তুমি ফিরবে বলে

প্রথমে তোমাকে অতীতে নেবো।

তারপর বর্তমান দেখাবো।

তারপর ভবিষ্যত।

কিছুদিন আগেই। তুমি যেদিন পৃথিবীতে এসেছিলে তীব্র কষ্টে আর যন্ত্রণায় তুমি কেঁদেছিলে চিৎকার করে। তোমার মনে নেই। কিন্তু তুমি এটা জানো। সেদিন তুমি বুঝেছিলে কত নিকৃষ্ট আর যন্ত্রণাদায়ক এক জায়গায় এসে পড়েছো তুমি। সেদিন তুমি একা শুধু কেঁদেছিলে সবটুকু শক্তি দিয়ে। তোমার সাথে কেউ কাঁদেনি, কেউ না। জীবনের প্রথম অসহায় কান্নাতে তুমি একা ছিলে। একদম একা!

আজ। যখন ভয়াবহ সমস্যা তোমাকে ঘিরে ধরে, কষ্টে বুক চিরে ফেটে যায়, তখনও তুমি বুঝতে পারো পৃথিবীর বুকে আসার প্রথম দিন হতে আজকের দিনের একাকিত্বের বাস্তবতা একটুও ভিন্ন নয়। শুধু তুমিই বারবার বাস্তবতাকে ভুলে থাকতে চাও। তুমিই শুধু বারবার ভাবতে চাও, চারপাশের মানুষগুলো তোমার। তোমার দুঃখ, কষ্ট, যন্ত্রণাগুলো তারা বুঝে নেবে। সত্যিটা জেনেও এত হাস্যকর ভাবনা ভাবো কিভাবে তুমি? পারোও!

আর কয়দিন পরেই। তুমি মরে গেছো। কি যে তীব্র কষ্ট পেয়েছো মরার সময় তুমি! মনে আছে, মুসা আলাইহিস সালামের মৃত্যুর তিক্ত স্বাদের অভিজ্ঞতার কথা? তীব্র কষ্ট নিয়ে তুমি চলে গেলে। একা। একদম একা। একা একা খাটিয়ায় উঠলে তুমি। যে দুনিয়ার জন্যে, যে মানুষগুলোর জন্যে তুমি এই অনন্তের জীবনকে ভুলে ছিলে, সেই অনন্তের জীবন অবশেষে তোমাকে ছুঁয়ে দিলো, আর সেই মানুষগুলোই তোমাকে একা রেখে আসতে যাচ্ছে অন্ধকার কবরে। তোমার মৃতদেহের কটু পঁচা গন্ধ যে আমাদের একদিনও সইবেনা।

তুমি সার্টিফিকেট-ডিগ্রী, বাড়ি, গাড়ি, আরামদায়ক বিছানা, ভালো খাবার আর চাকরির পিছনে ছুটেছো শুধু এই অনন্তের জীবনকে ভুলে। তুমি জানতে এই দিনটা আসবে। তুমি তবুও প্রস্তুত হওনি। কত অর্জন তোমার! দিবারাত্রি তীব্র টেনশান আর হুলুস্থুল কষ্ট করে কত কিছু করেছো তুমি দুনিয়ার জন্যে। হাস্যকর সব অর্জন। সেই দুনিয়ার অর্জন থেকে তোমার কপালে জুটেছে শুধু এক টুকরো সফেদ শুভ্র কাপড়। আর কিচ্ছু না। কিচ্ছু না।

একা একা আবার নতুন জীবন শুরু। এই নতুন জীবনটা কি হাসিতে কাটবে নাকি কান্নায়? সেটা তুমিই ঠিক করে এসেছো, তুমিই চয়েস করে এসেছো আগের জীবনে। বেশির ভাগ মানুষই ভুল চয়েস টা বেছে নেয়। একা একা কবরে কঠিন সব প্রশ্নের জওয়াব দিতে হয়। দুনিয়াতে সম্পূর্ণভাবে ঠিক মতো না চললে এই অভিজ্ঞতা ভয়াবহ। তোমার বস, তোমার সুপারভাইজার, আব্বুম্মু, আত্মীয়স্বজন, ফ্রেন্ডস বয়ফ্রেন্ড, গালফ্রেন্ড যাদেরকে সুখ দেয়ার জন্যে এই দিনটাকে তুমি অবজ্ঞা করেছিলে, তারা ঠিকই খাচ্ছে, দাচ্ছে, ঘুমুচ্ছে। তোমার সাজানো দুনিয়া এক সেকেন্ডের জন্যেও থেমে যায়নি তোমার প্রস্থানে। আর তুমি? অনুভব করছো কবরের তীব্র সংকীর্ণতা, টের পাচ্ছো তোমার পাঁজরের হাড় একটার ভেতর আরেকটা সেঁধিয়ে যাচ্ছে। নিজের তীব্র চিৎকার কি তোমার কানে পৌছাচ্ছে?

এরপর পুনরুত্থান। বিলিয়ন বিলিয়ন মানুষের ভিড়ে দাঁড়িয়ে থাকা। আজকেই নির্ধারিত হয়ে যাবে তুমি আসলেই সফল, নাকি ব্যর্থ? দুনিয়ার কয়েক মিনিটের অর্জনকে তুমি সাফল্য ভাবতে আজকের এই সত্যিকারের সাফল্যর অমিয় স্বাদ আর ব্যর্থতার সুতীব্র গ্লানিকে ভুলে গিয়ে। দুনিয়ায় তোমার প্রতিটা কাজ, প্রতিটা নিঃশ্বাস যেমন যেভাবে হওয়ার কথা ছিলো, সেইভাবে করেছিলেতো? তোমার কাছে কি আজকের দিন সম্পর্কে কোন বার্তা এসেছিলো? আল-কুরআন নামের একটা গ্রন্থ, শুধুমাত্র এই একটা বই অনুযায়ী তোমার জীবনের প্রত্যেকটা কাজ করার কথা, এই কথাগুলো তোমার কাছে পৌছেছিলো তো? কারো কথার মাধ্যমে, কোন বইয়ের মাধ্যমে? কিংবা কোন ব্লগ, ফেইসবুক নোটস বা স্ট্যাটাসের মাধ্যমে? নিশ্চয় পৌঁছেছিলো। বুঝে পড়েছিলেতো সেই একটা মাত্র বই?  তুমি কি গুরুত্ব দিয়েছিলে? এতদিনের ভুলগুলো বুঝতে পেরে সাথে সাথে ক্ষমা চেয়ে বদলে নিয়েছিলে নিজেকে সত্যের আলোয়? নাকি যেমনই ছিলে তেমনই রয়ে গিয়েছিলে? পাত্তাই দাওনি? আজ হিসেব নিকেশের দিন এসে গেছে। যে সমাজের চোখ রাঙ্গানি আর ক্ষণিকের আনন্দ তোমাকে এই অনন্তের জীবনের ওয়াদার কথা ভুলিয়ে দিয়েছলো, আজ সেই দিন।

এই নতুন জীবনকে অসাধারণ করে সাজানোর জন্যে একটা ম্যানুয়েল পাঠিয়েছিলো তোমাকে যে সবচেয়ে ভালোবাসতো সে। তোমার জন্মলগ্ন থেকেই তোমাকে পরম ভালোবাসায় আগলে রেখেছিলো সে। তুমি তাঁকে চিনোনি। তাঁকে যেন চিনতে পারো সেইজন্যে তিনি যুগে যুগে তোমার কাছে মেসেজ পাঠিয়েছেন মেসেঞ্জারের মাধ্যমে। এই তোমার জন্যেই পাঠিয়েছেন সবচেয়ে অসাধারণ মেসেঞ্জার আর কমপ্লিট মেসেজকে।

কত ভাবেই না তোমাকে জানিয়েছেন তিনি।

তুমি শুনোনি, তুমি পাত্তাই দাওনি।

তুমি তোমার প্রতিটা কাজ যেভাবে করার কথা ছিলো সেভাবে করোনি।

তুমি অনুতপ্ত হয়ে, ক্ষমা চেয়ে, পরিপূর্ণভাবে ফিরে আসোনি।

কেন?

কিসের এই দেরী?

তোমার প্রতিটা একাকিত্বে যিনি তোমার সত্যিকারের পাশে ছিলেন তাঁকে ভুলে তুমি দুনিয়ার মিথ্যা উপাস্য আর সাথীদের বিশ্বাস করছো?

কত সযতনে সাজিয়ে তোমার জন্যে মেসেজ পাঠিয়েছেন তিনি যাতে তুমি সত্যিই সফল হতে পারো, এই দুনিয়ার জীবন আর পরের জীবন দুটোতেই, সেই মেসেজগুলো একবারো সম্পূর্ণ পড়ে দেখলে না?

কিভাবে পারছো তুমি?

এখনো নিঃশ্বাস আছে তোমার।

এখনই যাও না তাঁর কাছে। খুলে বলো সব ভুলের কথা।

অনুতপ্ত হও।

মাফ চাও।

ফিরে এসো।

পরিপূর্ণভাবে ফিরে এসো।

তিনিতো বলেছেন তুমি সত্যিই যদি মাফ চাও, পুরোপুরি ফিরে আসো, তিনি তোমার সব মাফ করে দেবেন, স-ব। যতবার ভুল করে মন থেকে মাফ চাইবে ততবার।

যত বড়, ভয়ংকর পাপীই হওনা কেন তুমি শুধু একবার তাঁর সামনে অনুতপ্ত হয়ে সবগুলো ভুল স্বীকার করে দাঁড়াও, সিজদায় ঝরিয়ে দাও অনুতাপের অশ্রুমালা।

অবিরত।

তাঁর পথে পূর্ণভাবে থাকার জন্যে প্রতিজ্ঞা করো।

তিনি তাঁর ক্ষমা আর ভালোবাসার বিশালতা দিয়ে তোমার অতীতের সব গ্লানি মুছে দেবেন।

হ্যাঁ, তিনিই বলেছেন।

তিনি অপেক্ষা করছেন।

তুমি ফিরে আসবে বলে।

তুমি একা নও, তুমি তীব্র ভালোবাসা পেয়েছো, এটা বুঝবে বলে।

————————

সকাল ১০টা ৪১মিনিট।

যুলহিজ্জার ২৫ তারিখ,

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হিজরাতের ১৪৩৫ বছর পর।

Advertisements

About মুহাম্মাদ তোয়াহা আকবর

আমি মুহাম্মাদ তোয়াহা আকবর। একাডেমিক পরিচয়ে জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ার এবং একজন বায়োটেকনোলজিস্ট। আগ্রহ বিজ্ঞানে এবং গবেষণায়। তারচেয়েও বেশি পড়ানোয়। নৈতিক এবং আদর্শিক জীবনে একজন মনেপ্রাণে মুসলিম। নাস্তিকতা ছেড়ে আল্লাহ সুবহানাহুওয়াতা’আলার অশেষ করুণা আর দয়ায় ইসলামের আলো চিনে এ পথে আসতে পেরেছি ২০১২ তে। এখন শিখছি। আরো বহু দূর পথ পাড়ি দিতে হবে জানি। অনন্তের জীবনের পাথেয় কুড়োতে বড্ড দেরী করে ফেলা একজন দূর্ভাগা হিসেবে নয়, বাঁচতে চাই সোনালি দিন গড়ার প্রত্যয়ে। ক্ষণিকের বালুবেলায় যে কটা মুক্তো কুড়োতে পারি সেই তো আমার লাভের খাতার শব্দমালা। হাঁটার পথে একটা দুটো মুক্তোর কথা, উপলব্ধির কথা লিখবো বলে এখানে পতাকা পুঁতেছি। আমি থাকবোনা একদিন। আমার খুঁজে পাওয়া কিছু মুক্তো হয়তো থেকে যাবে জন্ম থেকে জন্মান্তরে। হয়তো হবে কারো আলোর মশাল। আর সে আগুন ছড়িয়ে যাবে সবখানে।
This entry was posted in Uncategorized. Bookmark the permalink.

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s