টানটান থ্রীলারের অংশবিশেষ

যেন টানটান উত্তেজনার থ্রীলার পড়ছিলাম। আসলে থ্রীলার মুভিকেও হার মানায় এটা। কারণ, এটা গল্প নয়। একদম জলজ্যান্ত সত্যি ঘটনা। এত বি-শা-ল কাহিনীতো বলতে পারবোনা, তবে ঘটনার সবচে’ মজার অংশটা এখানে আমার অনুভূতি অনুযায়ী শেয়ার করছি।

.

ঘটনার ফোকাস একজন টগবগে তরুণ। একদিন একজনকে ভুলে খুন করে ফেললো সে। নিজ দেশ থেকে পালিয়ে যাওয়া ছাড়া আর কোন উপায় ছিলোনা তার। কারণ, তাকে পেলেই মেরে ফেলা হবে এটা সে বুঝতে পেরেছিলো। অবশেষে দেশ ছেড়ে অতি সন্তর্পনে পালাতে সে সক্ষম হলো। আরেক জায়গায় পৌছালো সে। হাতে কোন টাকা নেই, পকেটে একটা পয়সা নেই। কোন চাকরীও নেই যে টাকা কামাবে। বেকার এক যুবক সে।

.

নিজের জীবনের এই দূর্বিষহ কথাগুলো সে বলছিলো তার সামনের অচেনা একজন জ্ঞানী মানুষকে। এর চেয়ে দুঃসহ জীবন একজন পুরুষের জন্যে হতে পারেনা। আমি যখন পড়ছিলাম তখন তরুণের দূরাবস্থা আমার চোখে ভাসছিলো। নিশ্চয়ই তার বুকে বিশাল জমানো ব্যথা ছিলো। নিজের তীব্র কষ্ট, যন্ত্রণা আর দূর্দশার পাহাড়ের কাহিনী যখন সে তার সদ্য পরিচিত বয়োজ্যোষ্ঠ মানুষটিকে বলছিলো তখন তার বুকটা নিশ্চয়ই কষ্টে মুচড়ে হাহাকার করে উঠছিলো। সামনের অসাধারণ মানুষটা যুবকের সব কথা মন দিয়ে শুনলেন। তরুণের জীবনের এই ভয়াবহ ঘটনাগুলো শুনে এই প্রায় অপরিচিত জ্ঞানী আর প্রজ্ঞাবান মানুষটা তাকে সান্ত্বনা দিলেন, অভয় দিলেন। বললেন,

“ভয় করো না, এখন তুমি অত্যাচারীদের হাত থেকে বেঁচে গেছো৷”

আরো কি করলেন জানেন?

.

তিনি পুরোপুরি অপরিচিত এই দূর্ভাগা তরুণকে একটা অবাক করা অফার করে বসলেন। অনুরোধ করলেন, পলাতক, খুনী, গরীব, অবৈধ অভিবাসী, কাজকর্মহীন বেকার তরুণটা যেন তাঁর আদরের কন্যাকে বিয়ে করে। এবং সেই সাথে একটা জব অফারও দিলেন। অবাক তরুণের এক্সপ্রেশান কি ছিলো তা আমি জানিনা, তবে তার জায়গায় আমি থাকলে আমার নিচের চোয়ালটা লুজ হয়ে টুইংং করে ঝুলে পড়তো এটা নিশ্চিত। 😀 এই মানুষটা তার মেয়েকে বিয়ের করার প্রস্তাব দিচ্ছেন? তাও আমাকে? আমার মতো একটা খুনীকে? এমন একজন ভয়ংকর পলাতককে যাকে তারই দেশের পুলিশ হন্যে হয়ে খুঁজছে মেরে ফেলার জন্যে? যার পকেটে একটা টাকা নেই? মাথা গোঁজার ঠাই নেই, এমনকি এক বেলা খাবারও নেই যার, তাকে? :O আজিইইইইব!

.

এরপর আমাদের ঘটনার নায়ক সেই ঝকঝকে তরুণ মুসা আলাইহিসসালাম, প্রজ্ঞাবান আর জ্ঞানী নাবী শুয়াইব আলাইহিসসালামের কন্যাকে বিয়ে করলেন 😀 ।

.

এই সুপার অসাম ঘটনাটা আমাদের পরম প্রজ্ঞাময় রাব্ব সমগ্র মানবজাতির প্রতিটা সদস্যের অনুসরণের জন্যে তাঁর পাঠানো আলটিমেট, কমপ্লিট আর ফাইনাল গাইডেন্স পবিত্র আল-কুরআনের সুরা ক্বাসাসের শুরুতেই রেকর্ড করে রেখেছেন। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা যখন কুরআনে একটা ঘটনা বিবৃত করেন তখন সেটা আমাদেরকে শুধুমাত্র ইতিহাস জানানোর জন্যে করেন না, বরং এর প্রতিটা আয়াত, প্রতিটা শব্দ তিনি এত অসাধারণভাবে সজ্জিত করেন যেন তা নিয়ে আমরা গভীরভাবে ভাবনা চিন্তা করি, শিক্ষা নিই, সেই অনুযায়ী জীবনটাকে সাজাই, আর সামনের দিকে হাসিমুখে এক বুক সাহস নিয়ে এগিয়ে যাই।

.

ইতিহাসের এই অসাধারণ ইন্টারেস্টিং ঘটনা থেকে আমরা যারা তরুণ (বিশেষ করে যারা এখনো আমার মতন আবিয়াইত্যা), যাদের জীবনে একের পর এক শুধু দূর্ঘটনাই ঘটছে, ভয়াবহ দুঃসময় যাচ্ছে, নিজের চারপাশের ঘটে যাওয়া পরীক্ষাগুলো জীবনটাকে আরো কঠিন করে দিচ্ছে বলে মনে হচ্ছে, যাদের কেবলই কষ্ট আর দূর্দশা চেপে ধরে শ্বাস বন্ধ করে দিচ্ছে, আর গলার ঠিক মাঝখানে জন্ম দিচ্ছে বড় বড় অসহ্য গ্রানাইট পাথরের, যাদের কাছে জীবনে সামনে এগিয়ে যাওয়াটা, কিছু করতে পারাটা, কিছু অর্জন করাটা অসম্ভব হয়ে গেছে, তাদের জন্যে এক অসাধারণ শিক্ষণীয় বিষয় আছে।

সেটা হচ্ছেঃ

.

দু’আ করা। মন থেকে দু’আ করা। আল্লাহু আযযাওয়াজালের উপর পরিপূর্ণ ভরসা রেখে দু’আ করা। নিজের উপর নয়, নিজের কাজের উপরেও নয়, একমাত্র আল্লাহর উপরেই পরিপূর্ণ ভরসা করে, মনে পূর্ণ আশা নিয়ে এমনভাবে দু’আ করা যেন এই কথা হৃদয়ে থাকে যে, আমার পরম করুণাময় আর অসীম দয়ালু প্রতিপালক, যিনি আমার জন্মেরও আগে থেকে আমার আব্বু আম্মুকে দেখাশোনা টেইক কেয়ার করার মাধ্যমে আমার জন্যে এই জীবনকে সুন্দর করেছেন, আমার জন্মের সূচনালগ্ন থেকেই যিনি আমার সুপার টেইক কেয়ার করছেন, এবং এখনো প্রতিটা মূহুর্তে পরম যত্নে আমার দেখাশোনা করছেন, তিনি অবশ্যই আমার কথা শুনছেন, নিশ্চয়ই তিনিই এর টেইক কেয়ার করবেন, আর তিনি ছাড়া আমার টেইক কেয়ার করার তো আর কেউ নেই। যিনি কারো মুখাপেক্ষী নন, আর আমরা সবাই কেবল তাঁরই মুখাপেক্ষী।

.

সুরা ক্বাসাস পড়ার সময়ে দেখবেন, ঠিক এই ঘটনার বর্ণণার আগেই মুসা আলাইহিসসালাম আল্লাহর কাছে দু’আ করেছেন এই বলে যে,

رَبِّ إِنِّي لِمَا أَنزَلْتَ إِلَيَّ مِنْ خَيْرٍ فَقِيرٌ

“হে আমার প্রতিপালক! যে কল্যাণই তুমি আমার প্রতি নাযিল করবে আমি তার মুখাপেক্ষী৷”

আর তারপরেই মুসা আলাইহিসসালামের জীবনে যা অসম্ভব একটা ঘটনা ছিলো তা উপহার হয়ে এলো। আজ আমার আর তোমার জন্যে যেটা পরিপূর্ণ অসম্ভব মনে হচ্ছে, সেটা চলোনা আল্লাহকে গিয়েই বলি। সালাতে দাঁড়িয়ে যাই, সিজদাতে গিয়ে আল্লাহকে সব খুলে বলি মনে যত কথা আছে, স-ব। যত অসম্ভবই হোক না কেন তিনিই সব ঠিক করে দেবেন আমাদের জন্যে যদি তা আমাদের জন্যে কল্যাণকর হয়। তাঁর অসাধারণ রাহমাতের দরবারে উঠানো বান্দার হাতকে ফিরিয়ে দিতে তিনি বড়ই লজ্জা বোধ করেন। যতই চাইবো, ততই তিনি খুশি হবেন। আমরা যেন নিরাশ না হই যে কেন দু’আ কবুল হচ্ছেনা।

.

একটা কাঁচে পাথর মারা হচ্ছে তো হচ্ছেই, তবু সেটা ভাংছেনা। অনেক পাথর ছোঁড়ার পর অবশেষে একটা ছোট্ট পাথরের আঘাতে সেই বিশাল কাঁচটা গুঁড়ো গুঁড়ো হয়ে পড়ে গেলো। কাঁচ কিন্তু ঐ শেষ পাথরের আঘাতে ভাঙ্গেনি, বরং আগে থেকে ছুঁড়ে আসা প্রতিটা পাথরের টুকরাই ঐ কাঁচের ভেঙ্গে পড়ার জন্যে সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ ছিলো। দু’আও ঠিক তেমনি। আমরা দু’আ করতে থাকবো, করতেই থাকবো প্রাণেপণে।

.

কাঁচ ভাঙ্গবেই।

আমাদের যে তাকে ভাঙ্গতেই হবে।

[ লেখাটি উস্তাদ নুমান আলী খানের লেকচার হতে অনুপ্রাণিত]


যুলহিজ্জার ১৬,

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহিসসালামের হিজরতের ১৪৩৫ বছর পর।

Advertisements

About মুহাম্মাদ তোয়াহা আকবর

আমি মুহাম্মাদ তোয়াহা আকবর। একাডেমিক পরিচয়ে জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ার এবং একজন বায়োটেকনোলজিস্ট। আগ্রহ বিজ্ঞানে এবং গবেষণায়। তারচেয়েও বেশি পড়ানোয়। নৈতিক এবং আদর্শিক জীবনে একজন মনেপ্রাণে মুসলিম। নাস্তিকতা ছেড়ে আল্লাহ সুবহানাহুওয়াতা’আলার অশেষ করুণা আর দয়ায় ইসলামের আলো চিনে এ পথে আসতে পেরেছি ২০১২ তে। এখন শিখছি। আরো বহু দূর পথ পাড়ি দিতে হবে জানি। অনন্তের জীবনের পাথেয় কুড়োতে বড্ড দেরী করে ফেলা একজন দূর্ভাগা হিসেবে নয়, বাঁচতে চাই সোনালি দিন গড়ার প্রত্যয়ে। ক্ষণিকের বালুবেলায় যে কটা মুক্তো কুড়োতে পারি সেই তো আমার লাভের খাতার শব্দমালা। হাঁটার পথে একটা দুটো মুক্তোর কথা, উপলব্ধির কথা লিখবো বলে এখানে পতাকা পুঁতেছি। আমি থাকবোনা একদিন। আমার খুঁজে পাওয়া কিছু মুক্তো হয়তো থেকে যাবে জন্ম থেকে জন্মান্তরে। হয়তো হবে কারো আলোর মশাল। আর সে আগুন ছড়িয়ে যাবে সবখানে।
This entry was posted in Uncategorized. Bookmark the permalink.

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s