মধ্যবিত্ত পাথর পিতা

আজ বাবাদের কথা বলবো।
মধ্যবিত্ত পাথর পিতার কথা।

একটা ছেলে হিসেবেই জীবন শুরু হয় তাঁর। হাইস্কুলের গন্ডীতে আসতেই শুনতে হয়,

“বাবা, ভালো করে পড়াশোনা কর। তোকে নিয়ে আমাদের অনেক স্বপ্ন।”

সেই স্বপ্ন ছেলের চোখে আঁকা হয়ে যায়। অল্প কয়েকজন সেই স্বপ্নকে ছুঁয়ে দেয়। বাকিরা পারে না। বাবা মার চোখে চোখ রাখতেও লজ্জায় শতবার কুঁচকে যায় ছেলেটা। নাহ! কিছু একটা করতেই হবে। কিছু একটা খোঁজা শুরু করে সে। পায় না। খুঁজতে থাকে, খুজতেই থাকে। খুঁজে না পাওয়ার ব্যর্থতা তাকে কুরেকুরে খায় দিনরাত। মাঝরাতে কখনো ফুঁপিয়ে কান্নার মতো শব্দ পেয়ে হকচকিয়ে যায় ছেলের বালিশখানা।

ছিহ! ছেলেরা কাঁদে নাকি? কাপুরুষ কোথাকার!

কাপুরুষতার সামাজিক সংজ্ঞায় ছেলেটা কাঁদতেও পারে না। তারুণ্যের এক পর্যায়ে স্বপ্ন-টপ্নের কাঁথা পুড়ে ফেলে সে নিজ হাতে। কাঁথা পোড়া ছাই মুখে মেখে বেরিয়ে পড়ে টিকে থাকতে হবে বলে। কিছু একটা আঁকড়ে ধরে সে। নাহ! মনের মতো কিছু না। কাজ চলে যায় আর কি!

জীবনের প্রথম উপার্জনের টাকা হাতে আসে। বাবার হাতে পাঞ্জাবী আর মায়ের কোলে আলতো করে শাড়ির প্যাকেট দেখে কি যেন খোঁজে সে দুজনের মুখে। বাবার গম্ভীর মুখ থেকে বেরিয়ে আসা দু’আ আর মায়ের “টাকাগুলো নষ্ট করলি কেন” শুনে বুকের মাঝে আনন্দের সাথে সাথে কি একটা বিষাদ যেন মোচড় দিয়ে ওঠে। একগাল হাসি দিয়ে উঠে দ্রুত বাইরে বেরিয়ে আকাশ দেখে ছেলেটা।

আকাশের নীলিমায় কিছু খোঁজে, নাকি চোখ উপচে আসা কাপুরুষতার ভেজা স্পর্শ লুকাতে চায় সে?
এর উত্তর না হয় শুধু ছেলেরাই জানুক।

বন্ধুদের আড্ডায় হারানোর সময় হয় না ছেলেটার। ও বিলাসিতার সময় কোথায়? বন্ধুরা ঠাট্টা করে।
“খুব ভাব হইসে তোর না?”
“ব্যাটা কিপটা কোথাকার!”
এসব কথার কি কোন উত্তর হয়? আর বন্ধুরাওতো মীন করে কিছু বলে না। তবু বুকের ভেতর পাথর জমে। বলে ওঠে…
না থাক! নাই বা বলি।
সব কথা সবার জানতে নেই।

একটা মেয়েকে বেশ পছন্দ ছিলো ছেলেটার। ভেবে রেখেছিলো ওকেই বিয়ে করবে। মাকে বলেছিলো।
মাও বলেছিলো, “তুই চাকরীটা পেলেই আর চিন্তা নেই।”

ছেলে চাকরী পাওয়ায় মা এসে জিজ্ঞেস করে,

“বাবা, এবার বিয়েটা করে ফেল। ঐ মেয়ের ঠিকানা দে।”

ছেলের একগাল হাসি।
মা তবু চোখ দেখে ঠিক বুঝে নেয়।

তবু একটা মেয়ে ছেলেটার ঘরে জ্যোৎস্না হয়ে আসে। আসতে হয়। দুইদিন পরেই সেই জ্যোৎস্না কাকরোল, পটল আর টেংরা মাছের গন্ধে গ্রীষ্মের খটখটে রোদ্দুর হয়ে যায়। সন্তান আসে আবার এক চিলতে পূর্ণিমা হয়ে। ছেলের পড়াশোনা, রেজাল্ট খারাপের টেনশান আর এই নোংরা সমাজেই আদরের রাজকন্যা মেয়েটার বড় হয়ে যাওয়া পিতার কপালের ভাঁজের সংখ্যা বাড়িয়ে যায়। ছেলেটা পারবে তো কিছু করতে? টিকে থাকতে? মেয়েটা কারো সাথে প্রেম করছে না তো? বাসা-কারেন্ট-গ্যাসের বিল, বাজারের মোটা ব্যাগ আর চশমার পাওয়ারের সাথে সাথেই দায়িত্ব আর ব্যর্থতাগুলোকে মাউন্ট এভারেস্টের চুড়া মনে হতে থাকে। কপালের ভাঁজের চাপে মুখের হাসি হয়ে যায় ডুমুরের ফুল। ছেলে একটা ভুল করলো, দেয় ধমক! মেয়ে কথা শুনলো না, জোরসে ঝাড়ি। বউয়ের মেসেজে বাজারের লিস্ট আসে। ঘরে ঢোকার পর এটা নেই, সেটা লাগবে। আবার বেরিয়ে যাওয়া। অসুখ, বিসুখ। টেনশান। খরচ। ইনকাম নেই, খরচ বাড়ে।
বাড়ে দুরত্ব।
সবার সাথে।
জ্যোৎস্না হয়ে আসা সঙ্গিনীর সাথে।
নিজের শত আদরের ছেলেটা আর রাজকন্যার সাথে।

রাজকন্যাকে বিয়ে দিয়ে বুকের ধন হারানোর হাহাকারও বাবাকে লুকোতে হয়। বেয়ে পড়া চোখের জলটা লোকে দেখে। ভেতরের রক্তক্ষরণ?

দিন যায়।
তারপর হঠাৎ একদিন ছেলেটা এসে হাতে একটা প্যাকেট দেয়। বলে, “দেখোতো আব্বু পাঞ্জাবীটা পছন্দ হয় কি না?”

কাঁপা কাঁপা হাতে প্যাকেট খোলে মানুষটা।
মানুষটা জানেন এই প্যাকেটে পাঞ্জাবী নেই। আছে ভালোবাসা। তাঁকে জড়িয়ে ধরার জন্যে তাঁর গায়ের মাপে একটা সফেদ ভালোবাসা। আবেগে ঠোঁট কেঁপে যায় মানুষটার। ছেলেটার আগ্রহ নিয়ে তাকিয়ে থাকা মুখখানা বড্ড দেখতে ইচ্ছে করে। চোখের বেয়াদপ আর অবাধ্য নোনতা স্পর্শের ভার আজ তাঁর চোখ নিচু করে দেয়।

পাথর পিতার গম্ভীর মুখ ফুটে শুধু অনেক কষ্টে কয়েকটা শব্দ বেরিয়ে আসে,
“সুন্দর হইসে। আল্লাহ তোকে আরো অনেক বড় করুক।”

মধ্যবিত্ত পাথর পিতার মধ্যবিত্ত ছেলে বেরিয়ে যায় বাইরে।
আকাশে ঐ দু’টো উঁচু চোখ কি কেবলই নীল খুঁজে?
নাকি চোখে ভাসা কাপুরুষতার তারল্যটুকু শুধু উপরের পরম করুণাময় স্রস্টা ছাড়া আর কাউকে না দেখানোর তীব্র কোন প্রতিজ্ঞা করেছে সে?

এর উত্তর না হয় শুধু ছেলেরাই জানুক।

আর প্রিয় বাবার জন্যে সালাতের দু’আতে প্রাণ হতে বেরিয়ে আসুক,

رَّبِّ ارْحَمْهُمَا كَمَا رَبَّيَانِى صَغِيرًا
উচ্চারণঃ রাব্বির হাম হুমা কামা রাব্বায়ানি সাগীরা

“My Lord! Bestow on them Your mercy as they did bring me up when I was young.”

———————–
রাত তিনটা।
মুহাররামের ২ তারিখ।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হিজরাতের ১৪৩৬ বছর পর।

Advertisements

About মুহাম্মাদ তোয়াহা আকবর

আমি মুহাম্মাদ তোয়াহা আকবর। একাডেমিক পরিচয়ে জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ার এবং একজন বায়োটেকনোলজিস্ট। আগ্রহ বিজ্ঞানে এবং গবেষণায়। তারচেয়েও বেশি পড়ানোয়। নৈতিক এবং আদর্শিক জীবনে একজন মনেপ্রাণে মুসলিম। নাস্তিকতা ছেড়ে আল্লাহ সুবহানাহুওয়াতা’আলার অশেষ করুণা আর দয়ায় ইসলামের আলো চিনে এ পথে আসতে পেরেছি ২০১২ তে। এখন শিখছি। আরো বহু দূর পথ পাড়ি দিতে হবে জানি। অনন্তের জীবনের পাথেয় কুড়োতে বড্ড দেরী করে ফেলা একজন দূর্ভাগা হিসেবে নয়, বাঁচতে চাই সোনালি দিন গড়ার প্রত্যয়ে। ক্ষণিকের বালুবেলায় যে কটা মুক্তো কুড়োতে পারি সেই তো আমার লাভের খাতার শব্দমালা। হাঁটার পথে একটা দুটো মুক্তোর কথা, উপলব্ধির কথা লিখবো বলে এখানে পতাকা পুঁতেছি। আমি থাকবোনা একদিন। আমার খুঁজে পাওয়া কিছু মুক্তো হয়তো থেকে যাবে জন্ম থেকে জন্মান্তরে। হয়তো হবে কারো আলোর মশাল। আর সে আগুন ছড়িয়ে যাবে সবখানে।
This entry was posted in Uncategorized. Bookmark the permalink.

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s