স্বাধীনতা মরে গেছে

#১
তখন ১৯৭১ সাল। উত্তাল সময়।

দাদাজানকে যখন পাকসেনারা ধরে নিয়ে যায় তখন আমার আব্বু পাগল প্রায় হয়ে গিয়েছিলেন। আমার দাদাজান ছিলেন একজন সম্মানিত কুরআনে হাফিজ, আর আমার আব্বু তখন মেট্রিক পরিক্ষার্থী তরুণ। ওরা দাদাজান সহ আরো অনেক অনেক পুরুষ মানুষদের ধরে নিয়ে যায় ওদের ক্যাম্পের জন্যে মাটি খুঁড়তে হবে বলে। একটু এদিক ওদিক হলেই ঠা ঠা ঠা ঠা গুলির বৃষ্টি। বেঁচে ফিরে আসবেন কিনা তা কেউ জানে না। পিতাকে পাকসেনাদের নোংরা আর ভয়ংকর হাত থেকে ছাড়িয়ে আনতে নিজেকে দিয়ে আসার অসীম সাহসী যুদ্ধে হেঁটে গিয়েছিলেন আমার শ্রদ্ধেয় পিতা। ক্যাম্পে পৌঁছানোর আগেই দেখতে পেলেন দাদাজান দূর্বল পায়ে হেঁটে হেঁটে ফিরে আসছেন। এই ঘটনা আমার পিতা যতবারই বলেন, ততবারই তাঁর চোখ উত্তেজনায় চকচক করে ওঠে।

#২
জঘন্য অন্যায়কে রুখে দিতে মুক্তিযুদ্ধ তখনো চলছে।

আমার আম্মুরা মুক্তিযুদ্ধের সময়ে চট্টগ্রাম বন্দর এলাকার ইস্ট কলোনীতে থাকতেন। আম্মু তখন খুবি ছোট। শিশু। সবাই মিলে আশ্রয় নিয়েছিলেন বিল্ডিং এর একতলায়। উপরের তলাগুলোতে গরম সীসার তপ্ত হিংস্র আঁচড় প্রায়ই দাগ বসিয়ে যেতো। একদিন তরকারী রান্নার জন্যে আমার বড় খালামনিকে নানু রান্নাঘরে যেতে বললেন। বড় খালামনি রান্নাঘরে গিয়েই জানালা দিয়ে এক ভয়াবহ দৃশ্য দেখলেন। পাশের স্টাফ কলোনীতে পাঞ্জাবী সেনারা ধুম ধুম করে গুলি করছে, আর এক একটা লাশ ছুঁড়ে ছুঁড়ে ফেলছে। আমার বড় খালামনির শিশুচোখ সেই দৃশ্য সইতে পারেনি। “আম্মাগোওওও দেখেএএএএন” বলে তীব্র চিৎকার দেন তিনি। সবাই দৌড়ে আসে। বুঝতে পারে ওরা আসছে। আমার নানু আমার নানাজানকে কোথায় লুকোবেন ভেবে না পেয়ে অস্থির হয়ে যান। একবার বিছানার তলায়, তো একবার বাথরুমে। এই অস্থিরতার মাঝেই তীব্র আঘাত আসে বন্ধ দরজার উপর। ভারী বুটের লাথিতে দরজা ভেঙ্গে পড়ে। নানাজানকে ধরে ফেলে ওরা। আমার মেজো মামা (Iqbal Chowdhury) তখন এক বছরের ছোট্ট বাবু। মেজো খালামনির শিশুকোল থেকে কেড়ে নিতেই খালামনি খানসেনাদের পায়ে পড়ে যান। উনার চোখে ভাসে শিশুদের নিয়ে খানসেনাদের তীব্র অত্যাচার। শিশুদের হত্যা করে ছিঁড়ে ফেলে ওরা, মাথায় লাথি দিয়ে বল খেলে। মেজো খালামনি উনার শিশুভাইকে ছেড়ে দিলেন না। টানাটানি করতে লাগলেন। একসময় পাকসেনাটা তার নোংরা হাত থেকে ছোট্ট শিশুটাকে ছেড়ে দিতেই খালামনি পাগলের মতো দৌড় দিয়ে পালালেন। লুকিয়ে গেলেন। নানাজানকে ধরে নিয়ে গেলো ওরা। সব পুরুষদের সাথেই পিছমোড়া করে বেঁধে ট্রাকে তোলা হলো উনাকেও।

ইস্ট কলোনীর সামনের পুকুরটা তখন খটখটে শুকনো। শুকনো পুকুরে সব পুরুষকে নামানো হলো। এখানেই গুলি করে মেরে ফেলে ওরা। নানাজানের দু’হাত পিছমোড়া করে বাঁধা। ভারী বুটের ধুপধাপ ভয়ংকর লাথি পড়তে লাগলো তার শরীরে। কি যে তীব্র আঘাত আমার নানাজানের পুরো শরীরটাকে থেঁতলে দিচ্ছিলো! একের পর এক লাথি দিচ্ছিলো ওরা আর চেঁচাচ্ছিল। বলছিলো,

“ডাক, তোর আব্বাজীকে ডাক।”
“ডাক, তোর শেখ আব্বারে ডাক।”

উনাকে মারতে মারতে প্রায় অর্ধমৃত করে ফেলে রেখে ওরা বাকি প্রিপারেশান নিতে গেলো ফায়ারিং এর জন্যে। তখনই এক পরিচিত বিহারী এগিয়ে এলেন। নানাজানকে নিয়ে একটা খাঁদে লুকিয়ে ফেললেন। লুকানো শরীরের উপর কলাগাছ আর খড়কুটো দিয়ে ঢেকে দিলেন যাতে দেখা না যায়। নানাজান চুপচাপ নিথর হয়ে অপেক্ষা করতে লাগলেন। হঠাৎ ঠেটঠেটঠেটঠেট শব্দে আকাশ চিরে গেলো। পুকুরের পুরুষগুলো লুটিয়ে পড়ে গেলেন। পৃথিবীর বুক আরেকবার লালে ভিজে থকথকে হয়ে গেলো অসহায় দূর্বল মানুষের রক্তে। নানাজান অনেক কষ্টে পালিয়ে ফিরে এলেন। পরিবার নিয়ে অনেক কষ্টে ফিরে গেলেন গ্রামে।

#৩
গত পরশুদিন সংস্কৃত বিভাগের ফার্স্ট ইয়ারের তরুণ স্টুডেন্ট তাপস সরকারের শরীরে ঠাস শব্দে একটা বুলেট গেঁথে যায়। বারুদের গন্ধে বাতাস বিষাক্ত হয়। রক্তে আবারো ভিজে যায় জমিন। লুটিয়ে পড়ে তাপস। প্রাণ হারায়। বিশ্বাস করো, তাপসের মায়ের বুকে ‘৭১ এ খুন হয়ে যাওয়া মুক্তিযোদ্ধা রুমীর মা জাহানারা ইমামের চেয়ে কোন অংশে কম কষ্ট নেই।

৫ই মে হাজার হাজার নিরাপরাধ মানুষের উপর গুলি চালানো হয়, রাতের অন্ধকারে ব্ল্যাক আউট করে। বুয়েটের যে ছেলেটা ওইদিন কালো রাতে খুন হয়ে গেছে ওর আম্মুকে গিয়ে জিজ্ঞেস করেছো কখনো এর বিচার হিসেবে উনি কি চান?

সাগর-রুনী মরে গিয়ে বেঁচে গেছেন। উনাদের ছোট্ট সন্তানটাকে গিয়ে জিজ্ঞেস করো কেন এর বিচার আজো হয়নি? সেই ছোট্ট সন্তানের ছোট্ট বুকটাতে ওর আব্বুম্মুর জন্যে কেমন যাতনা জমে আছে? কিভাবে আব্বুম্মু ছাড়া বেঁচে আছে ছেলেটা? ব্যাটম্যান দেখো তুমি। ব্রুস ওয়েইনের বাবা মাকে খুন হতে দেখো, ব্রুস ওয়েইনের ডার্ক নাইট হয়ে ওঠা দেখো, বুঝো। বুঝো না শুধু তোমারই জমিনে ব্রুস ওয়েইনের মতো এমনই এক অসহায় শিশু আছে। গর্ডনের মতো ওর গায়ে একটা চাদর জড়িয়ে দিতে গিয়েছিলে? ওকে কি একবারো বলতে গিয়েছিলে,

“এর বিচার করেই ছাড়বো”? বলেছিলে?

বিশ্বজিত কোপের পরে কোপ খেয়ে খেয়ে রক্তে অবসন্ন শরীরের তীব্র যন্ত্রণায় পানি খেতে চেয়েছিলেন। আমার এই লাল রক্তে ভেজা ভাইটাকে, আদমের সম্মানিত এই সন্তানের মুখে কেউ পানি তুলে দেয়নি। গাদাগাদা সাংবাদিক আর সাধারণ মানুষও ছিলো খুনীগুলোর সাথে। একজনও এগিয়ে আসেনি। কিভাবে আসবে? পশুরা কি মানুষের কষ্ট যন্ত্রণা বুঝে? রক্তে লাল বিশ্বজিত নিজের রক্তে ভেজা স্লাইস হওয়া ভয়াবহ ভারী শরীরটাকে টেনে হেঁচড়ে টেনে নিয়ে গিয়েছিলেন নিজের দোকানে। পানি খাবেন বলে। খুনীদের সবাইকে আমরা সবাই চিনি। পুরো দেশ চিনে। হয়েছে ফাঁসি? হয়নি।

একবার এস এস সি পরীক্ষার ঠিক আগে হিন্দু কিছু ফ্যামিলির ঘর পুড়িয়ে দেয়া হয়। টিভির পর্দায় পরিক্ষার্থী কিশোরের সব বই পুড়ে যাওয়ার হতাশা আর ক্ষোভে ভেসে ওঠা চোখের সেই বিষাদ আমি কখনো ভুলবো না। আর বিচার? হেহ!

রানা প্লাজার ধ্বসে কিছু ফকির আর ফকিরনি খুন হয়েছে, তো কি হয়েছে? এগুলো নিয়ে এত চেঁচানোর কি আছে? বিচারের প্রশ্ন আসলো কোথা থেকে?

বহদ্দার হাট ফ্লাইওভারের নিচে চাপা পড়ে যারা খুন হয়েছেন, তাদের কারো নাম জানেন? বিচার হয়নি কেন সেই খুনের?

ধর্ষনের সেঞ্চুরীর কথা মনে আছে? যারা লাঞ্ছিত হয়েছেন, যারা মানুষ হিসেবেও বাঁচতে পারেননি, মাংসের দলা মনে করা হয়েছিলো যাদের, যাদের আত্মাকে খুন করে ফেলা হয়েছে, তাদের জিজ্ঞেস করেছেন তাদের আত্মার এই খুনের বিচার কি হওয়া উচিৎ? ভাবতে পারেন এই খুনের বিচার হয়নি কেন?

তাহাজ্জুতের সালাত পড়া বোনগুলোকে পুলিশ ধরে নিয়ে যায় ভার্সিটি হল থেকে। এই ভয়ংকর জঘন্য অন্যায়ের বিচার কি? বিচার? সেটা (আবার) কি?

আরো বলতে পারি।
১৯৭১ এর ১৬ ডিসেম্বারের পর যার একটাও হওয়ার কথা ছিলো না। যুদ্ধক্ষেত্র নয়, শান্ত জমিনেই এইগুলো ঘটেছে। বিচার হয়নি।
কেন?
৪০ বছর পর এগুলোর বিচারের দাবি তুলে আবার রাজনীতির নোংরা খেলার সুযোগ কি আমি আপনিই করে দিচ্ছি না? এই চক্র কি তুমি বুঝবে না? তুমি কি আসলেই অশিক্ষিত, গরু? সত্যিই?
বলো?

বলো, এগুলোর জন্যে নেমেছিলাম আমরা রাস্তায়? প্ল্যাকার্ড হাতে? নামিনি।
আমরা জানি, প্ল্যাকার্ড, স্লোগান নামের নাটকের জন্যে স্পন্সর লাগে। কাজেই, হুদাই বিচারের নামে চেঁচামেচি করে লাভ নেই এইখানে।
এইখানে “বিচার” নেই।
পাওয়া যায় না।
দুঃখিত।

বলতে পারো,
কেন আজকেই এগুলোর বিচার হবে না?
কেন ফেলানীর কাঁটাতারে ঝোলা লাশ আজো বিচার পায়নি?

কেন?

পশুদের রাজ্যে পশুদের কি বিচার হয়?
পশুত্বের অবমাননা হয়ে যাবে তো!

#৪
আজ সকালে ঘুম হতে চোখ মেলেই Becon এর স্ট্যাটাস দেখে কান্না চলে এলো। কাপ্তাই এ এক আদিবাসী মেয়েকে ধর্ষণ করতে না পেরে হত্যা করা হয়েছে নির্মমভাবে। সেই বোনটার অসহায় চোখ তখন কি বলছিলো? কি বলছিলো?

আমার পিতা আর আমার মাতা দুইদিক থেকেই আমি মুক্তিযুদ্ধের ভয়ংকর ভয়ংকর গল্প শুনেছি। যে পশুগুলো এইভাবে অত্যাচার নির্যাতন নিষ্পেষণে এই জমিনের বুকে জুলুমের পতাকা গেড়ে দিয়েছিলো তাদের কোন ক্ষমা নেই, ক্ষমা হতে পারে না। সুষ্ঠু বিচারের মাধ্যমে প্রত্যেকটা অপরাধীর বিচার হওয়া উচিৎ। না হলেও আমি হতাশ নই। আমার আল্লাহর ন্যায় বিচারে ওরা কেউ ছাড়া পাবে না এটা আমি জানি।

আমার পিতার ছোট্ট মশলার দোকানটায় প্রতি ১৬ই ডিসেম্বারে একটা ছোট্ট লাল সবুজের পতাকা পতপত করে ওড়ে। উনার মনেও হয়তো বিজয়ের সেই উল্লসিত আনন্দ ভেসে ওঠে। উনি এই দিনটাকে বুকে অনুভব করেন, করতে পারেন। আমি পারি না। আমার বুকে জমা শত শত অত্যাচার আর খুনের বদলা দানা বাঁধে। নিজেকে প্রতিদিন পরাজিত মনে হয়। মানুষ মনে হয় না নিজেকে আর। ঘাস খাওয়া গরুও বোধ করি আমাদের চেয়ে ভালো বিবেক রাখে। কে জানে?

গত ছয় বছরে আমি নিজের ক্যাম্পাসে ৮টা খুন হতে দেখলাম। একটারও বিচার হয়নি। সর্বশেষ খুনটা হলো গত পরশু। আমি কিছুই করতে পারিনি।

যারা খুন হয়েছে এই চল্লিশ বছরে, তাদের পরিবারের কাছে, মায়ের কাছে গিয়ে পাশে বসে জিজ্ঞেস করে দেখো,

“মাগো, ও মা, আজকের এই বিজয় দিবসে তোমার কেমন লাগছে? তোমার বুকেও কি বিজয়ের উল্লাসধ্বনি বাজে মা?”

তুমি উত্তর পাবে।
সেই উত্তর তোমাকে বলে দেবে বর্ডার, কাঁটাতার আর মানুষে মানুষে বিভাজন করা কাল্পনিক সীমারেখা দিয়ে পাওয়া “স্বাধীনতা” নামের একটা শব্দ হয়তো কাগজে লেখার যোগ্যতা পাওয়া যায়। ওটুকুই।

সত্যিকারের বিজয়, বাস্তবে মানুষের সত্যিকারের স্বাধীনতা এতো সোজা না। এত সস্তা না। আবেগ দিয়ে “স্বাধীনতা, স্বাধীনতা” বলে চিৎকার করলেই স্বাধীনতা পাওয়া যায় না। “বিজয়ের গান” বাজিয়ে মাইক ফাটানোর মতো সস্তা না এই স্বাধীনতা। লাল সবুজের একটা পতাকা দিয়ে স্বাধীনতাকে ডিফাইন করা যায় না, এটা তুমি কবে বুঝবে?
কবে?

এই জমিনে যারা অন্যায়ভাবে প্রতিদিন খুন হয়েছে, হচ্ছে, জুলুম আর নিপীড়নের শিকার হয়েছে, হচ্ছে, শুধু তাঁরাই জানেন, কেবলমাত্র তাঁরাই বুঝেন বিজয়ের মানে কি? শুধু তাঁরাই জানেন, অনুভব করেন হৃদয়ে, স্বাধীনতার আরাধ্য স্বাদ কেমন?

তুমি জানো না। তুমি কিচ্ছু জানো না।

Advertisements

About মুহাম্মাদ তোয়াহা আকবর

আমি মুহাম্মাদ তোয়াহা আকবর। একাডেমিক পরিচয়ে জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ার এবং একজন বায়োটেকনোলজিস্ট। আগ্রহ বিজ্ঞানে এবং গবেষণায়। তারচেয়েও বেশি পড়ানোয়। নৈতিক এবং আদর্শিক জীবনে একজন মনেপ্রাণে মুসলিম। নাস্তিকতা ছেড়ে আল্লাহ সুবহানাহুওয়াতা’আলার অশেষ করুণা আর দয়ায় ইসলামের আলো চিনে এ পথে আসতে পেরেছি ২০১২ তে। এখন শিখছি। আরো বহু দূর পথ পাড়ি দিতে হবে জানি। অনন্তের জীবনের পাথেয় কুড়োতে বড্ড দেরী করে ফেলা একজন দূর্ভাগা হিসেবে নয়, বাঁচতে চাই সোনালি দিন গড়ার প্রত্যয়ে। ক্ষণিকের বালুবেলায় যে কটা মুক্তো কুড়োতে পারি সেই তো আমার লাভের খাতার শব্দমালা। হাঁটার পথে একটা দুটো মুক্তোর কথা, উপলব্ধির কথা লিখবো বলে এখানে পতাকা পুঁতেছি। আমি থাকবোনা একদিন। আমার খুঁজে পাওয়া কিছু মুক্তো হয়তো থেকে যাবে জন্ম থেকে জন্মান্তরে। হয়তো হবে কারো আলোর মশাল। আর সে আগুন ছড়িয়ে যাবে সবখানে।
This entry was posted in Uncategorized. Bookmark the permalink.

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s