আমরাও সেই পথেই হাঁটছি?

“তুমি কি দেখোনি, কিতাবের জ্ঞান থেকে যারা কিছু অংশ পেয়েছে, তাদের কি অবস্থা হয়েছে?

.

তাদের যখন আল্লাহর কিতাবের দিকে সে অনুযায়ী তাদের পরস্পরের মধ্যে ফায়সালা করার জন্য আহবান জানানো হয়, [১] তখন তাদের মধ্য থেকে একটি দল পাশ কাটিয়ে যায় এবং

.

এই ফায়সালার দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়৷”

.

(সুরা আলে ইমরান- ০৩ঃ২৩)

.

[১] অর্থাৎ তাদের বলা হয়, আল্লাহর কিতাবকে চূড়ান্ত সনদ হিসেবে মেনে নাও এবং তাঁর ফায়সালার সামনে মাথা নত করে দাও। এই কিতাবের দৃষ্টিতে যা হক প্রমাণিত হয় তাকে হক বলে এবং যা বাতিল প্রমাণিত হয় তাকে বাতিল বলে মেনে নাও। এখানে মনে রাখতে হবে, আল্লাহর কিতাব বলতে এখানে তাওরাত ও ইনজীলকে বুঝানো হয়েছে। আর কিতাবের জ্ঞানের কিছু অংশ লাভকারী বলতে ইহুদী ও খৃষ্টান আলেমদের কথা বুঝানো হয়েছে।

.

আচ্ছা, তারা এরকম কেন করে? সেই কারণটাও আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা পরের আয়াতে তুলে ধরেছেন স্পষ্ট করে।

.

তিনি বলেছেনঃ

.

“তাদের এ কর্মপদ্ধতির কারণ হচ্ছে এই যে, তারা বলেঃ 

.

‘জাহান্নামের আগুন তো আমাদের স্পর্শও করবে না৷ আর যদি জাহান্নামের শাস্তি আমরা পাই তাহলে তা হবে মাত্র কয়েক দিনের ৷’ [২]

.

তাদের মনগড়া বিশ্বাস নিজেদের দ্বীনের ব্যাপারে তাদেরকে বড়ই ভুল ধারণার মধ্যে নিক্ষেপ করেছে৷”

(সুরা আলে ইমরান- ০৩ঃ২৪)

.

[২] অর্থাৎ তারা নিজেদেরকে আল্লাহর প্রিয়পাত্র মনে করে বসেছে। তাদের মনে এই ভুল ধারণা বদ্ধমূল হয়ে গেছে যে, তারা যাই কিছু করুক না কেন জান্নাত তাদের নামে লিখে দেয়া হয়ে গেছে, তারা ঈমানদার গোষ্ঠী, তারা উমুকের সন্তান, উমুকের উম্মাত, উমুকের মুরীদ এবং উমুকের হাতে হাত রেখেছে,কাজেই জাহান্নামের আগুনের কোন ক্ষমতাই নেই তাদেরকে স্পর্শ করার। আর যদিওবা তাদেরকে কখনো জাহান্নামে দেয়া হয়,তাহলেও তা হবে মাত্র কয়েক দিনের জন্য। গোনাহের যে দাগগুলো গায়ে লেগে গেছে সেগুলো মুছে ফেলে দিয়ে সেখান থেকে তাদেরকে সোজা জান্নাতে পাঠিয়ে দেয়া হবে। এ ধরনের চিন্তাধারা তাদের এমনি নির্ভীক বানিয়ে দিয়েছিল, যার ফলে তারা নিশ্চিন্তে কঠিন থেকে কঠিনতর অপরাধ করে যেতো, নিকৃষ্টতম গোনাহের কাজ করতো, প্রকাশ্যে সত্যর বিরোধিতা করতো এবং এ অবস্থায় তাদের মনে সামান্যতম আল্লাহ ভয়ও জাগতো না।

———————————————

আচ্ছা, আচ্ছা, একটু দাঁড়াই এইখানে।

.

আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা এইখানে ইহুদী ও খৃষ্টানদের মীন করে আয়াতগুলো দিয়েছেন কেন? তাদেরকে ঘৃণা করার জন্যে? আল-কুরআন না আমাকে সঠিক পথে চালিত করার কথা, পথ দেখানোর কথা? এই দুই আয়াত থেকে আমি কিভাবে ঠিক হবো? আমি কিভাবে পথের নির্দেশনা পাবো? এই দুইটা আয়াত তো মুসলিমদের নিয়ে নয়, মুসলিমদের কোন সমস্যা নিয়েও নয়।

.

সত্যিই কি তাই?

.

এবার একটু গভীরভাবে ভাবি আসুন।আমাদেরকে কিতাব হিসেবে, পথের নির্দেশক হিসেবে আল-কুরআন দেয়া হয়েছে, তাই না? এবং প্রতিটা ব্যাপারে, প্রতিটা সমস্যায় আমাদের আল- কুরআন অনুযায়ীই বিচার করার কথা ছিলো, ঠিক? শাসন করার কথা ছিলো আল-কুরআন অনুযায়ী, যেকোন ঝগড়া-বিবাদ আর অন্যায়ের বিচার করার কথা এর আদেশ অনুযায়ী, দেশ চালানোর কথা এর সূত্রানুযায়ী (কোন মানুষের বানানো মতবাদ অনুযায়ী তো কোনভাবেই না), আমার ঘুম ভাঙ্গার কথা এর নির্দেশানুযায়ী (ফজর কিংবা শেষরাতের সালাত আদায়ের জন্যে), সারাটা দিন কাটানোর কথা এর নির্দেশানুযায়ী, ঠিক? আমরা কি তা করছি? এই কিতাব যাকে বাতিল বলে, আমরা কি আমাদের জীবন হতে তাকে বাতিল করেছি, আর যাকে সত্য বলে দাবী করে, সেই সত্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টাতেই কি আমাদের সময় কাটে? বুকে হাত দিয়ে নিজেকে জিজ্ঞেস করুন তো? আমরা কি ২৩ নং আয়াতের সেই দলটাই নই, যারা কিতাবের ফয়সালাকে পাশ কাটিয়ে যায়, এবং মুখ ফিরিয়ে নেয়?

.

এবার আসি ২৪ নং আয়াতে।

আমরা অনেকেই কি মুখে বা অন্তরের গভীরে ঠিক এই কথাটাই বলে যাই না, যেকোন অন্যায় আর পাপে ঝাঁপ দেয়ার সময়?

.

‘জাহান্নামের আগুন তো আমাদের স্পর্শও করবে না৷ আর যদি জাহান্নামের শাস্তি আমরা পাই তাহলে তা হবে মাত্র কয়েক দিনের৷’

.

আল্লাহ আমাদের এইরকম চিন্তাকেও তুলে ধরেছেন, এবং ঠিক এর পরেই ঘোষণা দিয়েছেনঃ

.

“তাদের মনগড়া বিশ্বাস নিজেদের দ্বীনের ব্যাপারে তাদেরকে বড়ই ভুল ধারণার মধ্যে নিক্ষেপ করেছে৷”

.

আমরা কি আমাদের দ্বীনের ব্যাপারে ঠিক জায়গায় আছি, নাকি ভুল জায়গায়? নিজেকেই নিজে বিচার করতে পারবো এখন। আমি কি সঠিক পথ অনুসরণ করছি, নাকি আমার পূর্ববর্তী সেইসব জাতি যারা কিতাব পেয়েও ধ্বংসের পথে হেঁটে গিয়েছে, তাদের পথে হাঁটা শুরু করেছি? আল-কুরআনে বর্ণিত সেইসব জাতিদের ঘটনাবলী যেন আমার বুকে এই প্রশ্নের জন্ম দেয়।

.

আমরা যারা তাদের পথ অনুসরণ করে চলছি, সেই আমাদের পরিণতি কি?

তাদের পরিণতি নিয়ে কি আল্লাহ কিছু বলেছেন?

হ্যাঁ, বলেছেন।

ঠিক পরের আয়াতেইঃ

.

“কিন্তু সেদিন কি অবস্থা হবে, যেদিন আমি তাদের একত্র করবো, যেদিনটির আসা একেবারেই অবধারিত?.

সেদিন প্রত্যেক ব্যক্তিকে তার উপার্জনের পুরোপুরি প্রতিদান দেয়া হবে এবং

.

কারো ওপর জুলুম করা হবে না৷”

.

(আলে ইমরান- ০৩ঃ২৫)

.

হ্যাঁ।তিনি আমাদের একত্রিত করবেন। সেই দিনটা আসবেই আসবে। আমাকে আমার উপার্জনের, অর্থাৎ এই দুনিয়ায় প্রতিটা মূহুর্ত খরচ করে আমি যা যা উপার্জন করে নিয়েছি পরের লাইফের জন্যে, তার পুর্ণ প্রতিদান তিনি দিবেনই দিবেন। ভালোর জন্যে অসাধারণ সব অকল্পনীয় পুরস্কার। আর উলটাপালটা, আউল ফাউল, অন্যায় আর জঘন্য কাজের বিনিময়ে সেই অনুযায়ী ন্যায়বিচার। ন্যায়বিচার তিনি দিবেনই। করে যাওয়া কাজের ফল হাতে হাতেই তিনি দিবেন। দিবেনই। কারো সাথে আমি অন্যায় করলাম, আর আল্লাহ আমার বিচার না করার মানে এটাই যে, যার সাথে আমি অন্যায় করলাম, তার উপর আল্লাহ জুলুম করলেন। নাউযুবিল্লাহ। সেইটা কক্ষনো হবে না, কোনওদিনও না। আবার আমার তাওবাহীন ভুল বা গুনাহের বিচার করে, তিনি আমাকে এক্সট্রা শাস্তিও দিবেন না। সেটা হয়ে যাবে আমার উপর জুলুম। আল্লাহ পরিস্কার বলে দিয়েছেন আয়াতের শেষে, তিনি কারো উপর জুলুম করবেন না।

.

আমাদেরকে আমাদের প্রাপ্য হাতে হাতে বুঝিয়ে দেয়া হবে সঠিকভাবে বিচার করে। ন্যায়বিচার হবে। ঠিক যেমন কাজ আমি করেই চলেছি, সেই অনুযায়ী ফলাফল দ্রুত ধেয়ে আসছে আমার দিকে। এই ঘোষণা, এই ভাবনাই, আমার জিন্দেগীর মোড় এই মূহুর্তে ঘুরিয়ে দিবে পুরোপুরি। যারা ভাগ্যবান, ভাবতে জানে, না ভেবে ভেবে মস্তিস্কে তালা ঝুলিয়ে সেটাকে অকেজো করে ফেলেনি, তাঁরা ঠিক এই মূহুর্তেই ঈমান এনে, অনুতপ্ত হয়ে, তাওবা করে এবং ভালো কাজ করে পরিপূর্ণভাবে ফিরে আসবেন, সারা জীবনের জন্যে।

.

আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা আমাকেও সেইসব ক্ষমাপ্রাপ্ত, এবং ফিরে আসা আলোর কাফেলার একজন হিসেবে কবুল করে নিন।

.

আমীন।

Advertisements

About মুহাম্মাদ তোয়াহা আকবর

আমি মুহাম্মাদ তোয়াহা আকবর। একাডেমিক পরিচয়ে জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ার এবং একজন বায়োটেকনোলজিস্ট। আগ্রহ বিজ্ঞানে এবং গবেষণায়। তারচেয়েও বেশি পড়ানোয়। নৈতিক এবং আদর্শিক জীবনে একজন মনেপ্রাণে মুসলিম। নাস্তিকতা ছেড়ে আল্লাহ সুবহানাহুওয়াতা’আলার অশেষ করুণা আর দয়ায় ইসলামের আলো চিনে এ পথে আসতে পেরেছি ২০১২ তে। এখন শিখছি। আরো বহু দূর পথ পাড়ি দিতে হবে জানি। অনন্তের জীবনের পাথেয় কুড়োতে বড্ড দেরী করে ফেলা একজন দূর্ভাগা হিসেবে নয়, বাঁচতে চাই সোনালি দিন গড়ার প্রত্যয়ে। ক্ষণিকের বালুবেলায় যে কটা মুক্তো কুড়োতে পারি সেই তো আমার লাভের খাতার শব্দমালা। হাঁটার পথে একটা দুটো মুক্তোর কথা, উপলব্ধির কথা লিখবো বলে এখানে পতাকা পুঁতেছি। আমি থাকবোনা একদিন। আমার খুঁজে পাওয়া কিছু মুক্তো হয়তো থেকে যাবে জন্ম থেকে জন্মান্তরে। হয়তো হবে কারো আলোর মশাল। আর সে আগুন ছড়িয়ে যাবে সবখানে।
This entry was posted in Uncategorized. Bookmark the permalink.

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s