম্মাদের মুখে সেইদিনের বর্ণণায় কেন এত উদ্বিগ্নতা খুঁজে পাই আমি? কারণ, এরপর থেকে যাকে সবাই রাসুলুল্লাহ বলে ডাকবে, যার নামের শেষে সসম্মানে সল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলে তাঁর উপরে রহমত আর শান্তি বর্ষিত হবার জন্য দুয়া করবে, সেই মানুষটার চোখের সামনে ছিল দুঃসহ আর কঠিন সব যাত্রা। বিশ্বাস-অবিশ্বাসের দোলাচল। ওয়ারাকা বিন নাওফাল নামক এই বিদগ্ধ জ্ঞানীর কথাগুলো কি সত্যি? জানেন না তিনি। তিনি যে জীবনে এই প্রথমবার শুনলেন কথাগুলো! পূর্ববর্তী নবীদের সত্যিকারের অনুসারীরা সবাই উনার আগমনী বার্তার জন্যেই যুগযুগ ধরে অপেক্ষা করছিল, এমনকি ইহুদিরাও, কারণ, তাদের সবার কিতাবে উনার আগমনের চিহ্নগুলো বিস্তারিত বর্ণিত ছিল। কিতাবগুলো কালের বিবর্তনে মানুষ নিজ নিজ স্বার্থে বিকৃত করে ফেলার পরেও এই সত্যের ঐটুকু ছিটেফোঁটা তখনও বাকি ছিল যা দিয়ে উনাকে চিনে ফেলা সম্ভব। অথচ কী নির্মম পরিহাস! উনি সততা আর সত্যতা প্রমাণের প্রয়োজনে সেই উনাকেই বিধানদাতা এই ব্যাপারে পুরোপুরি অজ্ঞ রেখে গড়ে তুলেছিলেন, ফলে সব শুনে তিনি পুরোপুরি নির্বাক, নিস্তব্ধ।

কারণ, কথাগুলো যদি সত্যি হয় তাহলে অসহনীয় এই যাত্রার পূর্বাভাস যে ওয়ারাকার বাকি কথাতেই লুকিয়ে আছে। সম্মানিত এই মানুষটাকে সর্বোচ্চ অসম্মান করতে, এমনকি শহরছাড়া করতেও দ্বিধা করবে না তাঁর নিজের কমিউনিটির লোকেরাই! যে লোকেরা আজ তাঁকে সবচাইতে বেশি ভালবাসে, তারাই! এমনটাই নাকি বারবার ঘটেছিল পূর্ববর্তী বার্তাবাহকদের জীবনে!

মানুষ সত্যকে মানতে পারে না, কারণ সত্য সবসময়েই জীবনকে আমূল বদলে দেয়। চড়া দাম নেয়। হয় সেই সত্যকে গ্রহণ করার কারণে এই জীবনটা দুর্গম-অসহ্য হয়ে আসে পারিপার্শ্বিক সব অনিয়মের ভীড়ে, দুঃশাসনের অত্যাচারে, অথবা এই সত্যকে ত্যাগ করে পরবর্তী জীবনকে পুরোপুরি বিষাক্ত করে ধ্বংস করে রক্তাক্ত করবার দায়িত্বটা নিজের হাতেই তুলে নিতে হয়। যে সত্য এমন চড়া মূল্য দাবী করে বসে জীবনের কাছে, সেই সত্যের বাহককে যে নির্মম অত্যাচারে রক্তাক্ত হতেই হবে! আর সেটাই আমরা বারবার সত্যি হয়ে উঠতে দেখি প্রিয় রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লামের জীবনে।

সবার চোখের মণি, স্নেহময় চল্লিশোর্ধ মানুষটাকে এরপর আমরা দেখি মানুষের কাছে সত্যের বাণী নিয়ে যেতে। শুধুমাত্র এক আল্লাহর উপাসনা করবার আহবান নিয়ে যেতে। যিনি সবার প্রার্থনা শোনেন, সবার যত্ন নেন, সবার প্রতিপালন করেন, সেই একমাত্র মালিকের দাসত্বের দিকে আহবান করতে। নিজের মনমত চললে যে নিজের আত্মা কলুষিত হয়, হৃদয়ের ক্ষতি হয়, জগতের ক্ষতি হয়, মানুষের ক্ষতি হয়, অন্যায় আর ইন্দ্রিয় ভোগের জোয়ারে অবিচার মাথা তুলে দাঁড়ায় চারপাশে, প্রতিষ্ঠা পায়। দূর্বল মার খাওয়া শুরু করে সবলের বাহুজোরে, অসহায় আরো দিশেহারা হয়ে পড়ে বিত্তশালীর বিষম অত্যাচারে। নিজের মনের দাসত্ব ঝেড়ে, অন্য মানুষের দাসত্ব ফেলে এমনকি নিজের ইচ্ছের গোলামীর জিঞ্জির ভেঙ্গে এক আল্লাহর ইচ্ছেকে সানন্দে মেনে নিয়ে তাঁর দাস হতে হবে? সেই আল্লাহর দেখানো পথেই জীবনকে সাজিয়ে সুন্দর করতে হবে, মনুষ্যত্বের পূর্ণতায় পৌঁছাতে হবে? সত্য আর ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠায় মনোনীত শিক্ষক আর বার্তাবাহক হিসেবে মুহাম্মাদকে মেনে নিতে হবে? এতে সত্য জিতবে ঠিক আছে, ন্যায় আর সুবিচার প্রতিষ্ঠা হবে, শান্তি আসবে দুনিয়ায় বুঝলাম, কিন্তু আমার ইচ্ছেমত চলার পথে যে সেটা বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে! আমার আরামের ইন্দ্রিয় ভোগে আর বিলাসিতায় যে তাতে ভাটা পড়ে যাবে! আমি তা মানবো কেন? সত্য প্রতিষ্ঠা হোক, কিন্তু সেই পথে গেলে আমার যে ত্যাগের অর্ঘ্য দিতে হবে, তা আমি মানতে পারব না।

ভোগে মত্ত হয়ে বুঁদ হয়ে শরীরের পশুত্বে বশ হয়ে থাকা মানুষগুলো তাই সত্যকে চায়নি। চাইবে না। চারপাশে তাকিয়ে দেখ, এখনো চায় না। আর তাই এতদিনের ভালবাসার মানুষটাকেই এরপর আমরা দেখি কা’বার প্রাঙ্গণে সর্বসমক্ষে অপমানিত হতে। সম্মানিত পরিবারের ব্যক্তিত্ববান আর রুচিশীল কাউকে দেখেছ কখনো? না দেখলে কল্পনা করে নাও এমন কোন পরিচিত মুখ। চল্লিশোর্ধ সহানুভূতিশীল একটা মানুষকে সবার সামনে মৃত উটের নাড়িভুঁড়ি চাপিয়ে হেনস্থা হবার কথা কল্পনা যে তোমাকে করতেই হবে। অন্তত নিজেকে যে সে জায়গায় ভাবতে হবে, নইলে কোনদিনও বুঝবে না, অনুভব করতে পারবে না এই সত্যের দাম। যে দাম আমার প্রিয় নবিজীকে দিতে হয়েছে নিজের কমিউনিটির দিবানিশি অত্যাচার আর নির্বাসনের যন্ত্রণা মেনে নিয়ে।

এমন কোন পঞ্চাশোর্ধ প্রিয় মানুষ আছে তোমার যাকে অসম্ভব সম্মান কর তুমি? তাহলে সেই মানুষটার সম্মানিত সৌম্য মুখটাকে ভাব এবার। হয়তো তোমার বাবা কিংবা জ্যাঠা কিংবা মুরুব্বী কেউ। ভাব। কল্পনা কর যে এই মানুষটার সবচাইতে কাছের মানুষ, সবচাইতে প্রিয় মানুষ নিজের প্রাণপ্রিয় স্ত্রী মারা গেছে। জীবনের সুখে দুঃখে যিনি সহযোদ্ধার মত পাশে ছিলেন, সেই স্ত্রী মারা গেছেন। কল্পনা করে নাও, সেই চাচা মারা গেছেন যিনি নেতৃস্থানীয় হওয়ায় এলাকার মানুষের অসহ্য অত্যাচারের পরেও পরের দিন আরেকবার বের হবার সাহস করা যেত। হৃদয়ের গহীনে এই দুইটা বটগাছ হারানোর ব্যথা তোমাকে অনুভব করতে হবে, সেই দমবন্ধ হয়ে আসা, চোখে অন্ধকার দেখা পরিস্থিতি তোমাকে অনুধাবন করতে হবে।

এবার চিন্তা কর, এই মানুষটাকে, হ্যাঁ, এই মানুষটাই যখন মানুষকে সত্যের পথে আহবান করার পর রাস্তা দিয়ে হাঁটছেন, তখন তাঁকে প্রতি পদক্ষেপে তীব্র বেগে ধেয়ে আসা অবিরাম পাথরের বৃষ্টিতে মাথা আর শরীরের রক্তে পায়ের পাতার নীচে পর্যন্ত ভিজে থ্যাকথ্যাকে হতে হয়েছে। ক্লান্ত বিধ্বস্ত শরীর নিয়ে যখন পবিত্র শরীরটা নিয়ে বসার সুযোগ পেলেন, তখন পায়ের স্যান্ডেল খুলতে গিয়ে দেখেন খোলা যাচ্ছে না। শক্ত হাতে টেনে ছিলে আনতে হয়েছে পা থেকে জমাট বাঁধা রক্তের কারণে। এরপর অসহ্য যন্ত্রণা আর অপমানে কেঁদে কেঁদে অসম্ভব সম্মানিত এই মানুষটা তাঁর মালিককে অনুনয় বিনয় করে কী বলেছেন মনে পড়ে?

বলেছেন, “এরা বুঝে না হে প্রভু, তাই দয়া কর তুমি, ক্ষমা কর এদের।” কিভাবে পেরেছিলেন তিনি প্রশ্ন জাগে না মনে? উত্তরটা হৃদয় ঠিকই জানে যে, তিনি সত্য নবী। মানুষকে অনন্তকালের অনন্ত ক্ষতির হাত থেকে বাঁচাতে যাকে নির্বাচিত করা হয়েছে, সেই তিনি ঐ অত্যাচারীদেরকে দুনিয়ার বুকেও বাঁচাতে চেয়েছেন যেন তাদেরকে পরকালের অসীম আর তীব্র কঠিন শাস্তির থেকে বাঁচানোর সুযোগটা পাওয়া যায়।

এরপরে মাদীনায় যাওয়ার পরেও যুদ্ধ। রক্তপাত। থৈ থৈ ভালবাসা বুকে নিয়ে ঘোরা মানুষটাকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে যুদ্ধে পর্যন্ত যেতে হল! দাঁড়াতে হল অন্যায়কে রুখতে, জুলুমের ঘনীভূত অন্ধকারকে আলোতে ভাসাতে, যুগের পর যুগের বেহিসাব রক্তপাত থামাতে তাঁকেও রক্তপাতের পথে দাঁড়াতে হল! আহ! একজন শল্যচিকিৎসক যখন সার্জারীর কাচি-ছুরি হাতে নেন, তখন তাঁকে বাধ্য হয়ে, নিরুপায় অবস্থাতেই তা নিতে হয়। একজন সৎ পুলিশ যখন আইন-শৃংখলা নিয়ন্ত্রণের জন্য ডান্ডা নিয়ে রাজপথে নামেন, একজন সৈনিক যখন অন্যায়ভাবে ধেয়ে আসা শত্রুকে রুখে দিতে, থামাতে রণক্ষেত্রে জীবনবাজি রেখে দাঁড়ান, তখন সেটা বাঁচবার জন্য, মানবতাকে বাঁচানোর জন্যই প্রয়োজন। দেহ থেকে বিষাক্ত অংশকে বের করে না দিলে পুরো দেহটাই যে হারাতে হয়। তাই কখনো রোগের পরে, আর সম্ভব হলে রোগের আগেই প্রতিরোধ করে শক্ত হাতে রুখে দিতে হয় মরণব্যাধিকে। উনাকেও দাঁড়াতে হয়েছিল এই প্রতিরোধকারীর ভূমিকায়। কিভাবে বুঝলাম যে এই ভূমিকা নির্মম কসাইয়ের নয়, বরং নির্ভরযোগ্য ডাক্তারের হাতে প্রয়োজনীয় শল্যচিকিৎসার? বলছি।

মক্কা বিজয়ের দিন। সবাই যুদ্ধের নিয়ম জানে। যুদ্ধেরপরাজিত পরিণাম শত্রুরও জানা। আর এই শত্রুরাতো কেবল যুদ্ধাপরধী নয়, তাদের অপরাধ আরও জঘন্য, আরো বেশি মারাত্মক। কীরকম?

এরা আল্লাহর নির্বাচিত সর্বশেষ সত্যের বাহককে গুপ্তহত্যার চেষ্টা করেছে, মুছে দিতে চেয়েছে চিরতরে। উনাকে বারবার আক্রমণ করেছে, মানসিক, শারিরীক নির্যাতন করেছে। সবার সামনে প্রকাশ্যে অপমান করেছে, খুন করতে চেয়েছে। উনাকে সহ উনার পরিবারবর্গকে সামাজিকভাবে একঘরে করে রেখেছে, উনার সন্তান-পরিজনদেরকেও অত্যাচার করেছে, নিগৃহীত করেছে অন্যায়ভাবে। উনাকে সহ উনার সব সাথীদেরকে অন্যায়ভাবে ঘর-ভিটা ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য করেছে, আবার ঘর ছেড়ে মদীনায় যাওয়ার পথে মাল-সামানও কেড়ে নিয়েছে নির্মম ডাকাতের মত। মদীনায় যাওয়ার পর এরাই দেশদ্রোহীতা উষ্কে দিয়েছে, আবারও গুপ্তহত্যার চেষ্টা করেছে, প্রকাশ্যেও হত্যা করতে এসেছে বিষমাখা তরবারী নিয়ে। এরা বারবার ষড়যন্ত্রের চাষ করেছে আর ঘৃণার বীজ ছড়িয়ে দিয়েছে।

মক্কায়-মদীনায় সত্যপন্থীদের উপরে গোপনে-প্রকাশ্যে নির্মম অত্যাচার করতে, বারবার আক্রমণ করে সবাইকে নিঃশেষ করে দেয়ার জন্য ২০ বছরের টানা নিরলস চেষ্টায় একবারও এদের হাত কাঁপেনি। দূর্বল অসহায়দের একের পর এক খুনের চেষ্টা করেছে জানোয়ারের মত। সত্য প্রকাশে বাধা দিয়ে সুবিচার আর ন্যায়কে প্রতিষ্ঠিত করবার জন্য পৃথিবীর সর্বশেষ সুযোগ, সর্বশেষ নির্বাচিত মানুষটাকেই চিরতরে সরিয়ে দেয়ার বারবার চেষ্টা করা ক্রিমিনালগুলো ভালভাবেই নিজের অপরাধের শাস্তি জানত। সত্যকে চিনেও, চোখের সামনে দেখেও, সেটাকে দুনিয়ার বুক থেকে চিরতরে মিটিয়ে দেয়ার চেষ্টা করা শাইত্বানের সাথে হাত মেলানো মানুষগুলো আজ পরাজিত, মৃত্যুর মুখোমুখি।

নিজের ভিটেমাটি হারানো, প্রিয় সাথীদের একের পর এক লাশ হতে দেখা, প্রাণপ্রিয় চাচার খুন হওয়ার পরেও সেই দেহকে বিকৃত হতে দেখার যন্ত্রণাসহ আরো অসহ্য সব স্মৃতির কারণ এই জঘন্য কুৎসিত অপরাধীগুলোর ঘাড়ের শাহরগ আজ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম আর তাঁর সাথীদের ধারালো তরবারীর নীচে থরথর করে কাঁপছে। এদের জঘন্য কুৎসিত সব অপরাধের শাস্তিতো একটাই- মৃত্যুদন্ড, আর সেটা এই নিষ্ঠুর অপরাধীদের চাইতে ভাল আর কেউই জানে না।

তবুও ইতিহাসের পাতা চিৎকার করে আজও রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লামের মহানুভবতার সাক্ষী দিচ্ছে, দিবে। আর তাই তিনি এই বিজয়ের দিনকে স্বাভাবিক সুবিচার আর ন্যায়সঙ্গত বদলার রক্ত দরিয়ায় না ভাসিয়ে পবিত্র হৃদয় থেকে উৎসরিত ভালবাসায় বলে উঠলেন-

“যাও, আমি তোমাদের ক্ষমা করে দিলাম…”

কেন?

কারণ, তিনি যে সত্য নবী! তিনি যে মানবজাতির এই রুগ্ন দেহকে দক্ষ আর স্নেহময় ডাক্তার হয়ে বাঁচাতে এসেছেন, হৃদয়গুলোকে বাঁচিয়ে তোলার সম্ভাবনা অনুভব করা সত্ত্বেও ন্যায়বিচারের মাধ্যমে মৃত্যুদন্ডের সিদ্ধান্ত নেয়ার জন্য তো তাঁকে নির্বাচন করা হয়নি। তেমন মানুষ-ই যে তিনি নন!

চিন্তাশীল, সৎ এবং বিবেকবান একজন মানুষের জন্য এটুকুই যথেষ্ট আল্লাহর মনোনীত সর্বশেষ বার্তাবাহক এবং শিক্ষক হিসেবে উনার সত্যতা বুঝে নেয়ার জন্য, সর্বশেষ এই নবীকে হৃদয়ের উপচে পড়া হ্রদের গহীন থেকে ভালবাসার জন্য, উনার স্নেহ আর আকুলতাকে অনুভব করার জন্য, পুরো জীবনটাকে উনার মাধ্যমে দেখানো-শেখানো সত্যের পথে সাজিয়ে মনুষ্যত্বের পূর্ণতাকে পবিত্র হয়ে ছুঁয়ে দেবার জন্য।

এরপরেও কারও হৃদয় যদি মৃত হয়েই থাকে, মস্তিষ্কের চিন্তার এতগুলো ধাক্কাতেও যদি সে হৃদয় না জাগে, না ভাসে, তাহলে এই সত্য নবীর ব্যাপারে পরবর্তী প্রশ্নগুলোর সমাধানে আমাকে যে যেতেই হবে!

সল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া আ-লিহি ওয়া সাহবিহী ওয়া সাল্লাম।

-কিন্তু ভাইয়া, অনেকেই মনে করে এবং বলে যে, উনাকে আসলে শাইত্বানই এইসব শিখায়ে দিত!

-এইসব মানে কী বুঝাচ্ছস?

-মানে, কুর’আনে যা কিছু আছে, সেইসব আর কি!

-এর আগে তুই বল, দুই আর তিন যোগ করলে কত হয়?

-পাঁচ!

-আমি যদি মনে করি এবং বলি যে দুই আর তিনে বিশ হয়?

-ধুর ভাইয়া! কিসের মধ্যে কী?

-না, সিরিয়াসলি! যদি বলি? তখন কী করবি? বা অন্য কেউ যদি বলে দুই আর তিনের যোগফল হচ্ছে তিয়াত্তর, অথবা বাষট্টি অথবা চুরাশি? কিংবা যদি দাবী করে যে, দুই আর তিনে যোগ করলে উত্তর হয় সাত কোটি বিরানব্বই হাজার নয়শ চুয়াত্তর দশমিক এক দুই তিন চার পাঁচ ছয় সাত আট নয় দশ নয় আট সাত ছয় পাঁচ চার তিন দুই এক শুন্য এক দুই তিন চার…

-উফফফ ভাইয়া! কী শুরু করলেন? ৭ বিলিয়ন মানুষ তো এরকম ৭০০ ট্রিলিয়ন উল্টাপাল্টা আন্সার দিয়ে বকতেই পারে ইচ্ছা করলে। এগুলোর উত্তর দিতে গেলে তো আর কোন কাজ করাই সম্ভব না। কাজেই, কেউ এরকম দাবী করলে পাত্তা দিব না, ইগনোর করব। আমার সময়ের একটা ভ্যালু আছে না?

-এগজ্যাক্টলি! এটাই স্বাভাবিক রেসপন্স। আর ঠিক এই কারণেই তোর প্রশ্নটার উত্তর না দেয়া উচিৎ। কাজেই, ফোন রাখছি।

-ওয়েইট, ওয়েইট, বুঝি নাই ভাইয়া। প্লিজ বুঝায়ে বলেন। ফোন রেখে দিয়েন না। প্লিজ।

-তুই দেখি তুমি থেকে আবার আপনি-তে ব্যাক করসস। ভাল, একেকদিন একেকরকম চালায়ে যা! আচ্ছা দ্যাখ, “অনেকেই” যা ইচ্ছা তা “মনে করে এবং বলে”, তাই বলে সেটা নিয়ে আমি মাথা ঘামাতে যাব কেন? সত্যতো ক্লিয়ার করেছিই একবার, না? দুই আর তিনে যে পাঁচ হয়, সেটাতো ক্লিয়ার করে তোকে দেখালাম, এখন কি দুই আর তিনে কেন চার-ছক্কা হবে না, সেটাও বুঝায়ে দিতে হবে? আমি কি পাগল, না পেট খারাপ?

-বুঝছি, বুঝছি। আচ্ছা, অনেকের অনেক হিসেব বাদ দাও, আমার নিজের মনে হচ্ছে। আমাকেতো বল!

-তুই দিনে দিনে এত গর্দভ হয়ে যাচ্ছস কেন? তুইও তো আমার কাছে অনেকের মতই আর “এক” জন, তাই না? উনি সত্যবাদী ছিলেন, মিথ্যাবাদী ছিলেন না, এইটুকু তো ক্লিয়ার করসি, রাইট?

-হ্যাঁ, ক্লিয়ার।

-কচুর ক্লিয়ার! শাইত্বানের সাথে সন্ধি করে নিজেকে আল্লাহর বার্তাবাহক হিসেবে পরিচয় দেয়া মানে কী তাইলে? সত্য বলা?

-না, মিথ্যা বলা।

-ইয়েস। তো, উনি যে মিথ্যা বলেন নাই, এইটা না বলে ক্লিয়ার হইসে তোর? আবার আরেকটা ভিত্তিহীন মনগড়া অপবাদ আনলি যে? মনগড়া ভিত্তিহীন জিনিস তো বিলিয়ন ট্রিলিয়ন বানানো যায়, তো এখন কি সেটাই শুরু করবি? মুহাম্মাদ সল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম মিথ্যাবাদী ছিলেন না, সত্যবাদী ছিলেন, ইতিহাস থেকে এটার পক্ষ অগণিত শক্ত ভিত্তি-প্রমাণ করার পরেও যদি এরকম হাবিজাবি ৭ বিলিয়ন ভিত্তিহীন বানোয়াট কথা বলা হয়, সেই সাত বিলিয়ন আজাইরা ভ্রান্তির উত্তর বুঝাইতে হয়, বসে বসে হাজার-বিলিয়ন গল্প-কাহিনীকে মিথ্যা প্রমাণ করার মাধ্যমে সত্যরে প্রতিষ্ঠা করা লাগে, তাইলে তো শাইত্বানই জিতে গেলোগা! তো, শাইত্বানকে জিতায়ে প্রতিষ্ঠিত সত্য দিয়ে লাভটা হচ্ছে কী?

-মানে? শাইত্বান জিততেসে ক্যামনে?

-মানে, আল্লাহ আমাকে-তোকে উনার প্রতিনিধিত্ব করার জন্য অসম্ভব পটেনশিয়াল আর মহান এক দায়িত্ব দিয়ে বানাইসেন। আল্লাহর প্রতিনিধি হওয়া, মানে উনাকে রিপ্রেজেন্ট করা, ব্যাপারটার সম্মান আর হাইট বুঝতেসস? গুগল, মাইক্রোসফট, হার্ভার্ড, অক্সফোর্ড, একটা উন্নত রাষ্ট্র কিংবা সায়েন্সের প্রতিনিধি না, আল্লাহর নিজের প্রতিনিধি হওয়া, উনার রিপ্রেজেন্টেটিভ হওয়া, মানে… বুঝতেসসইতো, ব্যাপারটা অন্নেক উপরের!

তো, আল্লাহকেতো আল্লাহরই চেনানো নির্ভুল পথে হেঁটে চিনে নিতে হবে, যেহেতু আল্লাহকে ইন্দ্রিয়গুলো অভিজ্ঞতায় ধারণ করার ক্ষমতা রাখে না। আল্লাহর বৈশিষ্ট্যগুলো আল্লাহর দেখানো উৎস থেকেই জেনে নিয়ে অনুভব করতে হবে আল্লাহকে, আল্লাহকে চিনে ফেলায় হৃদয়-মন সবটুকু উজার করে অপার ভালবাসায় ডুবে রঙিন হয়ে যেতে হবে আল্লাহরই রঙে। ফলশ্রুতিতে, উনার বিনীত একজন প্রতিনিধি হিসেবে ভালভাবে নিজেকে গড়া, নিজের দায়িত্ব বুঝা, নিজের চরিত্র আর গুণাবলী সেই লেভেলে নিয়ে যাওয়ার মাধ্যমে নিজের উপর, ফ্যামিলির মাঝে আর সোসাইটির সবখানে জাস্টিস, আই মীন সুবিচার প্রতিষ্ঠা করতেই তো উনি আমাদেরকে এত এত্ত পটেনশিয়াল আর ক্ষমতা দিয়ে বানাইসেন, রাইট? এখন আমি যদি আমার দায়িত্ব পালনের জন্য নিজেকে গড়বার কঠিন-কঠোর তপস্যার অনুশীলন বাদ দিয়ে, মানুষের মন গড়া আজাইরা সব ধ্যান ধারণার উত্তর দেয়া শুরু করি, তাইলে আমার এক জীবন ফুরায়ে যাবে, তবু উল্টাপাল্টা চিন্তা-ভাবনার উত্তর দেয়া শেষ হবে না। ওইদিকে আল্লাহ আমাকে যে দায়িত্ব পালনে পাঠাইসেন, বানাইসেন, সেটাতে আমি য়্যাব্বড় একপীস ঘোড়ার আন্ডা পাব! শাইত্বান আমাকে অন্য কাজে ব্যস্ত বানায়ে জিতে যাবে। তো, লাভটা কার?

-বুঝছি এখন।

-এতক্ষণে! ইয়া মাবুদ! অনেক গর্দভ হয়ে গেসস আগের চাইতে কিন্তু! পেট ভরে খাওয়া দাওয়া করে ব্লাড সবগুলাকে পেটে সার্কুলেট করে দিয়ে ব্রেইনকে খালি আর ঝরঝরে রাখতেসস মনে হয় ইদানিং!

-ভাইয়া, আর বকা দিও না, প্লিজ। উনি যেহেতু সত্যবাদী ছিলেন, উনার ব্যাপারে তাই কেউ কিছু বানায়ে বললে আসলে তারই কলার চেপে তার আজাইরা আইডিয়ার দলীল খোঁজা উচিৎ ক্যাঁক করে!

-এইতো লাইনে আসছো! এটাই বলতেসি এতক্ষণ। বকাগুলা তখন এদেরকেই দিবি, ঠিক আছে? আর শোন, শাইত্বানের ব্যাপারে প্রশ্ন যেহেতু মাথার মধ্যে শাইত্বান একবার ঢুকায়ে দিসেই, এটার উত্তরটাও ক্লিয়ার করে দিই। নইলে তোরে ঠিকই জ্বালাই মারবে।

-থ্যাঙ্ক ইউ সো মাচ ভাইয়া।

-ম্যান, ইউ আর নট ওয়েলকাম এট অল! আই মীন, ভবিষ্যতে সব ক্লিয়ার করার পরেও এরকম ফালতু প্রশ্ন নিয়ে আসলে মাথা ভেঙ্গে দেব। যে মাথা খাটায়ে ফালতু জিনিসকে ভাঙ্গতে পারস না, সেই মাথা ফুটায়ে ফেলা দরকার।

-আবারও বকতেসো কিন্তু আমাকে!

-আলবৎ বকবো! যা হোক, শোন মন দিয়ে। কুরআনে একটা আয়াত আছে। ১৬ নং সুরায় পাবি। সুরা নাহলের ৯৮ নং আয়াত। দেখবি, আয়াতটাতে এই কুরআন পাঠ করার সময়েই বিতাড়িত শাইত্বানের কবল থেকে এক আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাওয়ার ব্যাপারে পরিষ্কার নির্দেশনা দেয়া হচ্ছে। তো, মেসেজটা কী দাঁড়ালো? খাই-দাই আর কোন কাজ না থাকায় এতগুলো ভিত্তিসহ শক্ত প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও যে মানুষ “আন্দাইজ্জা” ভিত্তিহীন ধারণা করে যে, কুরআন শাইত্বানের পক্ষ থেকে আসছে, তারে কি এখন সকাল-বিকাল তিনবেলা বেত দিয়ে ট্রস-ট্রস করে পিডানো দরকার না?

আরে, কুরআন যদি শাইত্বানের পক্ষ থেকে আসা কিছু হইতো, মুহাম্মাদ যদি শাইত্বানের কথামতো চলে মিথ্যা কথা বলতো, তাহলে কি সেই কুরআনেই আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাওয়ার কথা শেখানো হত? তাও আবার খোদ শাইত্বানের কাছে থেকেই আশ্রয় চাওয়ার কথা? নিজেকে কি কেউ নীচু তুচ্ছে ভিলেন হিসেবে তুলে ধরে প্রতিপক্ষকে শক্তিশালী আর প্রার্থনার যোগ্য হিসেবে বারবার প্রমাণ করতে চায় কখনো? অথচ পুরো কুরআন জুড়ে কি বারবার আল্লাহ এই কথাটাই আমাদের শেখাচ্ছেন না যে, সত্য অনুসরণ করে, সুস্থ-পবিত্র হৃদয়ের অধিকারী হয়ে পরিপূর্ণ একজন মানুষ হয়ে ওঠার সাধনার পথে তীব্র আক্রমণের উদ্দেশ্যে ওঁত পেতে থাকা শাইত্বান আমাদের প্রকাশ্য শত্রু? যে কুরআন শাইত্বানকেই চিরশত্রু আর জঘন্য ক্রিমিনাল হিসেবে বারবার প্রেজেন্ট করে সেই কুরআন শাইত্বানের পক্ষ থেকে? যে নবী সল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম সারাজীবন শাইত্বানের বিরুদ্ধে বিজয়ী আত্মার ধারক হবার জন্য, শাইত্বানের ফাঁদ এড়িয়ে নিষ্কলুষ পবিত্র থাকবার জন্য কিভাবে খেতে হবে, কাপড় পড়তে হবে, ঘুমাতে যেতে হবে, ওয়াশরুমে যেতে হবে সবকিছু অতিযত্নে ডিটেইলসে শিখিয়ে গেলেন সেই নবী মুহাম্মাদ নাকি শাইত্বান দ্বারা প্রতারিত হয়ে কুরআন বলসে! সিরিয়াসলি! এইসব বোগাস কথাবার্তা কোইত্থে আসে মাইনষের মাথায়?

-আসলে ঐভাবে পড়ি নাই পুরো কুরআন এখনো। চিন্তাও করি নাই। তোমার কথায় ব্যাপারটা ক্লিয়ার হইসে এবার পুরোপুরি। শান্তি লাগতেসে একটু।

-আলহামদুলিল্লাহ। এটার ক্রেডিট পুরোপুরি আল্লাহর। আর তুই এখনো কুরআন পুরোটা বুঝে পড়িস নাই বলে যে লজ্জাটা পাইতেসস, এই লজ্জা, এই দায়িত্ববোধ যদি আল্লাহর প্রতি নিজেকে পুরোপুরি সমর্পিত দাবী করা মানুষগুলোর মধ্যে, অর্থাৎ নিজেকে মুসলিম দাবী করা ফাঁপা মানুষগুলোর মধ্যে একটা ফোঁটা থাকতোরে ভাই, তাইলে আজকের দুনিয়ায় এত অন্যায়-অবিচার থাকত না।

-থ্যাঙ্ক ইউ সো মাচ ভাইয়া। তুমি কিন্তু প্রথম পয়েন্ট, অর্থাৎ উনি যে মিথ্যাবাদী ছিলেন না, সত্যবাদী ছিলেন, এটা পুরোপুরি প্রমাণ করে ফেলসো। আবারো থ্যাঙ্কস আ লট ভাইয়া। তুমি যে আমার কী উপকার করতেসো, তুমি নিজেও জান না!

-মোটেও না ভাই। থ্যাঙ্কস আসলে তোর প্রাপ্য, এই কারণে যে তোকে কথাগুলো বলার মাধ্যমে আমি নিজের উপকার করার, নিজেরে বাঁচানোর একটা সুযোগ পাইসি। আলহামদুলিল্লাহ। অন্যথায়, জাজমেন্ট ডের দিন আটকায়ে যাইতাম পুরাই।

-কীরকম?

-দ্যাখ, মুহাম্মাদ সল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লামের পর কিয়ামাতের আগ পর্যন্ত, আই মীন পৃথিবীর শেষ সময় পর্যন্ত আর কোন নবী-রাসুল আসবে না সত্য চেনাতে, বুঝাতে। নিজের মূল্যবান জীবনকে বাজি রেখে, উৎসর্গ করে হলেও মানুষগুলোকে মিথ্যা থেকে, শাইত্বানের ধোঁকা থেকে অনন্তের মহাধ্বংসের দিকে নিজেকে ঠেলে ফেলা দেয়া থেকে বাঁচিয়ে সত্যের দিকে ফেরাতে আর কোন ঐশীবাণীর ধারক আসবে না। এই মহান দায়িত্ব তাই সবার আগে এখন আমাদের উপর, অর্থাৎ নিজের ইচ্ছেকে বুঝে শুনে সমর্পন করা মুসলিমদের উপর বর্তায়।

নবিজী সল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লামের দেখানো উপায়ে কুরআনের পবিত্র আর শক্তিশালী বাণীকে-বার্তাকে নিজের জীবনে-চরিত্রে প্রতিফলিত করার মাধ্যমে, আত্মার শুদ্ধি আর হৃদয়ের পবিত্রতা অর্জনের মধ্য দিয়ে মনুষ্যত্বের পূর্ণতায় পৌঁছানোর দায়িত্ব আমাদের সবার উপরেই আছে। তোর উপরেও।

কারণ, উনিই সর্বশেষ নবী, যেহেতু আর কোন নবী-রাসূল আসবেন না।

অতএব, উনার আগমণের মাধ্যমে, পরিশুদ্ধ হয়ে পবিত্রভাবে জীবনকে যাপনের জন্য উনাকে দিয়ে কুরআনের পবিত্র বাণী আর জীবনে চলার নীতিমালা প্র্যাক্টিক্যালি শেখানোর মধ্য দিয়ে পূর্বের সব বার্তাবাহক-শিক্ষক, নবী-রাসূলের আনীত একমাত্র বার্তা “লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ” অর্থাৎ আল্লাহ ছাড়া আর কোন যোগ্য উপাস্য নেই- এর পূর্ণতা সাধিত হয়েছে। এবং সেই একমাত্র যোগ্য উপাস্যের সঠিক উপাসনার লক্ষ্যে সঠিক ও পরিপূর্ণ দাস হয়ে উঠার প্রক্রিয়ায় যাবতীয় প্রয়োজনীয় উপাসনা আর প্রতিদিনকার জীবন-যাপনের সঠিক নিয়ম-কানুন শেখানো হয়েছে হাতে-কলমে। প্র্যাক্টিক্যালি দেখানো হয়েছে, কিভাবে ইন্দ্রিয়জাত শারীরিক-মানসিক দূর্বলতাকে জয় করে পুরোপুরি মানুষ হয়ে উঠতে হয়, অপবিত্রতার উর্ধ্বে নিজেকে তুলে আনতে হয়। এবং সেই সাথে পথহারা পথিকদেরকেও ঠিক পথে তুলে আনার দায়িত্বটা, তাড়নাটা তীব্রভাবে বোধ করার জন্য শুদ্ধ হৃদয়ের অধিকারী হতে হয়, মানুষের প্রতি ভালবাসা অনুভব করতে হয়।

ভাইরে, আমার কাজ তো একটাই হওয়ার কথা ছিল। আর সেটা হচ্ছে, উনার দেখানো উপায়ে দৈনন্দিন জীবনের প্রতিটা কাজ করা, প্রতিটা উপাসনার ভেতর দিয়ে শুধুমাত্র এক-অদ্বিতীয় মহামহিম আল্লাহর দাসত্বের মাধ্যমে যাবতীয় দাসত্বের শেকল থেকে নিজেকে মুক্ত করে, নিজের স্পিরিচুয়াল পটেনশিয়ালের সর্বোচ্চ ব্যবহার করে, শারীরিক পশুত্বের খোলস ভেঙ্গে, ইন্দ্রিয়ের ইন্দ্রজাল ছড়ানো পশুত্বকে বশ করে তারই উপর চড়ে বসে, তাকে ঠিক উপায়ে নিয়ন্ত্রণ করে তার একমাত্র মালিক আল্লাহর সন্তুষ্টির দিকে চালিয়ে নেয়া- এইতো মানব জীবনের আসল লক্ষ্য।

শোন হৃদয়, আমার দায়িত্ব ছিল মুসলিম হিসেবে সেই পূর্ণাঙ্গ মানুষ হয়ে উঠার সাধনায় নিজের প্রবৃত্তিকে কুপোকাত করে বিজয়ী হওয়া। কথা ছিল, এমন এক পবিত্র আর ঐশী সৌন্দর্যমাখা অপরূপ চোখ শান্ত করা চরিত্রের বিনয়ী ধারক হওয়া, যেন আমাকে দেখে অন্যদেরকেও বিজয়ী হওয়ার সুন্দরতম আগ্রহ পেয়ে বসে। শাইত্বানকে হারিয়ে সত্যকে জেনে নিয়ে মেনে নেবার আগ্রহ হৃদয়কে জেঁকে ধরে, পূর্ণ হবার অস্থিরতায় ডুবিয়ে দেয়।

কিন্তু জানস ভাই, এত অন্ধকার আর পঙ্কিলতায় সারাটা জীবন হেঁটেছি যে নিজের আঁধার আর নোংরা থেকে পরিষ্কার হতেই বোধহয় এক জীবন পেরিয়ে যাবে। দৈনন্দিক অভ্যস্ততা, নিয়ন্ত্রণহীন মানস, মায়াজাল ছড়ানো ইন্দ্রিয়, জাপটে থাকা সমাজের বানোয়াট ধ্বংসাত্মক সিস্টেম আর অজস্র মনগড়া বিমূর্ত ঈশ্বরের পায়ে পূজো দেবার অভ্যাস থেকে পুরোপুরি কবে বেরুনোর সৌভাগ্য এই জীবনে আদৌ হবে কিনা জানি না।

তবে জানিস হৃদয়, বড্ড সাধ হয়। বড্ড ইচ্ছে হয়, সব মিথ্যের দাসত্ব থেকে বেরিয়ে একমাত্র আরাধ্যের আরাধনায় পূর্ণ হতে। পূর্ণ দাস হয়ে একজন সত্যিকারের পরিপূর্ণ মানুষ হবার জন্য আত্মার মাঝে গুঁজে দেয়া সবক’টা ভাইরাস-আক্রান্ত সফটওয়্যারকে রিস্টার্ট করতে। মরো-মরো হৃদয়টার উপরে স্তুপ হয়ে জমা এক পর্বত থকথকে দুর্গন্ধময় জঞ্জাল দু’হাতে সরিয়ে, ধুয়ে, পরিষ্কার করে, জন্মকালে ঠিকঠাক থাকা মনুষ্যত্বের পবিত্র স্বাদকে একবার অনুভব করতে খুব ইচ্ছে হয় জানিস, খুব!

কিন্তু বিশ্বাস কর হৃদয়, পারছি না। নিজেকেই পথে ঠিক রাখতে পারছি না ভাই। মুসলিম হবার পরে যাকে দেখে অন্যদের খাতার উত্তরগুলো ঠিক করে নেয়ার কথা, তার খাতাই যে সব ভুল উত্তরে ভরা! এত শত-কোটি ভুল উত্তর মুছে নিজের প্রতি দায়িত্বগুলো ঠিক করতে করতেই পুরো জীবনটা মুছে হারিয়ে যাচ্ছে সময়ঘড়ি থেকে। অন্যদিকে, নিজে ঠিক পথে হেঁটে সবাইকে সেই পথের কথা জানানোর যে বিশাল এক পবিত্র দায়িত্ব কাঁধে চেপে আছে, সেই দায়িত্বের ব্যাপারে যে কঠিন বিচারের মুখোমুখি হতে হবে, পাইপাই হিসেব বুঝিয়ে দিতে হবে, ভাবতেই সারা গা আতঙ্কে শিউরে উঠছে! সঠিক সুবিচার হলেতো পার পাবো নারে হৃদয়, অথচ নিখুঁততম সুবিচারই করা হবে সেইদিন। কী ভয়ংকর বিপদে পড়বো সেইদিন, বুঝতেসস হৃদয়? নিজেকে ঠিক না করায়, প্লাস মানুষের প্রতি দায়িত্ব পালন করতে না পারায় ঠিক ঠিক ধরা খাব। জাস্ট মুসলিম হইসি ঘোষণা দেয়ায়, ঢ্যাং ঢ্যাং করে হেঁটে সর্বোচ্চ অকল্পনীয় চোখ ধাঁধানো চিরস্থায়ী পুরষ্কার জান্নাতের ভিসা-টিকেট পেয়ে যাব, এত সস্তা নারে ভাই, এত সস্তা না। অথচ সবাই এই ভুল স্বপ্নেই বিভোর।

এজন্যেই তোকে থ্যাঙ্কস দিচ্ছিলাম। কারণ, তোকে কিছু কথা বলতে পারায় হয়ত শেষ বিচারের ভয়াবহ সেই দিনে মাথা নীচু করে থরথর করে কাঁপতে কাঁপতে নিজের দোষ স্বীকার করবার সুযোগটা অন্তত পাব। কে জানে, আজকের বলা এই শব্দগুলোর দিকে তাকিয়েই হয়তবা আমার মালিক আমাকে ক্ষমা করে দিয়ে ছেড়ে দিবেন, আমার রাসুল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাকে জড়িয়ে ধরবেন, আর আমি হাউমাউ করে কেঁদে ফেলব তীব্র আনন্দে। এইটুকু আশার বুকে থাকাতেই যে এখনও বেঁচে থাকা, নিঃশ্বাস নেয়া, আর হেঁটে যাওয়া।

যাহোক, অনেক কথা বলে ফেললাম তোকে। কাল বিকালে বাসায় চলে আয়। তোকে সেঁকা পরোটা দিয়ে মুরগীর স্যুপ আর কাপ ন্যুডলস খাওয়াব। সাথে ধোঁয়া ওঠা ব্ল্যাক কফি। খাওয়ার ফাঁকে ফাঁকে মুহাম্মাদ সল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম যে পাগল বা মানসিক ভারসাম্যহীন ছিলেন না সেটাও আলোচনা করে ফেলা যাবে। এই সেকেন্ড পয়েন্টটা বুঝে ফেললেই দেখবি তিন আর চার নং পয়েন্ট ঝরঝরে হয়ে গেছে আর শান্তি লাগছে। তখন ঠান্ডা মাথায় সবকিছু নিয়ে বসতে পারবি। ভাবতে পারবি। আজ রাখি তাইলে। ফী আমানিল্লাহ।

ওপাশে ফোন কেটে দিল ভাইয়া। আর এপাশে হাতের মুঠোয় তপ্ত হয়ে ওঠা মোবাইলটা বিছানায় ছুঁড়ে দিয়ে লাল হওয়া চোখ আর গাল মুছতে মুছতে দ্রুত ওয়াশরুমে ঢুকে পড়লো হৃদয়। চোখটা এত পোড়ায় কেন, ও পোড়া চোখ সমুদ্রে যাও।

Posted in Uncategorized

কাহাফের ২৮

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লামের সত্য নবী হওয়ার ব্যাপারে যারা উনার জীবনীর ঘটনাবলী কানেক্ট করে ভাবতে শিখেছেন লাস্ট পোস্টটা পড়ে, বুঝেছেন, তাদেরকে এবার একটা অনুশীলন দিই কুর’আন থেকে, ওকে?
.
কুর’আন থেকে সুরা কাহাফে যান। আমার অসম্ভব প্রিয় আয়াতটা বের করেন, আই মীন, ২৮ নং আয়াত আর কি! এইবার ভাবেন। কমেন্ট করিয়েন না।
.
ভেবে বের করেন-
“কিভাবে এই আয়াতটা প্রমাণ করে যে রাসুলুল্লাহ একজন সত্য নবী ছিলেন, মিথ্যাবাদী ছিলেন না?”
উত্তরটা আমি দিব না কিন্তু! আর আপনি কমেন্ট করলে, উত্তর দিলে ডিলিট করে দিব (ব্লকও মারবার পারি)!
.
উত্তরটা বুঝলে, ঈমান বেড়ে যাবে। কুর’আন যে ঐশী গ্রন্থ তা আবারও বুঝে ফেলবেন, সুন্নাহ ছেড়ে আর থাকতে পারবেন না, অসহ্য লাগবে, আল্লাহকে ভালবেসে ফেলবেন আরো একটু। কাজেই, এই উত্তর প্রাপ্তির অনুভূতিটা আপনার আর আপনার রবের মাঝেই স্মরণীয় হয়ে যেন থাকে, কৃতজ্ঞতার বাঁধনে।
.
হয়তো আজ থেকে রাতগুলো তাহাজ্জুদে কেঁদে কেঁদে কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করতে থাকবেন আর আমাকেও হৃদয়ের কুটিরে, চোখের পানিতে আর আন্তরিক দুয়াগুলোর মূহুর্তে…
বুঝেনইতো!

Posted in Uncategorized

ফিরি

অন্যায়কারী আর প্রত্যাবর্তনকারী।
.
বান্দা হিসেবে মালিকের কাছে আমরা জাস্ট এই দুই দলেই বিভক্ত।
.
অন্যায়, গুনাহ, অবাধ্যতার পরেও বুঝে নিয়ে অনুতপ্ত হয়ে, কেঁদে, মাফ চেয়ে আল্লাহর কাছে ফিরে না আসাটা হচ্ছে আরও বড় অন্যায়, বড় গুনাহ আর বড় অবাধ্যতা।
.
মনে রাখি, আমরা সবাই-ই অন্যায়কারী, গুনাহগার।
এই গুনাহগার আমাদের মাঝে শুধু প্রত্যাবর্তনকারীরাই আল্লাহর সন্তুষ্টির কারণ হবো, তাঁর পূর্ণ ক্ষমা আর বেহিসাব পুরষ্কারপ্রাপ্ত হবো। ইন শা আল্লাহ।
.
তবুও কি ফিরবো না?

Posted in Uncategorized

এগিয়ে যাও

-নিঃসঙ্গ একাকী মানুষেরা এগিয়ে গেল।
-নিঃসঙ্গ একাকী মানুষেরা কারা ইয়া রাসুলুল্লাহ?
-আল্লাহর বেশি বেশি যিকরকারীগণ।
.
সহীহ মুসলিমের যিকর অধ্যায়
রাহে বেলায়েত, পৃষ্ঠা ৭১

Posted in Uncategorized

অপরিচিত

#এক
গ্রীস। সবচাইতে সুস্থ মানুষটার হাতে তুলে দেয়া হলো মরণবিষ। হেমলক। বিদায় নিলেন সক্রেটিস।
.
#দুই
ক্রুদ্ধ জনতা। ভয়ানক ক্ষিপ্ত। মেরেই ফেলবে উনাকে খুঁজে পেলে। পিটিয়ে, ছিলিয়ে, আঘাতে আঘাতে চেঁছে ফেলবে। কাঠের তক্তায় ক্রুশ বানিয়ে হাতে পায়ে পেরেক ঢুকিয়ে ঝুলিয়ে রাখবে না মরা পর্যন্ত। মানুষটাকে কি ওরা খুঁজে পেয়েছিলো? পেলে কি করতো জানোতো? জিসাস অর্থাৎ সেই ‘ঈসার কথা বলছি। চিনতে পেরেছোতো উনাকে? ‘আলাইহিসসালাম।
.
#তিন
সবাই আপোষ করেছিলো। বলছিলো, এটা হিকমাহ। তিনি তাকীয়া করাকে হিকমাহ বলে মাথা নুইয়ে দেননি। বৃদ্ধ শরীরটা এতো অত্যাচার নিতে পারেনি। বিধ্বস্ত মৃত শরীর বেরুলো কারাদ্বার দিয়ে, তবুও আত্মা নত হয়নি। আহমাদ ইবনে হাম্বল। রাহিমাহুল্লাহ।
.
#চার
পাথরে পাথরে গা ব্যথা করছে। রক্তে জবজব। এতো অপমান! এতো তীব্র ব্যথা পঞ্চাশোর্ধ সম্মানিত সেই মায়াময় মানুষটার সর্বাঙ্গে। ক্লান্ত দেহটাকে আর টানতে না পেরে বসে পড়লেন। নিজেকেই দায়ী করে আশ্রয় চাইলেন স্রষ্টার কাছে। প্রার্থনা করলেন তীব্র নৃশংসভাবে অত্যাচার করা মানুষগুলোর পথপ্রাপ্তির উদ্দেশ্যে। সবটুকু আন্তরিকতা আর ভালোবাসায়। হৃদয় নিংড়ে। এতো দয়া, সুতীব্র ভাসিয়ে দেয়া ভালোবাসা আর সুমহান মানসিকতার সাক্ষী রক্তে ভেজা যমীন আর কখনো হয়নি। হবেও না। সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া আলিহি ওয়া সাহবিহী ওয়া সাল্লাম।
.
#শূন্য
যুগের পর যুগে সবচেয়ে সুস্থ, বিবেকবান আর মানবিক মানুষগুলোর পরিণতি, সামাজিক অবস্থান ছিলো এমনই। সবচেয়ে সুস্থরাই সমাজে সবচাইতে অপরিচিত, উদ্ভট হয়। আকস্মিক আগন্তুক হয়ে বেঁচে থাকে। এটাই নিয়ম।
.
আচ্ছা, তোমাকে কি সমাজ বাহবা দেয়? প্রশংসিত, ভালো অবস্থানে আছো নাকি তুমি সমাজের রীতিনীতিতে? তাহলে তোমাকে আমার অভিনন্দন রইলো এই লেখার কিচ্ছুটি না বুঝে ভেতরে ভেতরে তীব্র বিরোধীতায় উসখুস করবার জন্যে। আমি লজ্জিত তোমার সাথে যোগাযোগের ভাষাটা শিখতে পারিনি বলে।
.
আমাকে ক্ষমা করে দিও। ভালো থেকো। যেটাকে তুমি ভালো থাকা বলে ভাবো, সেই অবিরাম অপদস্থতার বন্দী জিন্দেগীতে তুমি ভালো থেকো।

Posted in Uncategorized

আমার ঈমান!

“তোমাদের মধ্যে কেউই ততক্ষণ পর্যন্ত ঈমানদার হতে পারবে না” বাক্য দিয়ে বেশকিছু পবিত্র আয়াত আর হাদীস আছে।
.
ঈমানের এই ঐশী লিটমাস টেস্টগুলোর প্রত্যেকটাতেই আমি ধরা খাই। প্রত্যেকটাই আমাকে টুকরো টুকরো করে গুঁড়িয়ে দেয়। নিজের ক্বলবের ভেতরের তীব্র শূন্যতা আর ঘন অন্ধকার হিংস্র দাঁত বের করে খলখল করে পৈশাচিক হাসি হাসতে থাকে, আর আমি আরো কুঁকড়ে যাই। হারিয়ে যাই। এই অবিরাম যুদ্ধে প্রতিবার বিধ্বস্ত পরাজয়ের বিশাল ক্রমধারা কি কখনোই শেষ হবে না? চারপাশের ঈমানদারদের ‘আমল-ঈমান দেখে আরো বিষন্ন লাগতে থাকে। সবাই এগিয়ে যাচ্ছে তাদের রাব্বের দিকে, উনার সন্তুষ্টির পথে, আর আমি?
.
আমার কথা থাকুক।

যাওয়ার আগে হাদীসটা* বলে যাই।
.
আবূ মুহাম্মাদ আব্দুল্লাহ্ ইবনু আমর ইবনুল আস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমা হতে বর্ণিত, তিনি বলেন- রাসূল সাল্লাল্লাহু আল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
.
“তোমাদের মধ্যে কেউই ততক্ষণ পর্যন্ত ঈমানদার হতে পারবে না, যতক্ষণ না আমি যা এনেছি তার প্রতি তার ইচ্ছা-আকাঙ্খা অনুগত না হয়ে যায়।”
.
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম যা কিছু নিয়ে এসেছেন, তা আমরা মেনে নিয়েছি, ঠিক আছে। কিন্তু আমার প্রবৃত্তি, আমার সব ইচ্ছা-আকাঙ্খা কি উনি যা কিছু এনেছেন তার অনুগত হয়ে গেছে? সত্যি?
.
মৃত্যু আমাদের খুব নিকটেই। আমরা জাস্ট ব্যাপারটা ভুলে ছিলাম। মৃত্যুর পর বিচার দিবসে ভিতরের সব বাস্তবতাই প্রকাশিত হয়ে যাবে। তার আগেই, প্রশ্নটার উত্তর নিজের ভিতরে খতিয়ে সৎভাবে দেখি আজ।
………………..
*আল আরবাউনান নাবাবিয়্যাহ, ৪১।
হাদীসটি সহীহ। কিতাবুল হুজ্জাহ্ থেকে হাদীসটি সহীহ্ সনদের সাথে বর্ণনা করা হয়েছে।

“তোমাদের মধ্যে কেউই ততক্ষণ পর্যন্ত ঈমানদার হতে পারবে না” বাক্য দিয়ে যতগুলো আয়াত আর হাদীস আছে, কারও কাছে “সবগুলো” আয়াত-হাদীস এক জায়গায় গুছানো থাকলে আমাকে দিয়েন প্লিজ।

Posted in Uncategorized