ঘোষণা কর শ্রেষ্ঠত্বের

আজকে যে আয়াতের অসাধারণত্ব আর মিরাকেলের কথা বলবো সেটি হচ্ছে আল-কুরানের সুরা মুদ্দাসসিরের তিন নং আয়াত। আয়াতটি কি বলছে? বলছে-

“তোমার রবের শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা কর।”

আয়াতটির বাংলা অনুবাদ এটাই বলছে। কিন্তু আয়াতটির এরাবিকও একই সাথে অন্যরকম একটি দ্যোতনা তৈরী করছে। আমরা সেটা জানি না। কি সেটা?

সেটা জানতে হলে প্রথমে দুই অনুচ্ছেদ ইতিহাস জানতে হবে আমাদের।

আমরা সবাই জানি, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা কুরআন পাঠিয়েছেন রাসুল মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে। কিভাবে পাঠিয়েছেন? সম্মানিত ফেরেশতা জিবরাইল আলাইহিস সালামের মাধ্যমে। যেহেতু দুনিয়ার বুকে আসা সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ, আমাদের সবার প্রিয় নাবিজি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিরক্ষর ছিলেন, পৃথিবীর কোন মানুষ তাঁর শিক্ষক হওয়ার মর্যাদা লাভ করতে পারেনি, আল্লাহ তাই তাঁর শিক্ষার ভার নিজেই নিয়েছিলেন। জিবরাইল আলাইহিস সালাম উনাকে মুখে মুখে আয়াতগুলো (আরবী আয়াত শব্দের অর্থ চিহ্ন, নিদর্শন) শিখিয়ে দিতেন। নাবিজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাথে সাথেই আয়াতগুলো তাঁর সামনে থাকা সাহাবীদের (আরবী সাহাবী শব্দের অর্থ সাথী) মুখে মুখে শিখিয়ে দিতেন। এই ব্যাপারটার একটা বিরাট ঐতিহাসিক এবং সাহিত্যিক গুরুত্ব রয়েছে, যা পুরোপুরি আল- কুরআনের সাথে সংশ্লিষ্ট। কি সেটা?

যেহেতু রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর কাছে বাণী আসার সাথে সাথেই তাঁর সাহাবীদের শিখিয়ে দিতেন, কাজেই, উনি একবার যা বলে ফেলতেন তা পরবর্তীতে আর শোধরানোর কোন সুযোগ ছিলো না। সেই সুযোগের দরকার হতো, যদি সেগুলোতে কোন অসামঞ্জস্যতা থাকতো। সেগুলো যদি তাঁর নিজের তৈরী করা কথা হতো তাহলেই তাতে ভুল থাকতো, শোধরানোর প্রশ্ন আসতো। কিন্তু যে বাণী সবচেয়ে পারফেক্ট আর প্রজ্ঞাবান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার নিজের, তাতে কি করে অসামঞ্জস্যতা বা ভুল থাকার প্রশ্ন আসতে পারে? তাই অবতীর্ণ হওয়ার পর থেকে এতে আজ পর্যন্ত কোন অসামঞ্জস্যতা পাওয়া যায়নি। এমনকি এর লেখক নিজে, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা মানুষকে চ্যালেঞ্জ করেছেন। বলেছেন, এর মতো একটি সুরা বানিয়ে নিয়ে আসার জন্যে, অথবা এর মাঝে কোন অসামঞ্জস্যতা খুঁজে বের করার জন্যে। তাই আমরা রেগে যাই না, উল্টো নন-মুসলিমদের, এমনকি মুসলিমদেরকেও স্বাগতম জানাই যখন তারা এই চ্যালেঞ্জগুলো গ্রহণ করে।

আমরা খুশি হই।

আমাদের এটিচিউড এমনটাই হওয়ার কথা।

পবিত্র আল-কুরআনের সুরা আল-মুদ্দাসসিরের তিন নং আয়াতে একটা মজার ব্যাপার আছে। তিন নং আয়াতে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেছেন,

وَرَبَّكَ فَكَبِّرْ

(উচ্চারণঃ ওয়া রাব্বাকা ফাকাব্বির)

Translation: Declare the greatness of your Lord.

1

আরবী পড়তে হয় ডানদিক হতে বামদিকে। এই আয়াতটি শুরু হয়েছে “ওয়া” (و) দিয়ে। ইংরেজীতে আমরা কোন বাক্য শুরু করার সময় কি করি? আমরা বড় হাতের অক্ষর (Capital letter) ব্যবহার করি। তেমনি আরবীতে ২১টিরও বেশি ক্ষেত্রে “ওয়া” (و) ব্যবহৃত হয় । এর মাঝে একটি হলো, কোন বাক্যের শুরুতে ব্যবহৃত হওয়া। এখানেও বাক্যের শুরুতে “ওয়া” (و) ব্যবহৃত হয়েছে। এখন খুব মন দিয়ে খেয়াল করুন। বাকি অংশ কি বলছে? বাকি অংশে বলছে,

رَبَّكَ فَكَبِّرْ

উচ্চারণঃ রাব্বাকা ফাকাব্বির

Translation: Declare the greatness only of your Lord.

আয়াতটা মুখে উচ্চারণ করার জন্যে আমি উচ্চারণটা বাংলায় দিয়ে দিয়েছি। “রাব্বাকা ফাকাব্বির”। মুখে উচ্চারণ করুন। যখন আয়াতটা মুখে এটা উচ্চারণ করছেন কোন অক্ষরটা সবার প্রথমে মুখে আসছে? রা (رَ) আসছে, ঠিক? এবার খেয়াল করুন মন দিয়ে, উচ্চারণ করার সময় কোন অক্ষরটাকে সবার শেষে আবিস্কার করছেন? একই অক্ষর রা (رَ), ঠিক? এই ব্যাপারটা মাথায় রাখতে হবে। কি করা যায়? সুবিধের জন্যে আমরা এক কাজ করি তাহলে। ছবিতে আয়াতটা সহ প্রথম অক্ষর এবং শেষ অক্ষর নোট করে রাখা যাক। পরে সুবিধে হবে।

ra

আচ্ছা, আবারও উচ্চারণ করুন “রাব্বাকা ফাকাব্বির”। এবার খেয়াল করুন দ্বিতীয় কোন

অক্ষরটি উচ্চারিত হচ্ছে? এবং শেষ থেকে দ্বিতীয় কোন অক্ষরটি শুনতে পাচ্ছেন? রাইট। এবার শুনতে পাচ্ছেন, “ব্বা” (بَّ)। প্রথম থেকে ২, এবং শেষ থেকে ২ নং পজিশানে “ব্বা” (بَّ) শোনা যাচ্ছে। অর্থাৎ এরাবিক “বা” অক্ষরটি একসাথে দুইবার করে শোনা যাচ্ছে। লিখে রাখি ছবিতে।

ba

আরো একবার উচ্চারণ করুন “রাব্বাকা ফাকাব্বির”। প্রথম এবং শেষ হতে তিন নং পজিশানে কি শুনতে পাচ্ছেন? শুনতে পাচ্ছেন “কা” (كَ) অক্ষরটি। ছবিতে নোট করে রাখি।

ka

শেষ বারের মতো আরেকবার পুরোটা উচ্চারণ করলে আপনি প্রথম তিনটা এবং শেষ তিনটার মাঝখানে “ফা” (فَ) অক্ষরটিকে আবিস্কার করবেন। এতক্ষনে আমরা যা কিছু পেলাম তার সবটুকুকে ছবিতে লিখে রাখছি “ফা” (فَ) অক্ষরটিকে মাঝখানে চিহ্নিত করে। কি? কিছু বুঝতে পারছেন?

fa

হ্যাঁ। আপনি যেটা খুঁজে পাচ্ছেন সেটাই প্যালিন্ড্রোম (Palindrome)। ইংরেজীতে এবং বাংলায় এরকম বেশ কিছু প্যালিন্ড্রোম আছে যেগুলোর সামনে এবং পেছন থেকে যেদিকেই পড়া হোক না কেন, একইরকম অক্ষর পাওয়া যায়। উদাহরণসরূপ ইংরেজীতে বলা যায়ঃ

A but tuba.

A lad named E. Mandala.

A nut for a jar of tuna.

A Toyota’s a Toyota.

Bob.

Race car.

As I pee, sir, I see Pisa!

Are we not pure? “No sir!”

এবং বাংলায় উদাহরণসরূপ বলা যেতে পারেঃ

নতুন

নয়ন

রমাকান্ত কামার

মলম ইত্যাদি।

এখানে সবচেয়ে ইন্টারেস্টিং ব্যাপার যেটা সেটা হলো, আল্লাহর বাণীগুলো কিন্তু হাতে লেখা হয়নি। এ সম্পর্কে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা নিজেই কুরআনের সুরা আল আনকাবুতের ৪৮ নং আয়াতে স্পষ্ট বলে দিয়েছেনঃ

…وَلَا تَخُطُّهُ بِيَمِينِكَ …

…You didn’t write anything down with your hand…

অর্থাৎ, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার হাতে কিছু লেখেননি। আল্লাহ যা উনাকে বলেছেন, উনিও মানুষকে হুবহু ওটুকুই বলেছেন। কোন সম্পাদনা, কাঁটা ছেঁড়া ছাড়াই। আমরা এখন সেভাবেই কুরআন পড়ছি, ঠিক হুবহু যেভাবে নাবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে কুরআন এসেছিলো এবং হুবহু যেভাবে উনি প্রথমবার মুখ দিয়ে উচ্চারণ করেছিলেন। প্রথমবার!

সমগ্র মানবজাতির জন্যে এখানে একটা চ্যালেঞ্জ দিচ্ছি। সুরা আল-মুদ্দাসসিরের তিন নং এই আয়াতটার একদম সিম্পল অনুবাদ হচ্ছেঃ Declare the greatness only of your Lord.

আপনি যেটা ট্রাই করবেন সেটা হচ্ছে, “Declare the greatness only of your Lord” এই কথাটাকে ইংলিশ, ফ্রেঞ্চ, জার্মান, জাপানিজ, চাইনিজ, ইটালিয়ান, রাশান, উর্দু, হিন্দী, বাংলা বা ফার্সী অর্থাৎ যেকোন ভাষায় কোন ডিকশনারী ব্যবহার না করে, কোথাও না লিখে, শুধুমাত্র মুখে একবারই উচ্চারণ করে এমন একটা বাক্য বলবেন, যেটা প্রথমবারেই এটা বলবে যে “Declare the greatness only of your Lord” এবং সেটা সামনে-পেছনে যেদিক থেকেই পড়া হোক না কেন অক্ষরগুলোর সজ্জা একই রকম (প্যালিনড্রোম) হবে।

language

সম্ভব?

সুবহানাল্লাহ। আল্লাহু আকবার। নিশ্চয়ই একমাত্র আল্লাহই সবচেয়ে পারফেক্ট, নিখুঁত আর সর্বশ্রেষ্ঠ।

আমরা কোনমতে শুধুমাত্র আল-কুরআনকে আরবী থেকে ভিন্ন ভাষায় অনুবাদ করতে পারি। ব্যাস, এটুকুই! আমরা কি কুরআনের ভাষার মাঝে লুকিয়ে থাকা অজস্র অজস্র মিরাকেলগুলোকে ভাষান্তর করতে পারি?

না।

পারি না।

আমরা যেন ভুলে না যাই, কুরআনের প্রত্যেকটা আয়াতই এক একটা মিরাকেল।

আমাদেরকে শুধু গভীরভাবে কুরআন পড়তে হবে, ভাবতে হবে।

মিরাকেলগুলোকে খুঁজে বের করতে হবে।

হোক প্রতিদিন শুধুই একটা আয়াত, তবুও কুরআন পড়া দিয়েই যেন দিনের আলোতে পথচলা শুরু হয় আমাদের।

read quran

[Inspired from the lectures of Ustadh Nouman Ali Khan]


রাত ৮ টা ৪৯ মিনিট।

যুলহিজ্জার ২৪ তারিখ,

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হিজরাতের ১৪৩৫ বছর পর।

Advertisements

About মুহাম্মাদ তোয়াহা আকবর

আমি মুহাম্মাদ তোয়াহা আকবর। একাডেমিক পরিচয়ে জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ার এবং একজন বায়োটেকনোলজিস্ট। আগ্রহ বিজ্ঞানে এবং গবেষণায়। তারচেয়েও বেশি পড়ানোয়। নৈতিক এবং আদর্শিক জীবনে একজন মনেপ্রাণে মুসলিম। নাস্তিকতা ছেড়ে আল্লাহ সুবহানাহুওয়াতা’আলার অশেষ করুণা আর দয়ায় ইসলামের আলো চিনে এ পথে আসতে পেরেছি ২০১২ তে। এখন শিখছি। আরো বহু দূর পথ পাড়ি দিতে হবে জানি। অনন্তের জীবনের পাথেয় কুড়োতে বড্ড দেরী করে ফেলা একজন দূর্ভাগা হিসেবে নয়, বাঁচতে চাই সোনালি দিন গড়ার প্রত্যয়ে। ক্ষণিকের বালুবেলায় যে কটা মুক্তো কুড়োতে পারি সেই তো আমার লাভের খাতার শব্দমালা। হাঁটার পথে একটা দুটো মুক্তোর কথা, উপলব্ধির কথা লিখবো বলে এখানে পতাকা পুঁতেছি। আমি থাকবোনা একদিন। আমার খুঁজে পাওয়া কিছু মুক্তো হয়তো থেকে যাবে জন্ম থেকে জন্মান্তরে। হয়তো হবে কারো আলোর মশাল। আর সে আগুন ছড়িয়ে যাবে সবখানে।
This entry was posted in Uncategorized. Bookmark the permalink.

3 Responses to ঘোষণা কর শ্রেষ্ঠত্বের

  1. Abdul Musaweer Habib says:

    Alhamdulillah. I am really happy and lucky to have such a great brother 😀 😀

    Liked by 1 person

  2. মাশা আল্লাহ্‌ । অনেক সুন্দর :]

    Like

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s