আমি ভন্ড নইতো?

হঠাৎ করে একটা ধাক্কা দেয়া চিন্তা মাথায় আসলো। সেটা হলো নিজের মুনাফিক্বী বা ভন্ডামী নিয়ে। বুঝিয়ে বলি।

আমি বিশ্বাস করি আর নাই বা করি, মানি আর নাই বা মানি, এটাই সত্য যে মহাপবিত্র আল-কুরআন এক আল্লাহর বানী, এবং সরাসরি আল্লাহর কাছ থেকেই দুনিয়ায় এই বাণী এসেছে। এটাই সত্য এবং অলরেডী প্রমাণিত। পবিত্র কুরআন নিজেই নিজের প্রমাণ। আমরা নিজেদের মুসলিম বলে দাবী করি। আমাদের মাঝে কেউ by chance আর কেউ by choice মুসলিম। যেমন মুসলিমই হই না কেন, যদি “মুসলিম”ই হয়ে থাকি অর্থাৎ যদি ইসলামকেই আমার এই জীবনটাকে যাপিত করার একমাত্র পথ হিসেবে জানি এবং পালন করে থাকি, তাহলে আমরা এই একটা ব্যাপার কমবেশি জানি, প্রমাণ পেয়েছি এবং মনেপ্রাণে স্বীকার করি।

তাহলো, আল-কুরআন অবশ্যই অবশ্যই অবশ্যই দুনিয়ার কারো পক্ষে লেখা সম্ভব নয়। এই ফাইনাল আর কমপ্লিট রিভিলেশানের প্রত্যেকটা বাক্য, শব্দ, এমনকি অক্ষরগুলোও একমাত্র এবং কেবলমাত্র সবকিছুর ডিজাইনার আল্লাহর কাছ থেকেই এসেছে, অবিকৃত রয়েছে এবং শেষ পর্যন্ত এভাবেই থাকবে।

ঠিক?

যদি একমত হই তাহলে নিজের জন্যে এই প্রশ্নটা। আমি যদি সত্যিই পড়াশোনার মাধ্যমে খুঁজে পেয়ে, প্রমাণ পেয়ে বা না পেয়ে মনেপ্রাণে বিশ্বাস করি যে এই কুরআন দুনিয়ার বাইরের এক সত্ত্বার কাছ থেকে আমাদেরকে গাইড করার জন্যে, আমাদেরকে জ্ঞান দেয়ার জন্যে এবং সঠিক পথে পরিচালনা করার জন্যে পাঠানো হয়েছে তাহলে তাঁর প্রতিফলন আমাদের জীবনে থাকবে। সবচেয়ে বড় প্রতিফলনটা কোথায় থাকবে? প্রশ্নটা নিজেকেই করতে হবে। নিজের বিবেকের জন্যে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখানেই থাকবে যে আমি কি নিয়মিত আল-কুরআন শিখছি? একটু একটু করে হলেও? আমি কি প্রতিদিন একটু একটু করে হলেও এর ভাষা শিখার চেষ্টা করছি? শিখার জন্যে কোন স্কলার বা উস্তাযের কাছে যাচ্ছি? সেটাও সম্ভব না হলে এই যে ইংরেজীতে, এমনকি এখন বাংলাতেও অনলাইন এবং অফলাইনে এত সহজে কুরআন শিক্ষার এবং বোঝার কোর্স আছে তাতে কি এনরোল করেছি, বা করছি? আমি কি সত্যিই এই অসাধারণ বইটাকে এতদিন জানার ট্রাই করেছি যেটা আমাকে, আমার চারপাশের মানুষকে গাইড করার কথা? যে অসাধারণ বাণী আমি নিজে জেনে, বুঝে নিজের লাইফে প্রাণেপণে এপ্লাই করার কথা, পাশাপাশি এই যে দুনিয়ার সমগ্র মানুষের জন্যে যে কুরআন এসেছে তাদেরকে এই কুরআনের শিক্ষা পৌঁছে দেয়ার কথা, সেই কুরআন কি আমি নিজে শিখেছি, শিখছি, বা অন্তত শেখার চেষ্টা কি করছি? আমার সাথে সেই কুরআনের প্রতিদিনের সম্পর্ক কেমন? আন্তরিকতার নাকি ধুলার আস্তরণের? শুধুমাত্র কুরআন তিলাওয়াতের কথা বলছিনা, বলছি শেখার কথা, মূল এরাবিকে নিজের রাব্বের প্রতিটা বাণী বোঝার কথা, বোঝার চেষ্টার কথা।

দ্বীনের শিক্ষা আমাদের উপরে ফরজ করা হয়েছে। জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ার হলাম কি না, বায়োটেকনোলজিস্ট হলাম কি না, কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার হলাম কি না বা শক্ত একটা ক্যারিয়ার গড়লাম কি না সেটা নিশ্চয়ই এবং অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। তবে সেটা মরণের ঠিক আগ পর্যন্ত ইম্পরট্যান্ট। পেট চালানোর জন্যে, এই ৫০-৬০বছরের পিচ্চি লাইফটার জন্যে ইম্পরট্যান্ট। অনন্তকাল যেখানে থাকবো সেখানের প্রিপারেশানের জন্যে এই দ্বীনের শিক্ষা কম্পালসারি। এই দ্বীনের শিক্ষাই পারে আমাদের ক্যারিয়ারের কষ্টকে একটা মূল্য দিতে, মানুষের জন্যে কাজ করার একটা লক্ষ্য ঠিক করে দিতে। এই শিক্ষাটা শুধুমাত্র হুজুরদের জন্যে আর দাড়ি টুপিওয়ালাদের জন্যে নয়। যাদের কাছে মরণ আসবে এটা তাদের সবার জন্যেই গুরুত্বপূর্ণ।

কম্পালসারি আর ফরজের কথা বাদ ই দিলাম। কমনসেন্স কি বলে? যদি আমি সত্যিই বিশ্বাস করি যে কুরআন আল্লাহর কাছ থেকে এসেছে, আমাকে গাইড করার জন্যেই এসেছে, এর কথাগুলো আমার জন্যেই, আমার জীবন কে ঠিকভাবে চালনা করার জন্যেই, তাহলেই কি অটোমেটিক এই কুরআন শেখার জন্যে পাগলের মতো দৌঁড়ানোর কথা না? আমার প্রভু, আমার আল্লাহ আমাকে কি বলেছেন সেটা অনুবাদ ছাড়াই একেবারে ডিরেক্টলি বোঝার জন্যে আমার কি মাথা নষ্ট হয়ে যাওয়ার কথা না? আল্লাহ নিজেই মানুষকে কুরআন শিখতে বলেছেন, একে নিয়ে ভাবতে বলেছেন, এর আলোয় জীবন গড়তে বলেছেন। এর জন্যে আল্লাহ কুরআন কে আমাদের শিক্ষার জন্যে সহজও করে দিয়েছেন, শুধু আমাদের কে চেষ্টাটা করতে হবে। আল্লাহ আমাদের আহবান করছেন,

“আমি এ কুরআনকে উপদেশ লাভের সহজ উৎস বানিয়ে দিয়েছি৷ অতএব উপদেশ গ্রহণকারী কেউ আছে কি?” (১)

সুরা ক্বামারে আমার আপনার প্রতি আল্লাহ এই আহবান চারবার করেছেন। তবুও কি সাড়া দিবোনা?

আমার প্রিয় মানুষদের একজনের নাম হযরত ‘উমার (রাঃ)। তিনি ছিলেন দুনিয়াতেই জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত দশজনের মাঝে একজন। এরপরেও তিনি কুরআনের কিছু আয়াত পড়তেন আর ঝরঝর করে কাঁদতেন পাগলের মতো। কেন? কারণ, কুরআনে মুনাফিক্বদের কথা এসেছে। তাদের বর্ণণা এসেছে, এসেছে তাদের জন্যে সবচেয়ে খারাপ রকমের শাস্তির কথা। আমাদের চারপাশে অনেক মানুষ আছে যাদেরকে অনেক অনেক বুঝানোর পরেও, আন্তরিকতার সাথে দেখানোর পরেও কুরআনে বিশ্বাস করেনা। সবক’টা সুযোগ পাওয়ার পরেও, আল্লাহর পরিস্কার সাবধানবাণী জানার পরেও এই অবিশ্বাসীরা যখন এক আল্লাহকে মানেনা, তাঁর পাঠানো বিধানকে অস্বীকার করে, তখন তাদের জন্যে অনন্ত শাস্তির কথা কুরআনে বর্ণিত আছে। এটা আমরা সবাই কমবেশি জানি। এটা কি জানি এই অবিশ্বাসীদের চাইতেও নিকৃষ্টতম এবং জাহান্নামের সবচাইতে ভয়াবহ শাস্তি নির্ধারিত আছে মুনাফিক্বদের জন্যে?

কারা এই মুনাফিক্ব? আল্লাহর পাঠানো জীবন বিধানকে মুখে স্বীকৃতি, অন্তরে স্বীকৃতি এবং কাজের মাধ্যমে প্রকাশ এই তিনটার যেকোন একটা যদি আমার মাঝে না থাকে তাহলেই আমি মুনাফিক্ব। কেউ জেনে-শুনে-বুঝে মুনাফিক্ব। আর কেউ বুঝেইনা যে সে আসলে মুনাফিক্ব। এটাই সবচেয়ে ভয়ংকর। আপনি আমি ভাবছি, “আরিব্বাপ্রে, আমার নামটাতো ভাই মুসলমান নাম। আর নিজেরে যখন মুসলমান ঘোষণা দিছি, তাইলেতো জান্নাতের টিকিট আমার জন্যে কনফার্ম। ইয়ো কুফফারজ, গো টু হেল।” ভাই, আল্লাহ পরম করুণাময়। তাঁর করুণা আর দয়ার কোন শেষ নেই। তবে ভূলে যাওয়া যাবেনা তিনি কিন্তু একজন ন্যায় বিচারকও। আর এই কথাটাই আমাদের জন্যে সবচে’ ভয়ংকর। ন্যায় বিচার যখন তিনি করবেন, তখন কি আমরা পার পাবো? আমরা ঈমান এনেছি, আমরা সাচ্চা মুসলমান জাস্ট এই কথা বলেই কি আমরা পার পেয়ে যাবো? আল্লাহ কি বলেছেন আমাদের এই মেন্টালিটি নিয়ে?

লোকেরা কি মনে করে রেখেছে, “আমরা ঈমান এনেছিকেবলমাত্র একথাটুকু বললেইতাদেরকে ছেড়ে দেয়া হবে, আর পরীক্ষা করা হবে না? (২)

এখানেই শেষ নয়। তিনি এত করুণাময়, এত দয়া আর মেহেরবানী তাঁর যে তিনি বারবার কুরআনে আপনাকে আমাকে সতর্ক করে দিয়েছেন যাতে আমরা আমাদের মেন্টালিটি ঠিক করি, এবং অবশ্যই সফল হই, শাস্তির অন্তর্ভুক্ত না হয়ে যাই। বাতিলদের দলে না চলে যাই। তিনি আরো বলেছেন,

তোমরা কি মনে করেছো তোমরা জান্নাতে প্রবেশ করে যাবে, অথচ এখনো তোমরা সে অবস্থারসম্মুখীন হওনি, যে অবস্থার সম্মুখীন হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তী (ঈমানদার) গণ তারা সম্মুখীনহয়েছিল নির্মমতা দুঃখক্লেশের এবং তাদেরকে অস্থির করে তোলা হয়েছিল এমনকি রসূল তার সাথে যারা ঈমান এনেছিল তারা চিৎকার করে বলে উঠেছিল আল্লাহর সাহায্য কবে আসবে? (তখনই তাদেরকে সুখবর দেয়া হয়েছিল এই মর্মে যে) জেনে রাখো, আল্লাহর সাহায্য নিকটেই( 

আরো বলেছেন,

তোমরা কি মনে করে নিয়েছো, তোমরা জান্নাতে প্রবেশ করে যাবে, অথচ এখনো আল্লাহদেখেনইনি যে, তোমাদের মধ্য থেকে কে জিহাদে প্রাণ উৎসর্গকারী এবং কে সবরকারী’’ ()

কাজেই, জাস্ট “আমি মুসলিম” এটা মুখে দাবী করে, তারপর যা ইচ্ছে তা করে পার আমি পাবো না। আমাদের প্রতিদিনের ভন্ডামী নিয়ে, মুনাফিক্বী নিয়ে আমাদের ভাবতে হবে। বুঝতে হবে, ক্ষমা চেয়ে ফিরে আসতে হবে। চিন্তা করে দেখতে হবে প্রকাশ্য কিংবা অপ্রকাশ্য মুনাফিক্বী আমার ধ্বংসের কারণ হবেনাতো? আমার মধ্যে মুনাফিক্বী নাই তো? আমি কি আল্লাহর আর রাসুলের(সা) আদেশ মেনে চলি, নাকি নিজের খেয়াল খুশিমতো লাইফ লীড করি? হয়তোবা আমার দাড়ি আছে, আমি হিজাব করি, কিন্তু এগুলাতো বাইরের ব্যাপার। ভিতরে? কিংবা এমন কোন মুনাফিক্বী আমি করছিনাতো যেটাকে আমি মুনাফিক্বী হিসেবে জানিইনা? হযরত ‘উমার(রা) জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত হয়েও সেই অপ্রকাশ্য মুনাফিক্বীকেই বেশি ভয় পেতেন, ভাবতেন নিশ্চয় মুনাফিক্বীর এই ভয়ংকর আয়াতগুলো তাঁকে উদ্দেশ্য করেই বলা হয়েছে আর আল্লাহর ন্যায় বিচারের ভয়ে ঝরঝর করে কাঁদতেন আর তাঁর দাড়ি ভিজে যেতো।

আমরা এত্ত নিশ্চিন্ত অথচ আমরা কেউই জান্নাতের সুসংবাদ পাইনি। ‘উমার(রা) এর জীবন থেকে এই শিক্ষা পাই যে সুসংবাদ পেলেও নিশ্চিন্ত হওয়ার কোন সুযোগ থাকতোনা। আমরা বেশিরভাগ ‘তথাকথিত মুসলিম’ ই জেনেশুনে আল্লাহর আর তাঁর রাসুলের(সা) অবাধ্য, ফলে আল্লাহর ঘোষিত প্রকাশ্য পথভ্রষ্টদের অন্তর্ভুক্ত। এ নিয়ে আল্লাহ বলেছেন,

 

যখন আল্লাহ তাঁর রসূল কোনো বিষয়ের ফায়সালা দিয়ে দেন, তখন কোনো মুমিন পুরুষ মুমিন নারীর সেই ব্যাপারে নিজে ফায়সালা করার কোনো অধিকার নেই৷ আর যে কেউ আল্লাহ তাঁর রসূলের আদেশ অমান্য করে সে প্রকাশ্য পথভ্রষ্টতায় লিপ্ত হয়৷ (৫)

অন্যদিকে, যারা জেনেশুনে অবাধ্যতা করেননা তাঁরা হয়তো অনেক বিষয়েই না বুঝে, না জেনে অবাধ্যতা করেই যাচ্ছেন, আর প্রকাশ্য পথভ্রষ্টদের কাতারে নিজেকে অন্তর্ভুক্ত করছেন। অথচ দ্বীনের জ্ঞান থাকলে, কুরআন স্টাডির সাথে থাকলে এই চান্সটা অনেক অনেক কম থাকতো।

আমি সমাজে নিজেকে মুসলিম বলি। আসলে ভিতরে আমি কি সেটা আমি আর আমার আল্লাহই ভালো জানি। সমাজের চোখে আমি বেশ ভালো, ফেইসবুকে আমি বেশ ভালো ভালো কথা বলি, আল্লাহর আর তাঁর রাসুলের(সা) কথা বলি, তাঁর মানে এই না যে আমার মাঝে ভন্ডামী নাই, মুনাফিক্বীর বীজ নাই। কুরআন আল্লাহর বাণী, এক আল্লাহর কাছ থেকেই এসেছে, এবং সেই বানী অনুযায়ীই আমার পুরা জীবন সাজানোর কথা বলে আমি দাবী করি, অথচ নিজেই সেই কুরআনকে কখনো জানতে চাইনা, স্টাডি করিনা, শিখার চেষ্টা করিনা। এটা কি আমার ভন্ডামী না? আমি নিজের জীবনকে কুরআনের আলোকে সাজাই না যেভাবে সাজিয়েছেন রাসুলুল্লাহ(সা) আর তাঁর সাহাবারা। নানান রকম টালবাহানা করি। কেউ কুরআনের আলোয় জীবন সাজাতে বললে, কুরআনের কোন আইন মনে করিয়ে দিলে সাথে সাথে মুখ ফিরিয়ে নিই ‘পরে করবো’ বলে। এটা কি আমার ভন্ডামী না? কেউ যখন কুরআন শিখতে বলে, জানতে বলে, এবং কুরআন অনুযায়ী চলতে বলে তখন তাঁকে বলি, নিজেকে বলি, “হায়রে! আমারতো সময় নাই। কত কাজ! কত ব্যস্ততা! পরে যদি সময় পাই দেখি।” ভাইরে, আমাদের এই “পরে সময় পাওয়া” আর হবেনা। আমাকে কাফনে পেঁচিয়ে কবরে শুইয়ে আসার পরে আমার ডিপার্টমেন্ট, অফিস, ফ্যামিলি সব আবার নিজের নিয়মেই চলতে থাকবে স্বাভাবিক নিয়মে। থাকবোনা শুধু আমি। যে দুনিয়ার পিছে ছুটে আমি দ্বীন মানিনা, সেই দুনিয়ার বুকেই গর্ত খুঁড়ে যখন শুইয়ে দেয়া হবে, তখন এটাই জিজ্ঞাস্য হবে যে আমার এই জীবন দ্বীনের জন্যে ছিলো কি না? এই ক্যারিয়ার, ফ্যামিলি, বন্ধু বান্ধবের জন্যে আজ আমি সময় পাইনা। এই দুনিয়ার ব্যস্ততায় যে আল্লাহ আর রাসুলের(সা) অবাধ্যতা করে যাচ্ছি সেই অবাধ্যতাই কি ঐ জীবনের জন্যে একমাত্র সম্বল হিসেবে নিয়ে যাচ্ছি? অথচ এই দুনিয়ার নিজের এই সামান্য প্রাপ্তিগুলো কোন কাজেই আসবেনা ওই অনন্ত দুনিয়ায়। আজ থেকে নয় বছর আগে দেয়া মেট্রিক পরীক্ষার রেজাল্টটা, সাত বছর আগের ইন্টারের রেজাল্টটা ঐসময় আমার জীবন মরণ সমস্যা ছিলো। কিন্তু সেটা আজ যেমন আমার কাছে গুরুত্বহীন হয়ে গেছে, তেমনি মৃত্যুকালে পুরো জীবনে নিজের সব প্রাপ্তিকেই মূল্যহীন মনে হবে। এটা চেইনের মতো। একটার পর একটা চাওয়া আসবে, আসতেই থাকবে, এর কোন শেষ নেই। এর মাঝে কোনদিন আর সময় হবেনা। আমরা ভূলে যাই এই ভালো রেজাল্ট, প্রমোশান, চাকরী আর প্রাপ্তিগুলো আল্লাহরই দেয়া নিয়ামাত। আমি ভূলে যাই যে আমার রিজিক, এই লাইফে আমার যা যা প্রয়োজন সব আল্লাহই দিবেন। তিনি সবই ঠিক করে রেখেছেন, নির্দিষ্ট করে রেখেছেন আমার জন্যে। আমার এই প্রাপ্তিগুলো, এই নিয়ামাতগুলো ঐ জীবনে কোন কাজেই আসবেনা, যদি না এই নিয়ামাত পেয়ে আমি কৃতজ্ঞ হই। যিনি এই নিয়ামাত দিয়েছেন তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতায় তাঁর দেয়া জীবনবিধান মেনে চললে, তাঁর এই নিয়ামাত গুলোর সঠিক ব্যবহার করলেই কেবল এগুলো কাজে আসবে। অন্যথায় এই নিয়ামাতগুলোর হিসেব আমরা কিভাবে দেবো? এই নিয়ামাতগুলোই তো সেইদিন আমাদের জন্যে বোঝা হয়ে আসবে যেদিন আল্লাহ এগুলোর প্রত্যেকটার হিসেব নিবেন। এই দুনিয়ায় যা পেয়ে আমি-আপনি নিজেকে ভাগ্যবান ভাবছি ঐ জীবনে তাই তো আমাদের জন্যে হিসেবের বোঝা হয়ে যাবে। আল্লাহ ওয়াদা করেছেন তিনি আমাদেরকে দেয়া প্রত্যেকটা নিয়ামাতের হিসেব নেবেন।

“তারপর অবশ্যই অবশ্যই অবশ্যই সেদিন তোমাদের এই নিয়ামতগুলো সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদকরা হবে৷” (৬)

কি জবাব দেবো? এই সুস্থ শরীর, প্রত্যেকটা অঙ্গ প্রত্যঙ্গ, চাবি ঘুরালেই, জগ ঢাললেই বিশুদ্ধ পানি, হাঁটার জন্যে পা আর জুতা, নিয়মিত এত খাবার, এত স্বচ্ছলতা, ইন্টারনেট কানেকশান, টাইপ করার জন্যে আঙ্গুল, ভার্সিটি-কলেজে পড়াশোনার চান্স, ডিগ্রী, জব, ক্যারিয়ার, আম্মু আব্বুর আদর, মাথার উপরে একটা ছাদ থেকে শুরু করে লিস্ট করলে এই নিয়ামাতের শেষ হবে কি? প্রত্যেকটা নিয়ামাত নিয়ে যখন জিজ্ঞেস করবে জবাব দিতে পারবো? সম্ভব? ভাবতে হবে।

তবুও কি আমরা কৃতজ্ঞ হবোনা? আমরা কি বুঝবোনা শুধু সচেতনতার সাথে আল্লাহর জন্যে আমাদের করা কাজগুলোই আমাদের সাথে যাবে? আর কিছুই কাজে আসবেনা, সঙ্গে যাবেনা। কাজে আসবে শুধু আমার ভালো কাজগুলো। একনিষ্ঠভাবে এক আল্লাহর জন্যে করে যাওয়া কাজগুলো। সেই কাজগুলো সম্পর্কে জানতে হলে আমাকে সচেতন হতে হবে, জানতে হবে নিজের দ্বীনকে। কুরআন শেখা শুরু করতে হবে, রাসুলের(সা) জীবনকে জানা আর মানা শুরু করতে হবে। চিনতে হবে নিজের সাথে, আর আল্লাহর সাথে এতদিন ধরে করে যাওয়া ভন্ডামীগুলোকে। শোধরাতে হবে।

আজ থেকে নিজের মুনাফিক্বী সম্পর্কে,

ভন্ডামী সম্পর্কে

ভাবার জন্যে,

জানার জন্যে,

সচেতন হওয়ার জন্যে,

এবং পদক্ষেপ নেওয়ার জন্যে এইটুকুই কি যথেষ্ট না?

আজকেই কি নিয়মিত কুরআন স্টাডির জন্যে, কুরআনকে সরাসরি বোঝার জন্যে প্রথম পদক্ষেপ টা নেবোনা?

আসুন আল্লাহ আমাদের যা কিছু দিয়েছেন তাঁর জন্যে কৃতজ্ঞ হই, তাঁকে সিজদায় গিয়ে থ্যাঙ্কস জানাই মন থেকে। তারপর কুরআন স্টাডি শুরু করি, আল্লাহর কাছে সাহায্য চাই, চেষ্টা করি। বাকিটা তিনিই সহজ করে দিবেন ইনশাল্লাহ।

———————————————————————

[ কুরআন বুঝার জন্যে এরাবিকের অনেক কোর্স আছে। মানুষ কত ভাষা শিখে। আমরা একটু সময় আর শ্রম দিয়ে এরাবিকটা শিখে ফেলতে পারি। নিচে অনলাইন আর অফলাইন কোর্সের জন্যে দুটো লিঙ্ক দিলাম। ট্রাই করতে পারেন।

বাইয়্যিনাহ (এই কোর্সটা ইংরেজীতে):

http://www.bayyinah.tv/sq/34470-free-arabic-quran-lessons-from-bayyinahtv

http://www.bayyinah.tv/sp/9942-bayyinah-tv

সিবাওয়েহ (এই কোর্সটা বাংলায়):

http://ibanaway.com/687/registration-september-2014/]

———————————————————————

রেফারেন্সঃ

(১) সুরা ক্বামারঃ ১৭, ২২, ৩২, ৪০

(২) সুরা আনকাবুতঃ ২

(৩) আল বাকারাহঃ ২১৪

(৪) আল ইমরানঃ ১৪২

(৫) সুরা আল-আহযাবঃ ৩৬

(৬) সুরা আত-তাকাসুরঃ ৮

———————————————————————

২৩শে রামাদান, ১৪৩৫ হিজরী।

Advertisements

About মুহাম্মাদ তোয়াহা আকবর

আমি মুহাম্মাদ তোয়াহা আকবর। একাডেমিক পরিচয়ে জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ার এবং একজন বায়োটেকনোলজিস্ট। আগ্রহ বিজ্ঞানে এবং গবেষণায়। তারচেয়েও বেশি পড়ানোয়। নৈতিক এবং আদর্শিক জীবনে একজন মনেপ্রাণে মুসলিম। নাস্তিকতা ছেড়ে আল্লাহ সুবহানাহুওয়াতা’আলার অশেষ করুণা আর দয়ায় ইসলামের আলো চিনে এ পথে আসতে পেরেছি ২০১২ তে। এখন শিখছি। আরো বহু দূর পথ পাড়ি দিতে হবে জানি। অনন্তের জীবনের পাথেয় কুড়োতে বড্ড দেরী করে ফেলা একজন দূর্ভাগা হিসেবে নয়, বাঁচতে চাই সোনালি দিন গড়ার প্রত্যয়ে। ক্ষণিকের বালুবেলায় যে কটা মুক্তো কুড়োতে পারি সেই তো আমার লাভের খাতার শব্দমালা। হাঁটার পথে একটা দুটো মুক্তোর কথা, উপলব্ধির কথা লিখবো বলে এখানে পতাকা পুঁতেছি। আমি থাকবোনা একদিন। আমার খুঁজে পাওয়া কিছু মুক্তো হয়তো থেকে যাবে জন্ম থেকে জন্মান্তরে। হয়তো হবে কারো আলোর মশাল। আর সে আগুন ছড়িয়ে যাবে সবখানে।
This entry was posted in Uncategorized. Bookmark the permalink.

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s