সুরা কাহাফের এক কণা

সুরা কাহাফের তাফসীরের লেকচার শুনছিলাম। শুধুমাত্র প্রথম ৮টা আয়াত নিয়ে আলোচনা শুনেই মুগ্ধ হয়ে গেলাম। পুরাটা শুনলে না জানি কি অবস্থা হবে!!! যাইহোক, আপনাদের সবার সাথে এইটুকু স্টাডি করার সময় আমার কি কি অনুভূতি হয়েছে সেটার সারসংক্ষেপ শেয়ার করার লোভ সামলাতে পারছি না।

সবচেয়ে অসাধারণ যে শিক্ষাটা পেয়েছি তা হলো, অবশ্যই অবশ্যই সমস্ত প্রশংসা একমাত্র আল্লাহর যিনি তাঁর বান্দার প্রতি এই কুরআন নাযিল করেছেন। এবং এই কুরআনের মাঝে তিনি কোন বক্রতা রাখেননি। একটুও না। এই কুরআন একদম স্ট্রেইট ফরোয়ার্ড। এই কুরআন একদম সোজা সাপ্টা স্ট্রেইট ফরোয়ার্ড কথা বলে দেয় আমাদেরকে। ঘুরায়ে প্যাঁচায়ে এমনভাবে কথা বলে না, যাতে সোজা পথ কোনটা তা নিয়ে আমরা কনফিউজড হয়ে যাবো। একজন সত্যপন্থী মানুষ সহজেই এই কিতাব বুঝতে পারে, এবং মেনে নিতে পারে।

শত বছর পার হয়, হাজার বছর চলে যায়। ১৯৫০ সালে যে সমকামীতাকে ঘৃণার চোখে মানুষ দেখতো, আজ সেই মানুষই সমকামীতাকে স্বীকৃতি দেয়ার আন্দোলন করে। আগে মানুষ এমন ঢোলা ব্যাগি জিন্স পরতো যে সেখানে দুই তিনজন একসাথে থাকতে পারতো, আর এখন এমন টাইট জামা পরছে যে সেখানে অক্সিজেনেরও প্রবেশ নিষেধ। মানুষ বদলায়, নিজেদের ভাবনা বদলে ফেলে। চারপাশের মানুষের চাপে নিজেকে বদলে নেয়। আদর্শ বদলে ফেলে। কম্প্রোমাইজ করে। খারাপ মানুষদের চাপে যেমন ভালো মানুষটাও আস্তে আস্তে নষ্ট হয়ে যায়, তেমনি উল্টোটাও ঘটে থাকে। এই হচ্ছে হিউম্যান নেইচার। তাই এই মানুষকে পথ দেখাতে এমন এক কিতাব আল্লাহ পাঠালেন যার সংরক্ষণের দায়িত্ব তিনি নিজেই নিয়েছেন, এবং এতে গাইডেন্স হিসেবে যা বলার সব সোজা সাপ্টা বলে দিয়েছেন। ২০১৪ তে এই কিতাব যে সত্যকে ধারণ করে, ১৯১৪ তেও তাই করতো, ১০১৪ তেও একই সত্য বলে এসেছে, এমনকি ২১১৪ তে যদি পৃথিবী থাকে, তখনও এটা একই সত্য বিবৃত করে যাবে। একচুলও বদলাবে না।

কি কি বলে এটা? সারসংক্ষেপ হিসেবে বলা যায়, এটা মানুষকে আল্লাহর শাস্তি হতে সাবধান করে দেয়। বারবার বারবার ওয়ার্নিং দেয় যাতে মানুষ আল্লাহর শাস্তিতে না পড়ে যায়। কঠিন শাস্তি হতে বারবার সাবধান করে দেয়, যাতে মানুষ সেই শাস্তি থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে চলতে পারে। পরিপূর্ণ ঈমান এনে যারা ভালো ভালো কাজ করতে থাকে, ইবাদাত করতে থাকে, মানুষের জন্যে অবিরাম ভালো কাজ করতে থাকে, মানুষের জন্যে রাহমাত হয়ে যায়, আলো হয়ে যায়, তাদেরকে এই কিতাব অসাধারণ প্রতিদান আর পুরস্কারের সুসংবাদও দিয়ে দেয়। একেবারে অনন্তকাল ধরে অসাধারণ সব পুরস্কার প্রাপ্তির ঘোষণা দিয়ে দেয় এই সত্য কিতাব।

এটা পৃথিবীর কথাও বর্ণণা করে। পৃথিবীর সৌন্দর্য, পৃথিবীর জীবনের আকর্ষণ, অবিরাম চাহিদার অতল গহ্বর এবং ক্ষণস্থায়ী দুনিয়ার বিভ্রান্তি, ধোঁকার পর ধোঁকা আর মায়ার ইন্দ্রজালের কথাও এটা ফাঁস করে দেয়। চিনিয়ে দেয় রিয়েলিটি আসলে কোনটা। কেন পৃথিবীকে এত এত সাজ সরঞ্জাম, ডিগ্রী, চাকরী, টেকনোলজি, আরাম আয়েশের ফাঁদ আর বিলাসিতার কৃষ্ণগহ্বর দিয়ে এভাবে সাজানো হয়েছে? ৭ নং আর ৮ নং আয়াতে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা সেটাও বলে দিয়েছেন। বলে দিয়েছেন, এসবই এভাবে দেয়া হয়েছে, পৃথিবীকে এভাবে সৌন্দর্য দিয়ে সাজানো হয়েছে, পরীক্ষা করার জন্যে। পরীক্ষা করার জন্যে যে, সব জেনেশুনে কারা পরিপূর্ণভাবে ঈমান আনে? কারা ভালো কাজ করে?
সুবহানাল্লাহ!

এবার চিন্তা করে দেখি একটু!
ক-ত কত্ত দয়ালু উনি! তিনি যে এখন এক্সাম নিচ্ছেন সেটা বলে দিচ্ছেন। আমরা এক্সাম হলেই বসে পরীক্ষা দিচ্ছি। পরীক্ষায় মনোযোগ না দিয়ে ঘুরছি ফিরছি, ফেইল করার দিকে নিজেকেই নিজে ঠেলে দিচ্ছি প্রতি মূহুর্তে। আর এইদিকে পরম দয়ালু তিনি পরীক্ষার হলে থাকা অবস্থাতেও বলে দিচ্ছেন যে, এটা পরীক্ষার হল। যা করতেসো, তা করলে নিশ্চিত ফেইল করবা। এইভাবে এইভাবে করো, তাইলে টেনেটুনে হইলেও পাশ করবা। এইভাবে এইভাবে করলে A grade পাবা। আর যদি আরেকটু কষ্ট করো তাইলে তোমাকে ১০০ তে ১০০ দিবো। আর যদি মিনিমাম পাশও করতে পারো তাইলে খুশি হয়ে এত এত্ত অসাধারণ পুরস্কার দিবো যে আর কক্ষণো কোন ডিস্যাটিসফেকশান থাকবে না। এমন পুরস্কার দিবো যা কোন চোখ কোনদিন দেখেনাই, কোন কান কোনদিন শুনে নাই, কোন হৃদয় কোনদিন কল্পনাও করতে পারে নাই। আর এই পুরস্কার পেতে থাকবা অনন্তকাল ধরে।

যে পৃথিবীর মোহে আমরা ডুবে গেছি, হারিয়ে যাচ্ছি, তলিয়ে যাচ্ছি, একবারও কি ভেবে দেখেছি, আজ এই মূহুর্তে আমি মরে গেলে এই পৃথিবীর কিচ্ছু যাবে না, আসবে না? যেসব জব হোল্ডার, বিজনেসম্যান, গবেষক, বা পি এইচ ডি ধারী মানুষ ২০০০সালে বিদায় নিয়েছেন, তাদের এখন কি অবস্থা একবার ভেবেছি? দুনিয়া তাদের ছাড়াই চলছে, কিন্তু তাদের এখন এই মূহুর্তে কি অবস্থা? এই অবস্থায় তো আমাকেও যেতে হবে শীঘ্রই। আমি চলে যাবো, তবু আমার অফিস চলতে থাকবে, আমার অনুপস্থিতিতে ডিপার্টমেন্টের কাজ থেমে যাবে না, আমার গবেষণা অন্য কেউ করবে, আমার স্ত্রী, স্বামী আর সন্তানের রিজিক্ব যেভাবে ছিলো সেভাবেই তারা তা পেতে থাকবে। ফ্যান্টাসি কিংডমের মজা থাকবে, নতুন নতুন টিভি সিরিয়াল, গানের এলবাম আর মুভি আসতেই থাকবে, কিচ্ছু থামবে না, কিচ্ছু না। শুধু আমার পরিপূর্ণ ঈমান আনার চান্স আর থাকবে না। সেইভাবে চলার সৌভাগ্য আর হবে না। ভালো কাজ করার সুযোগ আর থাকবে না। পরীক্ষার খাতা জমা হয়ে যাবে ঠিক নির্দিষ্ট সময়ে। আমি যে ভালো কাজ পরে করবো বলে, আজ না কাল করবো বলে যে আমল ফেলে রেখেছিলাম, সেটা আর আমি করতে পারবো না। পৃথিবী সূর্যের চারপাশে আপন গতিতেই ঘুরতে থাকবে। যে দুনিয়ার জীবনে আমরা ডুবে গেছি, হারিয়ে গেছি, সেই দুনিয়ার ফাইনাল পরিণতিও আল্লাহ আমাদের দেখিয়ে দিয়েছেন ৮নং আয়াতে। বলে দিয়েছেন,

“সবশেষে এসবকে আমি একটি বৃক্ষ-লতাহীন ময়দানে পরিণত করবো৷”

অসাধারণ! সুবহানাল্লাহ! এতই দয়ালু, এতই মেহেরবান আমাদের আল্লাহ যিনি আমাদের সবকিছু টেইক কেয়ার করেই ছেড়ে দেননি, কিভাবে সফল হতে হবে বারবার সেটাও শিখিয়ে দিয়েছেন। অথচ এতে তাঁর কোন লাভই নেই। তাঁর তো কোন কিছুরই অভাব নেই, কোন চাহিদাই নেই। তবুও অদ্ভুত এক আদরে ভিজিয়ে বারবার পথ দেখিয়ে দিয়েছেন আমাদেরকে সবচেয়ে যতন করে। সবটুকু স্নেহ, ভালোবাসা, আর রাহমাতের চাদরে জড়িয়ে। যাতে আমরা তাঁর দেখানো ইসলামে হালকা হালকাভাবে নয়, একটু একটু নয়, নিজের মতো করে নিজের মত অনুযায়ী নয়, বরং পরিপূর্ণভাবে প্রবেশ করি। পরিপূর্ণভাবে নিজেকে তাঁর কাছে সমর্পন করে, সবকিছুর দাসত্ব হতে নিজেকে মুক্ত করে সত্যিকারের স্বাধীন হতে পারি। এইখানে এবং অনন্তকালের জীবনে সফল হতে পারি। সত্যিকারের সফল।

আল্লাহ আমাদের সব্বাইকে সেই সফলতা চেনার তৌফিক দিন। সেই পথে একসাথে চলার তৌফিক দিন। আমাদের সব্বাইকে জাহান্নাম থেকে সম্পূর্ণরুপে নিরাপদ রাখুন। দশ সেকেন্ডের জন্যেও জাহান্নাম আর কবরের ভয়াবহতা আমাদের না ছুঁতে পারে। আমাদের সব্বাইকে একসাথে জান্নাতে ধুমায়ে আড্ডা মারার সুযোগ করে দিন।
আমীন।

————————–
সন্ধ্যা ৫টা ৫৪ মিনিট,
জুমু’আবার,
মুহাররামের ১৯তারিখ,
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হিজরাতের ১৪৩৬ বছর পর।

Advertisements

About মুহাম্মাদ তোয়াহা আকবর

আমি মুহাম্মাদ তোয়াহা আকবর। একাডেমিক পরিচয়ে জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ার এবং একজন বায়োটেকনোলজিস্ট। আগ্রহ বিজ্ঞানে এবং গবেষণায়। তারচেয়েও বেশি পড়ানোয়। নৈতিক এবং আদর্শিক জীবনে একজন মনেপ্রাণে মুসলিম। নাস্তিকতা ছেড়ে আল্লাহ সুবহানাহুওয়াতা’আলার অশেষ করুণা আর দয়ায় ইসলামের আলো চিনে এ পথে আসতে পেরেছি ২০১২ তে। এখন শিখছি। আরো বহু দূর পথ পাড়ি দিতে হবে জানি। অনন্তের জীবনের পাথেয় কুড়োতে বড্ড দেরী করে ফেলা একজন দূর্ভাগা হিসেবে নয়, বাঁচতে চাই সোনালি দিন গড়ার প্রত্যয়ে। ক্ষণিকের বালুবেলায় যে কটা মুক্তো কুড়োতে পারি সেই তো আমার লাভের খাতার শব্দমালা। হাঁটার পথে একটা দুটো মুক্তোর কথা, উপলব্ধির কথা লিখবো বলে এখানে পতাকা পুঁতেছি। আমি থাকবোনা একদিন। আমার খুঁজে পাওয়া কিছু মুক্তো হয়তো থেকে যাবে জন্ম থেকে জন্মান্তরে। হয়তো হবে কারো আলোর মশাল। আর সে আগুন ছড়িয়ে যাবে সবখানে।
This entry was posted in Uncategorized. Bookmark the permalink.

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s