প্রিয় দশটি বই

১. পবিত্র আল-কুরান

quran

এই অসাধারণ বইটির সাথে আমার অসাধারণ সব ঘটনা জড়িয়ে আছে। এই বইটা পড়েই আমি পূর্ণাঙ্গ নাস্তিক হয়ে গিয়েছিলাম। পরে জেনেছি, আমি যে অনুবাদটা পড়েছিলাম সেটাতে ভয়াবহ কিছু সমস্যা ছিলো। এরপর থেকেই অনুবাদ ব্যাপারটা আমার ঠিক পছন্দ না। অনুবাদ পড়লেই সারাক্ষণ ঠকে যাচ্ছি বলে অনুভূতি হয়। তিন বছরের নাস্তিকতার পর, আবার এই বইটা পড়েই আমার ইসলামকে নতুনভাবে আবিস্কার করা হয়। আসলে এর আগে জীবনে কোনদিন জানতামই না ইসলাম আসলে কি? যাইহোক, আমার জীবন ১৮০ ডিগ্রী ঘুরিয়ে আমাকে আমূল বদলে দিয়েছে এবং দিচ্ছে এই বইটি। তাফসীরের লেকচারগুলো [ব্যাখ্যা] শুনে তো এমেইজড হয়ে থাকিই, আয়াতগুলোর অনুবাদ পড়েও মাঝে মাঝে তব্দা খেয়ে যাই। প্রতি আয়াতে আয়াতে, প্রতি বাক্যে বাক্যে [বাক্য আর আয়াত এক নয়], প্রতিটা শব্দে এত এত অসাধারণত্ব লুকিয়ে থাকা সম্ভব, সেটা আমি কোনদিনই জানতাম না, যদি নিউট্রালি আর মন থেকে এই বইটাকে এক্সপ্লোর না করতাম। এখনো এই বইটার কিছুই জানিনা, এখনই আমার এই অবস্থা, আরো জানলে যে কি হবে ভাবছি। এই বইটা নিয়ে লিখতে গেলে আলাদা একটা নোট লিখতে হবে। কি অদ্ভূত! অন্য জগত থেকে আমাদের সব মানুষের জন্যে একটা বই পাঠানো হয়েছে, নিউট্রালি না পড়লে এই বই-ই উল্টো মেসেজ দেয়, সেভাবেই বইটা ডিজাইন করা; আবার শব্দের পরতে পরতে ম্যাজিক, বিজ্ঞানে উৎসাহ দেয়া, মানুষের চরিত্র আগাগোড়া ঠিক করে দেয়া, জগতের সত্য জানিয়ে দেয়া, বিজ্ঞান, দর্শনে আর সাহিত্যে এত তীব্র দখল, একটা বইয়ে এত শিল্প আর কখনো দেখা সম্ভব না। যারা পড়েনি তাঁরা যে কি মিস করছেন এখনো জানেন না। সারা জীবনের আফসোস হয়ে থাকবে পুরোটা একবার বুঝে না পড়লে। দুনিয়ার কোন অনুবাদই মূল লেখার পূর্ণ স্বাদ আর অর্থ দিতে পারেনা, এটা বুদ্ধিমান মাত্রই স্বীকার করে নেয়। আল-কুরানের যতগুলো অনুবাদ পড়েছি তার মাঝে আমার কাছে বেস্ট মনে হয়েছে M.A.S. Abdel Haleem এর অনুবাদ করা The Quran.

২. তহাফুত আল-ফলাসিফা [The Incoherence of The Philosophers] – আল গাজালী

2

পাশ্চাত্য বস্তুবাদী দর্শন আর কিছু ভূল দর্শনের যে জংলী ভূত আমার মাথায় চেপেছিলো, সেটাকে ধুয়ে মুছে সাফ করে আমাকে সঠিক জায়গায় পৌঁছাতে সাহায্য করেছিলো এই বইটি। আজীবন কৃতজ্ঞ থাকবো লেখকের প্রতি এই বইটার জন্যে। এখন লেখকের আরেক মাস্টারপীস মাক্বাসিদ আল-ফলাসিফা [Aims of The Philosophers] এর খোঁজে আছি।

৩. এহইয়াউ উলুমিদ্দীন- আল গাজ্জালী

3

এটার কি কি অবদান আমার জীবনে? বলা সম্ভব না। বলতে গেলে সমগ্র ইসলাম অর্থাৎ আমাদের জীবনের প্রত্যেকটা সেক্টর আর কাজ নিয়ে আলোচনা করতে হবে। সম্ভব না।

৪. The Design of Life – William A. Dembski and Jonathan Wells

4

বেশিদূর আগাইনি, কিন্তু জানি এই বইটাই আমার বায়োলজির দর্শনে ব্যাপক রিভোলিউশান ঘটাবে। অলরেডি ঘটাচ্ছে।

৫. The Cell’s Design – Dr. Fazale Rana5

৬. The Signature in The Cell – Stephen C. Meyer

6

মলিকিউলার বায়োলজি আমাকে কি এতদিন যে কি অসাধারণ সব ব্যাপার স্যাপার শিখিয়ে এসেছে, এই বই দুইটা না পড়লে আমি এই জীবনে জানতামই না। কি অদ্ভূত হতো ব্যাপারটা!! সারাজীবন শুধু কিছু ইনফর্মেশান মাথায় নিয়েই ঘুরতাম, সেখান থেকে কোন শিক্ষা এসে আমার জীবনটাকে বদলে দিতো না। ডিগ্রীধারী অশিক্ষিত থেকে যেতাম। ওফফফ! কি বিশ্রী হতো ব্যাপারটা!

৭. Angels and Demons – Dan Brown

7

আমাকে প্রথম ভাবতে শেখায় বিজ্ঞান আর ধর্ম নিয়ে। তখন ইন্টারে পড়ি। এখনো মনে আছে, এটাই আমার জীবনের প্রথম বই যেটা একটানে শেষ করার জন্যে সারারাত জেগেছিলাম। উঠতেই পারছিলামনা। আমার চারপাশে এত এত মানুষ, সবাই কিছু না জেনে, না বুঝে, শুধু বাপ-দাদার অন্ধ অনুকরণ করে যাচ্ছে, আর আমিও সেসব অন্ধদের একজন, এটা জেনে-বুঝে বেশ নাড়া খেয়েছিলাম। জানাশোনার অ-আ-ক-খ সেখান থেকেই শুরু বলা যায়।

৮. মুহম্মদ ইবন কাসিম – নসীম হিজাজী

8

উপন্যাস এত এত্ত অসাধারণ হয়, তাও ঐতিহাসিক উপন্যাস!! কখনো ভাবিনি। আমার বই পড়ার রুচিই বদলে দেয় এই বইটা। নসীম হিজাজীর হার্ড ফ্যান হয়ে যাই এটা পড়ার পর। এই বইটা পড়ার পর আর কোনদিন আউল ফাউল উপন্যাস পড়িনি, সম্ভবত পড়তেও হবে না আর।

৯. পার্থিব – শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়

বইটা আমাকে ব্যাপক নাড়া দেয়। নারী, সে যেমনই হউন না কেন, আমার দায়িত্ব সর্বাবস্থায় তাঁকে সম্মান দেয়া, এই ব্যাপারটা হেমাঙ্গ আমার মাথায় প্রথম ঢোকায়। আরো আছে। মানুষের জন্যে, এই গ্রহের জন্যে ভালো কিছু না করতে পারি, খারাপ কিছু করবোনা, মানুষের ক্ষতির কারণ হবোনা, এই প্রতিজ্ঞা করেছিলাম এই বই পড়েই। বইটা যখন পড়ি, তখনো ইসলাম আমার কাছে অপরিচিত। এই বই পড়েই দুটো সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। প্রথমটা হলো, সিগারেট ছাড়তেই হবে। দ্বিতীয়টা হলো, কখনো ধোঁয়া যুক্ত যানবাহন কিনার মতো বিলাসী হবোনা, ধরার ক্ষতি করবোনা। যট্টুক পেলেই জীবনটাকে নরম্যালি যাপন করা যায়, ঠিক ওইটুকুতেই খুশি থাকবো। এর বাইরের সবটুকু অর্জন মানুষের উপকারে লাগানোর ট্রাই করবো। কট্টুক পেলে জীবনটাকে নরম্যালি হাসিখুশিভাবেই যাপন করা যায়? আমার হিসেবে বেশি কিছু না। মাথা গোঁজার একটা ঠাই, ঘুমানোর সময় মাথা রাখার জন্যে একটা বই, তিন বেলা খাবার, দুই সেট পোশাক, সাবান, একটা প্লেট, একটা গ্লাস, একটা স্টোভ, একটা শীতকালীন চাদর। ব্যাস! জীবনে এইটুকু থাকলেই লাইফ নিয়ে চুড়ান্ত সুখী না হয়ে উল্টো দুঃখ করাটা একটা ভয়াবহ হাস্যকর ব্যাপার হয়ে যায়।

১০. হিমুসমগ্র – হুমায়ুন আহমেদ

10

আমার জাহিলিয়্যার সময়ের তথা অজ্ঞতার যুগের পড়া বই। এখনো মনে আছে, ইন্টারের টিউশানির এক মাসের টাকার পুরোটা [৫০০টাকা] দিয়েই বইটা কিনে এনেছিলাম বলে আম্মু অনেক মন খারাপ করেছিলেন। কিন্তু আমার আনন্দ ছিলো ১৬ আনা। আমার লাইব্রেরীর কোন মেম্বার এখন পর্যন্ত এই বইটা পায়নি, কারণ আমি দেইনি। এটাই আমার লাইব্রেরীর নিয়ম। হিমুসমগ্র ধরা যাবেনা। এটা ছাড়া তারা আর সব বই-ই পড়তে পারে। আমার প্রাক-ইসলামী জীবনে এই বইয়ের প্রভাব ব্যাপক। এই বই আমাকে বলতো, এই জগত মায়া ছাড়া আর কিছুই না, এবং কারো সাথে মায়ার সম্পর্কে না জড়ানোই স্বাস্থ্যকর। মজার ব্যাপার হচ্ছে, ব্যাপারটা পুরোপুরি বুঝেছি ইসলামে এসে। সুখী কিভাবে হতে হয়, তাও এখান থেকেই শেখা। যা আছে, তাই নিয়ে আনন্দে থাকা, এটাই হচ্ছে সুখী হওয়ার মূলমন্ত্র। যে বর্তমান অবস্থা নিয়ে সুখী না, সে কোনদিনও কোন অবস্থাতেই পূর্ণাঙ্গ সুখী হবেনা। নিয়ম নাই।

অনেক অনেক প্রিয় বইয়ের নাম লিখতেই পারলাম না। প্রিয় বইয়ের লিস্ট করা প্রায় অসম্ভব। তবুও আপনি আপনার জীবনে পড়া শ্রেষ্ঠ ১০টা বইয়ের নাম বলুন। বেশিক্ষণ ভাবা যাবেনা। ১০মিনিটের মাঝে ভেবে ১০টা বইয়ের নাম লিখে ফেলুন। তারপর চাইলে কোনটা কেন প্রিয় লিখতে পারেন। ব্যাপারটা বেশ মজার। বইয়ের চেয়ে আনন্দের, রহস্যের আর মজার কি আছে দুনিয়ায়? শেয়ার করে ফেলুন আপনার ১০টাও। প্লিইইইজ।

মাঝে মাঝে ইচ্ছে হয় বই পড়া নিয়ে একটা আন্দোলন গড়ে তুলি।

Advertisements

About মুহাম্মাদ তোয়াহা আকবর

আমি মুহাম্মাদ তোয়াহা আকবর। একাডেমিক পরিচয়ে জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ার এবং একজন বায়োটেকনোলজিস্ট। আগ্রহ বিজ্ঞানে এবং গবেষণায়। তারচেয়েও বেশি পড়ানোয়। নৈতিক এবং আদর্শিক জীবনে একজন মনেপ্রাণে মুসলিম। নাস্তিকতা ছেড়ে আল্লাহ সুবহানাহুওয়াতা’আলার অশেষ করুণা আর দয়ায় ইসলামের আলো চিনে এ পথে আসতে পেরেছি ২০১২ তে। এখন শিখছি। আরো বহু দূর পথ পাড়ি দিতে হবে জানি। অনন্তের জীবনের পাথেয় কুড়োতে বড্ড দেরী করে ফেলা একজন দূর্ভাগা হিসেবে নয়, বাঁচতে চাই সোনালি দিন গড়ার প্রত্যয়ে। ক্ষণিকের বালুবেলায় যে কটা মুক্তো কুড়োতে পারি সেই তো আমার লাভের খাতার শব্দমালা। হাঁটার পথে একটা দুটো মুক্তোর কথা, উপলব্ধির কথা লিখবো বলে এখানে পতাকা পুঁতেছি। আমি থাকবোনা একদিন। আমার খুঁজে পাওয়া কিছু মুক্তো হয়তো থেকে যাবে জন্ম থেকে জন্মান্তরে। হয়তো হবে কারো আলোর মশাল। আর সে আগুন ছড়িয়ে যাবে সবখানে।
This entry was posted in Uncategorized. Bookmark the permalink.

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s