স্বপ্নের গল্প

আজ আমার স্বপ্নগুলোর গল্প বলবো। হাসা যাবে না। আচ্ছা ঠিক আছে, ঠিক আছে। মুচকি মুচকি হাসা যাবে। 🙂

.

স্বপ্ন জিনিসটাকে আমার সবসময় অদ্ভুত সুন্দর মনে হয়েছে। স্বপ্ন সম্ভবত ভেতরের সবচেয়ে সুন্দর সুন্দর আশার প্রতিফলন। ব্যাপারটা আমি এখনো ঠিক বুঝে উঠিনি, আর সেই চেষ্টাও নেই। আমি বড় বড় মানুষদের বড় বড় স্বপ্ন দেখেছি। তাঁরা বড় বড় স্বপ্ন দেখেন, মানুষকে স্বপ্ন দেখান। কিন্তু আমার কেন জানি মনে হয়েছে এই মানুষগুলো এতো এতো বড় হতে গিয়ে, এত বড় স্বপ্ন দেখতে গিয়ে জীবন থেকে মহামূল্যবান কিছু একটা খুইয়ে বসেছেন। তাঁদের স্বপ্নগুলো সুন্দর হয়, খুব সুন্দর, কিন্তু ওগুলোকে ছুঁয়ে দেয়া যায় না কখনো। বড়দের বোধহয় ওভাবে স্বপ্ন দেখতে হয়, যাতে ছোট কেউ ছুঁয়ে না দিতে পারে। ছোটরা যদি বড়দের বড় কোন স্বপ্নকে ছুঁয়ে ফেলে তাহলে তাঁদের চাপা অহংবোধ কেন আহত হয়, তা আমি এখনো বুঝে উঠতে পারিনি। আমি খুবই সস্তা আবেগের ছোট আর সাধারণ একটা ছেলে। আমার স্বপ্নও তাই অতি অতি সস্তা আর সাধারণ।

.

সমাজের ক্যালকুলেটরে আমার স্বপ্ন গ্রাফ পেপারের নিচের দিকে নেমে গেছে। আমি আমার নিউরনে নিউরনে সাদাসিধে জীবনের স্বপ্ন বুনি। আমার স্বপ্নের থাকার ঘরটা কেমন বলবো?  শুনলে হাসি হাসবে। কিন্তু হাসা যাবে না। মনে আছে, ছোটবেলায় টিভিতে সামুরাই এক্স নামে একটা কার্টুন সিরিজ দেখাতো? জাপানি কার্টুন। ওদের ঘর গুলো অদ্ভুত ছিমছাম। ঘরে কোন আসবাবপত্র নেই, কিচ্ছু না। শুধু ঘরের এক কোণে ভাজ করে রাখা তোষকের ওপর বালিশটা সুন্দর করে গুছিয়ে রাখা। দেয়ালের এক পাশে মাঝারী আকারের একটা জানালা। সে জানালা দিয়ে আমার ঘরে আকাশ ঢুকে পড়ে।

.

ভাজ করে রাখা বিছানার পাশে সারি সারি বইয়ের রাশি। কোন শেলফে নয়, বরং ঘরের দেয়ালের সাথে লেপ্টে থাকা বইগুলো অনেকটা যেন বিচিত্র ওয়ালপেপারের কাজ করছে। ঘরে বিদ্যুতের সংযোগ না রাখায় ঘরে একটা পিচ্চি কিউট হারিকেন আছে। মাগরিবের পর ঝিঁঝিঁ পোকার একটানা আওয়াজ আর বাইরের ঘুটঘুটে আঁধার আমার ঘরে ঢুকতে এসে হারিকেন দেখে বেশ অবাক হয়ে যায়। সেই হারিকেনের হলুদ আলোয় রাতের বেলায় মশারির ভেতর ঢুকে বই পড়তে পড়তে ঘুমিয়ে যেতে ভারী মজা।

.

ফজরের আজানে ঘুম ভাঙলে জানালা দিয়ে বাইরের আকাশ দেখি। শেষরাতের আকাশ। শুয়ে শুয়ে দেখা। তারপর আড়মোড়া ভেঙ্গে উঠে মশারী, বিছানা গুছিয়ে উঠে পড়া। ভেজা ঘাসে খালি পায়ে হেঁটে হেঁটে টলটলে পানি ভর্তি পুকুর পাড়ে গিয়ে আঁজলা ভরা হাত মুখের সামনে ছিটকে ওঠে। আহ! ভোরের ওজুর পানি রাত্রি আর ঘুমের ক্লান্তি মুছে দেয়। মাসজিদে ফজরের সালাত পড়ে পাশের কোন কবরস্থানে যাওয়া। নিজের বাড়িতে ফিরে যাওয়া মানুষের জন্যে দু’আ করবো বলে। দু’আ শেষ করতে করতে ভোরের আলো ফুটে ওঠে। কিচিরমিচির চিকির চিকির শব্দে ভোরের  কিউট কিউট পাখিগুলো হৈচৈ শুরু করে দেয়। আমি পুকুরপাড়ে বসে বসে সেই গান কান পেতে শুনি আর হাসি। তালগাছের পাতার ফাঁক চিরে সোনালি রোদ্দুর আমার কপাল ছুঁয়ে দেয় আলতো করে। পলকা বাতাস আমার চুলগুলোকে হালকা দুলিয়ে যায়। ভারী ভালো লাগে।

.dream

পুকুরে ঝাঁপিয়ে পড়ি। টলটলে পানির উপর মাথাটা ভাসিয়ে সারা শরীর পানিতে ডুবিয়ে রেখে আকাশ দেখি। ঝকঝকে পরিস্কার নীল স্নিগ্ধ আকাশ। আহ! এই দৃশ্য আর সারা শরীর ঘিরে রাখা পানির শীতল অনুভূতি একবার চোখ বুজে অনুভব করতে পারলে জীবনে আর কি চাই? অনেকক্ষণ ধরে এভাবেই পানিতে থাকি। তারপর গোসল শেষে, চুল আঁচড়াই। নাস্তা বানাই। নাস্তা করে কাঁধের ব্যাগটাতে দুটো বই ঢুকিয়ে বেরিয়ে যাই স্কুল পানে। হাঁটতে হাঁটতে ভাবতে থাকি আজ বাচ্চাদের কি পড়াবো? কিভাবে বললে বিজ্ঞানের মহাকর্ষ চ্যাপ্টারটা সবাই খুব মজা নিয়ে শুনবে আর বুঝবে? বায়োলজি ক্লাসে গিয়ে ওদেরকে পড়াতে পড়াতে ওদের মুখ দিয়েই মলিকিউলার বায়োলজি নিয়ে যখন প্রশ্ন বের করে আনতে পারি তখন কি যে আনন্দ লাগে আমার! ক্লাস শেষে কুরআন হতে কোন আয়াতটা সবাই মিলে তিলাওয়াত করবো আর গল্পে গল্পে আলোচনা করবো সেটাও মনে মনে আওড়ে নিই। গতকাল কোন গল্পটা যেন অর্ধেক বলেছিলাম ক্লাস সেভেনে? সুরা তোয়াহার মুসা আলাহিস সালামের গল্পটাটা, নাকি সুরা কাহাফের ঝকঝকে সেই দীপ্ত তরুণদের অসাধারণ গল্প? ইউসুফ আলাইহিস সালামের গল্পটা নাকি ইব্রাহীম আলাইহিস সালামের মহান আত্নত্যাগ? ছোট ছোট বাচ্চাদের সাথে পড়া আর খেলায় উদ্দাম একটা দিন কাটে। কোন ভড়ং নেই, অহংকার নেই, ভনিতা নেই। সবাই একসাথে হেসে, মিশে, খেলতে খেলতে শিখা। আহ! আসরের ওয়াক্ত গড়িয়ে আসে। ঘন্টা বাজে ছুটির। বাচ্চাদের সাথে আমিও হাসিমুখে কাঁধে ব্যাগ তুলে নিয়ে ঘরে ফিরতে থাকি।

.

মাগরিবের ওয়াক্ত হলেই ডিম বা আলুভর্তা রেডি করি রাতের খাবারের জন্যে। সাথে তাওয়ায় সেঁকা আমার বানানো এবড়োথেবড়ো হাস্যকর রুটি। ইশার সালাতের আগেই খাওয়া পর্ব সেরে নিই। মাসজিদে সালাত পড়ে এসে বিছানা বিছিয়ে, ঝেড়ে, মশারিটা টানিয়ে একটা বই বুকে টেনে নিয়ে হারিকেনের আলোয় উপুড় হয়ে শুয়ে পড়ি। বইয়ের উত্তেজনায় কখনো কখনো ঘুম হয় না মাঝরাত পর্যন্ত। আবার কখনো বুঝতেই পারি না কখন ঘুমিয়ে পড়েছি। ফজরের আজানে ভাঙ্গে ঘুম আমার।

.2

অনেকের কাছে আমার এই স্বপ্ন খুব হাস্যকর হবে জানি। কিন্তু আমার কাছে আমার এই স্বপ্ন খুব দামী, খু-ব। এই অতি সাধারণ সস্তা স্বপ্নকে একদিন আমি ছুঁয়ে দেবো। আমি অপেক্ষায় আছি। আমি এখনো হাসি, এখনো বাঁচি এই অতি ছোট্ট সাধারণ স্বপ্নটাকে ছুঁয়ে দেবো বলে।

নতুন করে বাঁচবো বলে।

সত্যি সত্যি বাঁচবো বলে।

Posted in Uncategorized | Leave a comment

হৃদয়ের অবাধ্যতা

#১
যে হৃদয় একবার তার প্রতিপালকের অবাধ্যতায় নিজেকে ডুবিয়ে দিয়েছে, এবং জেনেশুনে, বুঝেও ডুবিয়েই রাখছে, সে হৃদয়ের জন্যে সাঁতরে বেঁচে আসা বড়ই কঠিন। বস্তুতঃ সে হৃদয় আজীবন নিজের খেয়াল আর খুশিরই ইবাদাত করতে চায়, আল্লাহর নয়।
.
জাস্ট দু’টো উদাহরণ দিই। নারী আর পুরুষ দু’দলকে নিয়েই।
শুধুমাত্র পর্দার ব্যাপারটাই ধরা যাক।
.
#২
প্রথমে আমাদের সম্মানিত নারীদের কথা বলি।
.
ইসলাম ছেলেদের আর মেয়েদের আলাদা আলাদা দায়িত্ব দিয়েছে। যে কাজে যে পারদর্শী, যে কাজে যে বেস্ট, তাকে সেই কাজ করার মাধ্যমে অসীম মর্যাদার অধিকারী হওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে। ইসলাম মেয়েদের বলেছে পর্দা করতে। কিরকম পর্দা করবে, কিভাবে পর্দা করবে মেয়েরা? আমরা আজকের পুরুষরা যেরকম চাই অবশ্যই সেইরকম নয়। বরং যেভাবে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা আমাদের আদেশ করেছেন আর সেই আদেশের প্রতিফলন হিসেবে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যেভাবে শিখিয়েছেন সেইভাবে। আল্লাহর আদেশ আর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের শিক্ষা সবচেয়ে বেশি কারা গুরুত্ব দিতেন, এবং ঠিকভাবে, পরিপূর্ণভাবে মেনে চলতেন? অবশ্যই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের স্ত্রী, কন্যা এবং তৎকালীন মেয়ে সাহাবীরা। সেইজন্যে আমাদের তাকাতে হবে পর্দার বিধান নাযিল হওয়ার পর তাঁরা কে কিভাবে পর্দা পালন করতেন সেইদিকে।
.
অনেকে নিজের মাথায় আসা আইডিয়া আর চিন্তা চেতনার ইবাদাত করেন। তারা ইসলামকে নিজের সুবিধামত মানেন, বদলে নেন। ইসলামের জন্যে তাঁরা নিজেকে বদলাতে রাজী নন। কারণ, অভ্যাস! হৃদয়কে আল্লাহর অবাধ্যতায় অভ্যস্ত করে তুলেছেন তারা। তারা পর্দার বিধান আদেশ হিসেবে আসার পূর্বের নারীদের জীবনধারাকে অনুসরণ করার কথা বলেন। অনেকে আবার নিজের মাথার আইডিয়ার পুজো করে বলেন, পর্দার বিধান শুধুই নবীর স্ত্রীদের জন্যে এসেছে, বাকিদের জন্যে নয়। তাদের বলবো, হযরত ফাতিমা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুমা, যিনি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আদরের রাজকন্যা ছিলেন এবং যিনি জান্নাতি মর্যাদাবান নারীদের লীডার, তিনি কিভাবে পর্দা করেছেন সেটা অনুসরণ করার জন্যে। তাঁর সম্মানিত জীবনের ফোয়ারা থেকে এক ফোঁটা আলো দেয়ার জন্যে বলি, তিনি সেই মানুষ, যিনি অনুরোধ করে গিয়েছিলেন, মৃত্যুর পর তাঁর দাফন কাজ যেন রাতের বেলা চুপিসারে সম্পন্ন করা হয়। আশ্চর্য তো! কেন? কারণ, এতে করে তাঁর লাশের উপরে দেয়া কাফনের কাপড় ভেদ করে তাঁর শারিরীক অবয়ব পুরুষদের দৃষ্টিগোচর হওয়ার সুযোগ থাকবে না। যিনি ছিলেন সবচাইতে সম্মানিত নবীর আদরের দুলালী, যিনি হচ্ছেন জান্নাতের নারীদের লীডার, যিনি পৃথিবীর বুকে এ যাবৎ আসা সবচাইতে সফলতম নারী, তিনি নিজ হাতে যাঁতা পিষে গম গুঁড়ো করতে করতে হাতে ফোস্কা ফেলে দিয়েছেন, তিনদিন না খেয়ে থাকার পরেও তিনি দারিদ্র্যের বা চাহিদার দোহাই দিয়ে বাইরে পরপুরুষদের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে জব খুঁজতে বের হননি। বাইরের জব আর টাকা পয়সাকে নয়, নিজেকে দেখিয়ে দেয়াতে নয়, বরং ইসলামের সৌন্দর্যে নিজেকে সৌন্দর্যমন্ডিত করাতে সাফল্য খুঁজে পেয়েছেন, এবং আসলেই সফল হয়েছেন, তাঁর জীবনি অনুসরণ করেই আজকের নারীরা সত্যিকারের সফল হয়ে যেতে পারবেন।
.
অবশ্য যারা একবার আল্লাহর অবাধ্যতায় হৃদয়কে ডুবিয়ে দিয়েছেন আর সমাজের নিয়মের পুজোতে অভ্যস্ত হয়েছেন, তাদের জন্যে এই বিধানগুলো হয়তোবা কেবলই অত্যাচার হয়ে ধরা দেবে। হে আল্লাহ, এইসব চিন্তাধারার অনুসারীদের ক্ষমা করুন এবং হিদায়াত দিন।
.
#৩
এবার মহান, বলীয়ান পুরুষদের কথা বলি।
.
আমরা নারীদের পর্দা নিয়ে কথা বলে বেশ সুখ পাই। বস্তুতঃ আমাদের পুরুষদের ইসলামিক পড়াশোনায় কোনভাবে নারীদের কথা এলে সেটা উল্লেখ না করা পর্যন্ত আমাদের বেশ চুলকাতে থাকে। চুলকানীর একটা ইন্টারেস্টিং দিক আছে। যতক্ষণ চুলকানো হয় ততক্ষণই মজা লাগতে থাকে, আরাম লাগে। বিশেষ করে মেয়েরা কেন পর্দা মানে না, কেন পরিপূর্ণ পর্দা করে না, এই নিয়ে আমাদের চুলকানী দিবা-রাত্রী। চুলকাতে চুলকাতে ঘা হয়ে গেছে, পঁচে তীব্র গন্ধ বেরুচ্ছে, তবু থামার নাম নেই। ভাইরে, থামেন! একবার বুঝিয়ে বলেছেন, দুইবার বলেছেন, তিনবার বুঝিয়েছেন, বুঝাচ্ছেন তো বুঝাচ্ছেনই। খুব ভালো। আমি আপনার এফোর্টকে এপ্রিশিয়েট করি।
.
নিজের স্ত্রী, কন্যা আর বোনকে আন্তরিকভাবে অবশ্যই আপনি বুঝাবেন, বুঝাতে হবে। না হলে এরাই তো বিচারের দিন আপনি বুঝাননি বলে আপনাকে জাহান্নামে ফেলে দেয়ার কারণ হয়ে যাবে। তাই অবশ্যই বুঝাবেন। পাশাপাশি একটা কথা। নিজের হিসেবের কথা মনে আছে তো? আপনার কবরে কিন্তু আপনি একলাই শুয়ে থাকবেন। আপনার বিচারের সময় আপনি একলাই দাঁড়াবেন। সেই দুঃসহ ভাইভাতে করা প্রশ্নগুলির উত্তরে যখন মিথ্যে বলবেন, তখন আপনার মুখ বন্ধ করে দেয়া হবে, আপনার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলোই কথা বলে সাক্ষী দিবে আপনার বিপক্ষে। আপনাকেও তো আল্লাহ পর্দার বিধান দিয়েছেন। কই? মনে পড়ছে না? খুঁজে দেখুনতো ভালো করে। যে আয়াতে মেয়েদের পর্দার কথা বলা হয়েছে, সেই আয়াতের শুরুতে ছেলেদের পর্দার কথা বলা হয়েছে।
.
হ্যাঁ।
.
আগে আপনাকে পর্দা করতে বলেছেন আল্লাহ, তারপর মেয়েদের। “মেয়েরা পর্দা করে না, তাই আপনি হাঁ করে তাদের দিকে তাকিয়ে লোল ফেলেন”, “ওরা দেখায়, তাই আপনি দেখেন” ফ্রেন্ডসদের সামনে আওড়ানো এই যুক্তিগুলো আল্লাহর সামনে দিতে পারবেন? বুকে হাত দিয়ে বলেনতো? পারবেন না। আপনি জানেন আপনি দোষী। আপনার হিসেব নিকেশ করার জন্যে আপনাকেই বিচারকের দায়িত্ব দেয়া হলেও আপনিই দোষী সাব্যস্ত হবেন, যদি সৎ ভাবে বিচার করেন। নন-মাহরামকে আপনি মেসেজ পাঠান, চ্যাট করেন ফেইসবুকে। বাহ! পর্দা যে আপনার জন্যেও এসেছে, আপনার জন্যেও যে পর্দার “আদেশ” এসেছে সেটা আপনি ভুলে যান, নিজের জীন্দেগীতে এপ্লাই করতে চান না। নিজের কদর্য অভ্যাস, খেয়াল খুশি আর অন্তরের খায়েশের পুজোতে ডুবে আপনি কাকে অস্বীকার করছেন? আল্লাহকেই নয় কি? আপনাকে আল্লাহ চোখ সংযত করতে বলেছেন। শুধু বলেননি, আদেশ করেছেন। প্রভুর আদেশ কি দাস অমান্য করে? অমান্য করতে পারে? আপনি কি জেনেশুনে তাঁর আদেশের অবাধ্য হয়ে তাঁকে প্রভু হিসেবে অস্বীকার করছেন না তো? যদি তা না হয়, তাহলে রাস্তায় আপনার চোখ আকাশে বাতাসে থাকে কেন? রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাওয়া মুসলিম-অমুসলিম মেয়ে থেকে শুরু করে, টিভি, নাটক, সিনেমার মেয়েটাকেও আপনি হা করে দেখেন। এমনকি বিলবোর্ডের ছবির মেয়েটাকেও আপনার নোংরা চোখের জিহবা ছেড়ে দেয় না। কেন? আপনি না নিজেকে মুসলিম বলেন? ছিহঃ
.
এক কাজ করবেন প্লিজ। নিজের আম্মু, স্ত্রী বা বোনকে নিয়ে একদিন রাস্তায় বের হন। তারপর চারপাশের পুরুষগুলোর চোখের দিকে তাকিয়ে থাকুন খুব খেয়াল করে। ভালো করে খুঁটিয়ে দেখুন, ঐ চোখগুলো আপনার আম্মু, আপু, স্ত্রী বা ছোট বোনের দিকে কিভাবে তাকায়, কি দেখে, কিভাবে দেখে। সত্যিই এই কাজটা একবার করে দেখবেন। প্লিইইজ। জানোয়ারগুলো চোখ উপড়ে ফেলতে ইচ্ছে হবে আপনার। রক্ত গরম হয়ে দাঁত কিড়মিড় কিড়মিড় করবে। ভেবে দেখুন, আপনিও যাদের দিকে এইভাবে তাকান তাঁরা, সেইসব নারীরা, আপনারই কোন ভাইয়ের আম্মু, আপু বা স্ত্রী। হয়তো আজ তাঁরা ইসলাম বুঝছেন না, তাই জানছেন না, ফলে মানছেন না। আর সেই হিসেব তাঁরা নিজেরাই আল্লাহকে দিবেন। কিন্তু আপনি? আপনিও কি সব জেনেশুনে ঐ জানোয়ারদের একজন নন? যাদের চোখ আপনার উপড়ে ফেলতে ইচ্ছে হয়? সুরা ইসরার ৩২ নং আয়াতে আল্লাহ আমাদের যিনার আশেপাশেও যেতে নিষেধ করেছেন। আবারো বলছি, আশেপাশেও যেতে মানা করেছেন। চোখের দৃষ্টি সংযত না করে তো আপনি চোখের যিনা করছেন। যিনার আশেপাশেও যেতে মানা করেছেন আল্লাহ, আদেশ করেছেন আপনাকে, আর আপনি যিনা করছেন তো করছেনই। নিজের চোখকে সংযত করতে না পারলে প্লিজ রাস্তায় যাবেন না। বের হবেন না ঘর থেকে। সেটাই আপনার অসুস্থ অন্তরের সুস্থতা আর আখিরাতে পরিত্রাণের জন্যে সহায়ক হবে ইনশাল্লাহ।
.
অবশ্য আপনি যদি একবার আল্লাহর অবাধ্যতায় হৃদয়কে ডুবিয়ে দিয়ে থাকেন আর সমাজের নিয়ম আর নিজের প্রবৃত্তির পুজোতে অভ্যস্ত হয়ে থাকেন, আপনার জন্যে এই বিধানগুলো হয়তোবা কেবলই অত্যাচার হয়ে ধরা দেবে। আল্লাহ এইসব চিন্তাধারার অনুসারীদের ক্ষমা করুন এবং হিদায়াত দিন।
.
#৪
এই অন্ধকার সমাজের অনেকেই মনে করেন, বিয়ে করলেই এইগুলো ঠিক হয়ে যাবে।

হাহ!

যে মানুষটা বিয়ের আগে আল্লাহকে চিনতে পারেনি, আল্লাহর নিয়ামাতে ডুবে থেকেও আল্লাহকে জানতে পারেনি, এই তথ্য-প্রযুক্তির সহজলভ্যতার যুগেও জানতে চায়নি আল্লাহকে, ভালোবাসতে পারেনি, সময় দেয়নি আল্লাহকে, অন্যায় করেও আল্লাহর শাস্তিকে ভয় করেনি, সেই মানুষটা বিয়ের পর কোন জাদুতে বদলে যাবে বলতে পারেন? সেই মানুষটাই যে বিয়ের পরে উল্টো নিজের সাথীকেই ইসলামের পথে হাঁটা হতে সরিয়ে দেবেন না, তার গ্যারান্টি আপনাকে কে দিয়েছে?
.
পর্দার বিধানে পুরুষ এবং নারী, উভয়কেই নিজের সবচেয়ে বড় দূর্বলতার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে বলা হয়েছে। এখানে কারো যুদ্ধই কারোটার চাইতে কম নয়। নারী আর পুরুষকে আলাদা আবেগ দিয়ে, আলাদাভাবে আলাদা দূর্বলতা দিয়ে সৃষ্টি করা হয়েছে। কাজেই, তাদের মাঝে তুলনা করার তো প্রশ্নই আসে না।
.
কথাগুলো নিজেকেই বলা, মনে করিয়ে দেয়া। একটা কথা লেখা হলে সেটা বারবার পড়া হয়, নিজেকে নিজেই স্মরণিকা দেয়া হয়। এই লেখাটা সবার আগে তাই ভুলোমনা, আর গুনাহর সাগরে নিমজ্জিত আমার জন্যে। আমার নিজের জন্যে। আরেকবার মনে করিয়ে দিইঃ
.
যে হৃদয় একবার তার প্রতিপালকের অবাধ্যতায় নিজেকে ডুবিয়ে দিয়েছে, এবং জেনেশুনে, বুঝেও ডুবিয়েই রাখছে, সে হৃদয়ের জন্যে সাঁতরে বেঁচে আসা বড়ই কঠিন। বস্তুতঃ সে হৃদয় আজীবন নিজের খেয়াল আর খুশিরই ইবাদাত করতে চায়, আল্লাহর নয়।
.
সাঁতরে বেঁচে আসার চেষ্টা করতে হবে। করে যেতে হবে। যুদ্ধ থামানো যাবে না। সাহায্য চাইতে হবে আল্লাহর কাছে। নিজের দূর্বলতার কথা তাঁকেই খুলে বলতে হবে।
.
অবিরাম সিজদাতে আর দু’আতে বলতে হবে আল্লাহকেই। বলতে হবে ঘরে এবং রাস্তাতে।
.
সাহায্যতো কেবলমাত্র আমাদের পালনকর্তা আল্লাহর কাছ হতেই আসে। পিছনে ভয়ংকর ফেরাউনের সুসজ্জিত আর্মির আক্রমণের সময়ে সাগারের বুকে মুসা আলাইহিসসালামের লাঠির আঘাত টা ছিলো চেষ্টা। মনে রাখতে হবে, সমুদ্রকে একমাত্র আল্লাহই তাঁর বান্দার সাহায্যার্থে দুইভাগে ভাগ করে দিয়েছিলেন।
.
চেষ্টা করলে সাহায্য আসবেই।

Posted in Uncategorized | Leave a comment

দুই ভাগ আখিরাত

১.

একজন অবিশ্বাসী দুনিয়ার পিছনে ঘুরে মরে, দুনিয়া চায়। সে তাই পায়, যা তার জন্যে তার তাক্বদীরে বরাদ্দ ছিলো। পাশাপাশি আখিরাতের সবকিছু হারায়। কারণ, তার সব ভালো কাজের পুরস্কার তাকে দুনিয়াতেই দিয়ে দেয়া হয়। আখিরাতে আর কিছুই থাকে না, অনন্ত শাস্তি ছাড়া।

.

অন্যদিকে, একজন বিশ্বাসীর ক্ষেত্রে সবকিছুই কি অদ্ভুত সুন্দর! সে আখিরাত চায় বেশি বেশি, আর দুনিয়া হতে যা তাঁর জন্যে কল্যাণময় করে রেখেছেন আল্লাহ, শুধু তাই চায় আল্লাহর কাছে ধৈর্য্যের সাথে, যদিও তাতে তাঁর জন্যে কষ্ট থাকে।

.

বিনিময়ে সে কি পায়?

আল্লাহ তাঁকে কি দিয়ে পুরস্কৃত করেন?

সে দুনিয়াতে যা তাঁর জন্যে বেস্ট আল্লাহর পক্ষ থেকে তা পেয়ে যায়, আখিরাতেও যা কিছু বেস্ট তা পায় এবং অনন্তের শাস্তি হতেও নাজাত পায়। সুবহানাল্লাহ!

.

২.

আমরা কি করতে পারি?

.

নূহ আলাইহিস সালাম তাঁর জাতিকে কি বলেছিলেন সেখান থেকে আল্লাহ আমাদের শিক্ষা দিয়েছেন কুরআনের সুরা নূহ এ। নূহ আলাইহিস সালাম তাঁর জাতির উদ্দেশ্যে বলেছিলেনঃ

.

“তোমরা নিজেদের প্রতিপালকের কাছে ক্ষমা চাও ৷ নিঃসন্দেহে তিনি অতিশয় ক্ষমাশীল৷”

.

তো ক্ষমা চাইলে কি হবে?

“নিঃসন্দেহে তিনি অতিশয় ক্ষমাশীল” বলে তিনি বুঝিয়ে দিয়েছেন আমাদের প্রতিপালক এতই ক্ষমাশীল যে তিনি অবশ্যই ক্ষমা করে দেবেন। এইটুকু বলেই কিন্তু তিনি থেমে যাননি। ক্ষমা চাইলে ক্ষমা তো পাবোই,পাশাপাশি সুপার-বোনাস হিসেবে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার অসীম রাহমাত থেকে আমরা আরো কি কি পাবো তাও বলেছেন সাথে সাথে। বলেছেনঃ

.

“তিনি আকাশ থেকে তোমাদের ওপর প্রচুর বৃষ্টি বর্ষাবেন৷

সম্পদ

ও সন্তান-সন্তুতি দিয়ে সাহায্য করবেন,

তোমাদের জন্য বাগান সৃষ্টি করবেন

আর নদী-নালা প্রবাহিত করে দিবেন৷”

.

আল্লাহু আকবার 😀

.

৩.

আমরা এই দুইটা দু’আ সবসময় করতে পারি। সালাতের শেষে, সিজদাতে, হাঁটতে, চলতে, ঘুরতে, ফিরতে,মনে মনে আল্লাহর সাথে কথা বলতে পারি। আল্লাহকে সবসময় বলতে পারিঃ

“আল্লাহুম্মাগফিরলী” (ও আল্লাহ, আমাকে মাফ করে দাও)

“আল্লাহুম্মাগফিরলী” (ও আল্লাহ, আমাকে মাফ করে দাও)

“আল্লাহুম্মাগফিরলী” (ও আল্লাহ, আমাকে মাফ করে দাও)

.

এভাবে বলতে থাকতে পারি।

.

আরেকটা দু’আ করতে পারি, যেটা আমাদের প্রাণপ্রিয় রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বেশি বেশি করতেনঃ

“রাব্বানা আতিনা ফিদ্দুনিয়া হাসানাতাও (হে আমাদের রব! আমাদের দুনিয়ায় কল্যাণ দাও)

ওয়াফিল আখিরাতি হাসানাহ (এবং আখেরাতেও কল্যাণ দাও)

ওয়াক্বিনা ‘আজাবান্নার (এবং আগুনের আযাব থেকে আমাদের বাঁচাও)”

.

৪.

শেষের দু’আটা আমাদের প্রিয় রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সবসময় করতেন, বেশি বেশি পড়তেন। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা পবিত্র আল-কুরআনের সুরা বাকারার ২০১ নং আয়াতে এই দু’আটি উল্লেখ করেছেন। এই দু’আতে একটা অসাধারণ শিক্ষণীয় ব্যাপার আছে। খুবই ইন্টারেস্টিং!

.

ভালো করে খেয়াল করলে দেখবেন, আমি আয়াতটাকে তিনভাগে ভেঙ্গে লিখেছি।

.

প্রথমভাগে, আমরা আল্লাহর কাছে দুনিয়ার কল্যাণ কামনা করছি। কেমন কল্যাণ? কেমন দুনিয়া? আমরা আল্লাহর কাছে আমাদের জন্যে দুনিয়ার মাঝে যা বেস্ট শুধুমাত্র তাই চাইছি। এবং সেই বেস্ট আল্লাহই ঠিক করে দেবেন, যেহেতু আমরা জানি না কোনটা আমাদের জন্যে ফাইনালি কল্যাণ বয়ে আনবে।

.

দ্বিতীয়ভাগে, আমরা আল্লাহর কাছে আলখিরাতের কল্যাণ কামনা করছি। কেমন কল্যাণ? কেমন আখিরাত? বেস্ট আখিরাত, সবচেয়ে অসাধারণ আখিরাতের জীবন চাইছি।

.

তৃতীয়ভাগে, আমরা আল্লাহর কাছে আল্লাহর আগুনের ভয়ংকর ‘আজাব হতে মুক্তি চাইছি। বাঁচতে চাইছি। এক সেকেন্ডের জন্যেও যেন সেই শাস্তি আমাদেরকে না ছুঁয়ে দেয় এটাই আমাদের কামনা। আমরা যেন এক সেকেন্ডও ঐ আগুনে থাকার কথা চিন্তা না করি। আল্লাহ আমাদেরকে রক্ষা করুন।

.

শিক্ষনীয় ব্যাপার এটাই যে, দু’আর তিনটা ভাগের মাঝে একটা ভাগ শুধু আমরা দুনিয়ার জন্যে বরাদ্দ রাখছি। আর আখিরাত এত এত এতই ইম্পরট্যান্ট যে দু’আর দুইটা ভাগ আমরা আখিরাতের জন্যে বরাদ্দ রাখছি। অর্থাৎ একশভাগের মাঝে ৩৩.৩৩ ভাগ শুধু দুনিয়ার কল্যাণের জন্যে, আর ৬৬.৬৬ ভাগ আমাদের মনোযোগ থাকবে অনন্ত আখিরাতের দিকে, আমাদের আসল বাসার দিকে, যেখান থেকে আমরা এসেছি,যেখানে আমাদেরকে চিরকাল থাকতে হবে।

.

আমি যেন না ভুলে যাই, আমি এখানে একটা মিশন নিয়ে এসেছি, আরাম করতে নয়।

আরাম করতে হয় বাসায় গিয়ে। আয়েশ করতে হয় বাসায় গিয়ে।

আমার বাসা এইখানে না।

Posted in Uncategorized | Leave a comment

হিমু আর সুপারস্টার

হিমু।
বাংলা সাহিত্যে সম্ভবত সবচাইতে জনপ্রিয় চরিত্র। বই পড়ুয়া সব ছেলেই জীবনে কখনো না কখনো হিমু হতে চেয়েছে, আর মেয়েরা হতে চেয়েছে রূপা। হিমুর সবচাইতে আকর্ষণীয় দিক, যেটা অবচেতনভাবে সবাইকে টানে, সেটা হচ্ছে তার করতে থাকা ভালো কাজগুলো। সে গরীবদের সাথে সহজে মিশে যায়। সে নিজেও গরীব। মানুষের উপকারে ঝাঁপিয়ে পড়তে তার জুড়ি নেই। মোটকথা, মানুষ হিসেবে তাকে একজন ভালো কাজ করতে থাকা মানুষ বলা যায় (যদিও জীবনের আসল উদ্দেশ্য আরো অনেক অনেক বড়)। সে মিসির আলী আর শুভ্রর চাইতেও বিখ্যাত। কারণ হচ্ছে তার উদ্ভট কর্মকান্ড। সে প্রায়ই গোসল করে না। এত নোংরা চলাফেরা করে যে প্রায়ই তার শরীর হতে উৎকট গন্ধ বের হয়। আরো বলতে পারি, বাট ওকে নিয়ে ঋণাত্মক কথা ফাঁদতে এই লেখাটা লিখছি না। আসল কারণ অন্য।
.
আমি নিজে ওর ভয়াবহ ফ্যান ছিলাম। কেমন ফ্যান বলি। ওর সম্পূর্ণ সমগ্র ৪৫০টাকা দিয়ে যখন কিনে এনেছিলাম, তখন আমি ইন্টারে পড়ি। টিউশানি করে নিজের খরচ নিজে ম্যানেজ করার ট্রাই করি, তবুও পোষায় না। প্রায়ই লজ্জিত অবনত মুখে মিনমিন করে আব্বুর কাছে হাত পাততে হয়। কি লজ্জা! কি লজ্জা!! ১৫ বছর বয়সী ঝকঝকে তরুণ ছেলে হয়ে আব্বুর ঘাড়ে বসে খাওয়ার মতো লজ্জা দুনিয়াতে আর কি হতে পারে? তার উপর টাকার জন্যেও প্রায়ই আব্বুর কাছে হাত পাতা। আমার পৃথিবী লজ্জায় আরক্তিম হয়ে যেতো। ঠিক এইরকম দুঃসময়ে গোটা ৪৫০টা টাকা (আম্মুর ভাষায়) ‘ফেলে দিয়ে’ একটা ‘আউট বই’ কিনে আনা, যেটার সবগুলো বই-ই আমি আগেও কয়েকবার করে পড়েছি, এরকম ভয়াবহ বিলাসিতার মতো জঘন্য অপরাধ আর কি হতে পারে? সেইদিন লজ্জায় আর আম্মুর সামনে যাইনি। লুকিয়ে ভাত খেয়ে শুয়ে পড়েছি। তার উপর আমার পিচ্চি লাইব্রেরীর এই একটা মাত্র বই-ই কারো বাসায় নিয়ে পড়ার অনুমতি ছিলো না, নেই।
.
দিন বদলেছে। নাস্তিকতার নিঝুম অন্ধকারে ঢাকা ঘন অরণ্য পেরিয়ে তখন সবেমাত্র ইসলামের অসাধারণ সবুজের মখমলে ঢাকা অপরূপ পাহাড়ের পাদদেশে পৌঁছেছি। সারা গায়ে অরণ্য পেরিয়ে আসা ক্লান্তি আর কাঁদা জড়ানো। পাহাড়ের পাদদেশে থাকা ঝরঝর করে বইতে থাকা তাওবার ঝরণাতে সব কাঁদা আর ক্লান্তি ধুয়ে নিলাম। পাহাড়ের চূড়ায় উঠার স্বপ্ন দুই চোখে। প্রথম পদক্ষেপ যেদিন রাখলাম, সাথে সাথেই চারপাশ বদলে গেলো। বন্ধু হারালাম, হারালাম চারপাশের প্রায় সব মানুষগুলোকে। শরীরের পোষাকে মোড়ানো এই ‘আমি’, আমার ‘রূহ’, বুঝতে পারলাম, আমি কত্ত একা। সবাই-ই এই সত্যটা জানে, অনুভব করেছে একবার হলেও। এই আমি (রূহ) এসেছি একটা মিশনে, একটা সফরে। মুসাফির এই আমি (রূহ) কত কিছু নিয়ে জাঁকিয়ে ব্যবসা করতে বসে গিয়েছি সফরের মিশন ভুল মেরে। ভুলে গিয়েছি, বারবার ভুল মেরে যাই, আমি একা। সবাই একা। একা যেদিন আবার ট্রেইনে উঠে যাবো, সেইদিন সব, একদম সব রেখেই, এমনকি পরনের কাপড়টাও ফেলে ট্রেইনে উঠে পড়তে হবে। সাথে যাবে শুধু আমার আসল ঠিকানায় (আখিরাতে) পাঠিয়ে দেয়া সম্পদগুলো, ভালো আর খারাপ কাজগুলো। সবই জানি। তবু, স্মরণিকার অভাবে প্রতিদিনই ভুল মেরে বসি। প্রতিদিন। প্রতিদিনই তাই আবার সেই তাওবার ঝরণায় ভিজে পরিস্কার হওয়ার জন্যে নেমে আসতে হয়। আবার হাঁটা শুরু হয় নতুন করে।
.
বই পড়ার রুচি এর মাঝে আমূল বদলে গেলো। জাফর ইকবালের বইয়ের পাতায় লুকিয়ে থাকা (জামায়াত বিরোধীতার নামে) ভিলেন হিসেবে প্রায়ই দাড়ি টুপিওয়ালা মুসলিমদের নিয়ে লেখা ইসলাম বিদ্বেষ বড্ড গায়ে লাগে। হুমায়ুন আহমেদের অবৈধ প্রেম নিয়ে এত এত লেখা বইগুলো আর ছুঁয়ে দেখার রুচি হয় না। কত শত অসাঢ় উপন্যাস এখনো প্রকাশিত হয়। পড়তে ভালো লাগে না। কিছুই শেখার নেই, কিছুই জানার নেই। পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠার পাহাড়ে কেবলই বালখিল্যতা আর আদিখ্যেতা। অর্ধেক জীবন যে অর্থহীনতায় ফেলে এসেছি, সেই স্মৃতি কেবলই কুরে কুরে খেয়ে চলে। কিছু একটা করতে হবে। জানতে হবে অনেক, করতে হবে আরো বেশি কিছু। অনেক পড়তে হবে। সত্যিকারের যেগুলো জানার, জানতে হবে। কাজে লাগাতে হবে নিজের লাইফে, জানাতে হবে অন্যকে। অনন্তের পথের জন্যে যে অনন্ত পাথেয় দরকার সেটা যে আমাদের কারোরই নেই। কারোর না।
.
হাঁটতে হাঁটতে একসময় ওয়াইস আল কারণি নামের মানুষটার সাথে পরিচয় আমার। অসম্ভব সাদাসিধা একজন মানুষ ছিলেন তিনি। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সময়ের মুসলিম হয়েও উনার সাথে দেখা করতে পারেননি তিনি। নিজের জীবনের সবচেয়ে বেশি ভালোবাসার মানুষটার সাথে দেখা হয়নি তাঁর কেবলই নিজের আম্মুর দেখাশোনা করতে গিয়ে। সাহাবী হতে পারেননি। নবিজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামও তাঁকে কখনো দেখেননি, কিন্তু জানতেন তাঁর কথা (আল্লাহ জানিয়েছেন)। তাইতো দুনিয়া হতে চিরবিদায়ের আগে যখন সাহাবীদের মাঝে একটা নীরব আশার আলো জ্বলছিলো যে নবিজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের গায়ের পোশাকটি হয়তো তাকেই দেয়া হবে, তখন আমার নবিজী নিজেই জানিয়ে দিলেন পোশাকটি দিতে হবে ওয়াইস আল কারণীকে। সবাই তো অবাক! কে এই ওয়াইস আল কারণী? কেউ তাঁকে কোনদিন দেখেনি, নামও শোনেনি। কে এই অসাধারণ আত্মা যাকে না দেখেও রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর এত্ত প্রশংসা করছেন? অবশেষে হজরত ওমর এবং আলী রাদিয়াল্লাহু তাআলা যখন মানুষের মুখে শুনে শুনে এই ‘বোকা আর হতদরিদ্র, অচেনা’ মানুষটিকে খুঁজে বের করলেন, তখন তিনি একটা গাছের নিচে বসে ইবাদত করছেন, চারপাশে অনেক উট।
.
ওমর (রাঃ) এবং আলী (রাঃ) তাঁর সামনে গেলেন, তাকে উদ্দেশ্য করে বললেনঃ আসসালামু ওয়ালাইকুম।

ওয়াইস তাঁর ইবাদত শেষ করে তাঁদের দিকে ফিরে সালামের উত্তর দিলেন।
তাঁরা তাকে জিজ্ঞেস করলেনঃ কে তুমি?

সে বললঃ আমি উট দেখাশোনা করি এবং একটি গোত্রের কাজের লোক।

তাঁরা বললেনঃ আমরা তোমাকে তোমার পশু পালনের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করিনি, এমনকি তুমি কোনো গোত্রের কাজের লোক কিনা তাও জানতে চাইনি; আমরা জানতে চাচ্ছি তোমার নাম কী?

সে বললঃ আব্দুল্লাহ (আল্লাহর বান্দা)।

তাঁরা বললেনঃ এই আসমান এবং জমিনে যতো আল্লাহর সৃষ্টি আছে সবই আল্লাহর বান্দা; কিন্তু তোমার নাম কী যা দিয়ে তোমার মা তোমাকে সম্বোধন করেন?

সে বললঃ তোমরা আমার কাছে কী চাও?

তাঁরা বললেনঃ “ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একবার আমাদেরকে ওয়াইস আল কারনি নামে এক ব্যক্তির কথা বলেছিলেন। তাঁর বর্ণনা অনুযায়ী সেই ব্যক্তির থাকবে নীলাভ কালো চোখ এবং তার বাম কাঁধের নিচে এক দিরহামের মতো একটি সাদা দাগ থাকবে। তাই দয়া করে আমাদেরকে দেখতে দাও যে তোমার ঐ সাদা দাগটি আছে কিনা। তাহলেই আমরা বুঝবো আমরা যাকে খুঁজছি সে তুমি কি না?
ওয়াইস তখন তার বাম কাঁধ উন্মুক্ত করে দেখালেন, দিরহামের মতো সেই সাদা দাগটি স্পষ্ট ফুটে আছে তার বাম কাঁধের নিচে। ওমর (রাঃ) এবং আলী (রাঃ)-র বুঝতে অসুবিধা হলো না যে এই সেই ওয়াইস আল কারনি যার কথা অনেক অনেক বছর আগে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরকে বলেছিলেন।
.
তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জীবিত। তিনি একটি হাদিসে কুদসি বর্ণনা করেছিলেন (আবু হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্নিত হয়েছে হাসিদটি) যেখানে তিনি বলেন যে, আল্লাহ বলেনঃ “আল্লাহ সুবহানাহুওয়াতালা ভালোবাসেন তাঁর সৃষ্টিকে যে আল্লাহ ভীরু, যার অন্তর পরিশুদ্ধ, তাদেরকে যারা নিজেদের গোপন রাখে এবং তাদেরকে যারা নিরপরাধ, যার মুখমন্ডল ধূলো-মলিন, যার চুল এলোমেলো, যার পেট খালি এবং সে যদি শাসকের সাথে দেখা করার অনুমতি চায় তাহলে তাকে তা দেয়া হয় না। এবং সে যদি একটু সম্ভ্রান্ত ঘরের মেয়ে বিয়ে করতে চায় তাহলে তাকে ফিরিয়ে দেয়া হয় এবং সে যদি দুনিয়ার কিছু ত্যাগ করে এর অভাব কখনোওই সে বোধ করে না। এবং সে যদি কোথাও থেকে বের হয়ে যায় তাহলে তার বের হয়ে যাওয়াও কেউ লক্ষ্য করে না। সে যদি অসুস্থ হয়, তাহলে তাকে দেখতে কেউ আসে না এবং সে যদি মারা যায় তাহলে তাকে কবর পর্যন্ত পৌঁছে দিতেও কেউ আসে না।”
.
এই হাদিস শুনে সাহাবারা (রাঃ) তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে জিজ্ঞেস করেছিলেনঃ

“ইয়া রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, এরকম একজন ব্যক্তিকে আমরা কিভাবে খুঁজে পাবো?
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছিলেনঃ ওয়াইস আল কারনি হচ্ছে এমনই একজন ব্যক্তি।

তখন সাহাবারা (রা) জিজ্ঞেস করেছিলেনঃ কে এই ওয়াইস আল কারনি?

.
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছিলেনঃ তার গাত্র বর্ণ কালো, কাঁধ প্রশস্থ, উচ্চতা মাঝারি, তার দাঁড়ি তার বুক পর্যন্ত লম্বা, তার চোখ সবসময় অবনমিত থাকে সেজদার স্থানে। তার ডান হাত থাকে তার বাম হাতের ওপর। সে একান্তে এমনভাবেই কাঁদে যে তার ঠোঁট স্ফীত হয়ে যায়। সে একটি উলের পোশাক পরে এবং আসমানের সবাই তাকে চেনে। যদি সে আল্লাহর নামে কোনো শপথ করে, সে তা পালন করে। তার ডান কাঁধের নিচে একটি সাদা দাগ রয়েছে। যখন আখেরাতের দিন আসবে এবং আল্লাহর বান্দাদেরকে বলা হবে জান্নাতে প্রবেশ কর, তখন ওয়াইসকে বলা হবে ‘দাঁড়াও এবং সুপারিশ কর’ আল্লাহ সুবহানাহুওয়াতালা তখন তার সুপারিশ অনুযায়ী ‘মুজির’ এবং ‘রাবিয়া’ (ওয়াইসের দুই গোত্রের নাম) গোত্রের লোক সংখ্যার সমান লোককে ক্ষমা করে দেবেন । সুতরাং হে ওমর এবং আলী, তোমরা যদি কখনও তার দেখা পাও তাহলে তাকে বলো তোমাদের জন্যে আল্লাহর কাছে সুপারিশ করতে, তাহলে আল্লাহ তোমাদের ক্ষমা করবেন।”
.
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ওয়াইস সম্পর্কে আরো বলেছিলেন যে, তার ঘরে বৃদ্ধা মা আছে। যার পুরো দেখা শোনা ওয়াইস করেন এবং বৃদ্ধা মাকে দেখা শোনার জন্যে সে ইসলাম ধর্ম গ্রহনের পর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাথে দেখা হওয়ার যে সুবর্ণ সুযোগ ছিল তা গ্রহন করতে পারেনি।

(ওয়াইস আল কারনি তার মায়ের দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে রাসুলুল্লাহ(সাঃ)এর সাহাবি হওয়ার মর্যাদা থেকে বঞ্চিত হন। তাই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর জীবদ্দশায় ইসলাম কবুল করলেও তিনি তাবেয়ি রয়ে যান।)

.
এই ঘটনার পর প্রায় দশ বছর কেটে গেছে।রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আর তাদের মাঝে নেই। আবু বকর (রাঃ)ও দুনিয়া ছেড়েছেন। এর মধ্যে শত খোঁজার পরও ওয়াইস আল কারনিকে খুঁজে পাননি তাঁরা। আর আজকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর বর্ণনাকৃত সেই ওয়াইস আল কারনি তাদের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন।
ওমর (রাঃ) এবং আলী (রাঃ) ওয়াইস আল কারনিকে জড়িয়ে ধরে বললেনঃ “আমরা সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, তুমিই সেই ওয়াইস আল কারনি। সুতরাং আল্লাহর কাছে আমাদের জন্যে ক্ষমার সুপারিশ কর এবং আল্লাহ তোমাকেও ক্ষমা করুন।”

উত্তরে ওয়াইস বললেনঃ কোনো আদম সন্তান বা নিজেকে আমি ক্ষমা করানোর ক্ষমতা রাখি না , তবে এই জমিনে ইমানদার পুরুষ এবং ইমানদার নারী রয়েছে, মুসলিম নারী মুসলিম পুরুষ রয়েছে, যাদের দোয়া আল্লাহর দরবারে কবুল হয়।
তাঁরা বললেনঃ সত্যিই তাই।

তখন তিনি বললেনঃ আপনারা দুজন আমার সম্পর্কে জানেন এবং আমি আমার অবস্থান সম্পর্কে জানি কিন্তু আপনারা কারা?

আলী (রাঃ) তখন ওমর (রাঃ)কে দেখিয়ে বললেনঃ ইনি হচ্ছেন আমিরুল মুমিনিন ওমর বিন খাত্তাব (রাঃ) এবং আমি হচ্ছি আলী বিন আবু তালিব।
.
ওয়াইস তাদের পরিচয় শুনে সোজা হয়ে দাঁড়ালেন এবং তাদের উদ্দেশ্য করে বললেনঃ আসসালামু ওয়ালাইকুম ইয়া আমিরুল মুমিনিন এবং আলী আপনাকেও। আল্লাহ আপনাদেরকে এই উম্মাহর জন্যে উত্তম প্রতিদান দান করুন।

তাঁরাও বললেনঃ আল্লাহ তোমাকেও উত্তম প্রতিদান দিন।

এর পর ওয়াইস আল কারনি তাদের জন্যে দোয়া করলেন।

ওমর (রাঃ) ওয়াইস আল কারনিকে বললেনঃ “ তুমি এখন ইহজীবন এবং পরকালে আমার বন্ধু।”

.
ওয়াইস আল কারনি জানেন ইহজীবনে ওমরের বন্ধু হওয়া মানে সুনাম এবং একটি স্বচ্ছল জীবন, তাই তিনি ওমর (রাঃ)এর বন্ধুত্ব তো গ্রহন করলেন কিন্তু খুব বিনয়ের সাথে তার সাথের স্বচ্ছলতা এবং সুনাম যা ওমর (রাঃ) এর মাধ্যমে সে পেতে পারত, সেটা প্রত্যাখ্যান করলেন। তিনি যেমন আছেন ঠিক তেমনই থাকার ইচ্ছে পোষণ করলেন।

ওমর (রাঃ) বলেনঃ তুমি কোথায় যেতে চাও এখন? ওয়াইস আল কারনি বলেনঃ ইরাকের কুফায়।
ওমর(রাঃ): ঠিক আছে আমি একটি চিঠি লিখে দেই কুফার গভর্নরকে যাতে সে তোমার ভালো দেখাশোনা করতে পারে।

ওয়াইস বললেনঃ দয়া করে এই কাজ করবেন না। কারণ আমি নিজেকে এইভাবে অচেনা রাখতেই পছন্দ করি। আমি আল্লাহর রাস্তায় এভাবেই অপরিচিত হয়েই থাকতে চাই।

.
এরপর সে কুফায় চলে যায়। সেখানেই বসতি স্থাপন করে। এইভাবে কেটে যায় আরও কিছু বছর। একবার কুফা থেকে ওয়াইস আল কারনির গোত্রের এক সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি মদিনায় আসেন। তার কাছে ওমর(রাঃ) ওয়াইস আল কারনি কেমন আছেন তা জানতে চান। খলিফা ওয়াইস আল কারনির ব্যাপারে জিজ্ঞেস করছে দেখে সেই ব্যক্তি খুব অবাক হয় , সে খালিফা ওমর (রাঃ)কে উদ্দেশ্য করে বলেঃ আমি তাকে দরিদ্রতায় নিমজ্জিত দেখে এসেছি্‌ ,তার ঘরে কোনো আসবাব নেই, কেন আপনি এই ব্যক্তির কথা জিজ্ঞেস করছেন।
ওমর (রাঃ) এই ব্যক্তিকে বললেনঃ যদি তুমি তার দেখা পাও , তাকে বলো তোমার জন্যে দোয়া করতে কারণ রাসুলুল্লাহ (সাঃ) তার কথা বলেছিলেন।

সেই ব্যক্তি কুফায় ফিরে ওয়াইসের সাথে দেখা করে। তাকে বলেঃ ওয়াইস আমার জন্যে আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা কর।

ওয়াইস বললেনঃ তুমি নিজে আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা কর। কারণ তুমি মাত্র সফর করে আসলে। আর মুসাফিরের দোয়া আল্লাহ কবুল করেন।

সে বললঃ না না। আমি চাই তুমি আমার জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা কর।

ওয়াইস আল কারনি একটু চুপ থাকলেন তারপর বললেনঃ“তোমার কি ওমরের সাথে দেখা হয়ে ছিল?”
সে বললঃ হ্যাঁ।

ওয়াইস আল কারনি বুঝতে পারলেন কী হয়েছে ব্যাপারটা। তিনি কিছু বললেন না। ঐ ব্যক্তির জন্যে দোয়া করলেন।

এই ঘটনা পুরো কুফায় আগুনের মত ছড়িয়ে পড়ল , সবাই জেনে গেল ওয়াইস আল কারনি সম্পর্কে । নিজেদের আল্লাহর দরবারে মাফ করিয়ে নিতে মানুষজন যখন ওয়াইসের খোঁজে তার বাড়ি গেল , দেখলো বাড়ি খালি পড়ে আছে-ওয়াইস নেই। নাম, যশ, খ্যাতি সব কিছু দুহাত দিয়ে ছুঁড়ে ফেলে একমাত্র আল্লাহর জন্যে বেঁচেছেন তিনি। তার তাকওয়া, তার মর্যাদা তিনি কারো কাছে প্রকাশ করতে চাননি। একমাত্র আল্লাহর জন্যেই সব করেছেন এবং আল্লাহর কাছ থেকেই ইনশাআল্লাহ তিনি এর বিনিময় পাবেন।
.
সত্যি ওয়াইস আল কারনি একজন অপরিচিত সেলিব্রিটি। আর আমার আরেকজন সুপারহিরো

আমার আর এখন হিমু হতে ইচ্ছে করে না। একজন ওয়াইস আল কারণী হতে ইচ্ছে করে। খুব।

আল্লাহ আমাদের সকল কথা এবং কাজকে সঠিক ইখলাসের চাদর দিয়ে ঢেকে দিন। আমিন।

(শেষের অর্ধেকের বিশাল একটা অংশ এই http://tinyurl.com/m5mtva3 লিংক থেকে হুবহু নেয়া)

Posted in Uncategorized | Leave a comment

সাফল্য

১.
তাঁকে ঘর থেকে বের করে দেয়া হয়েছিলো। আক্ষরিক অর্থেই তাড়িয়ে দেয়া হয়েছিলো। হোমলেস পুওর গাই। এইরকম ঘরবাড়িহীন লোককে আমরা জীবনে সম্পূর্ণ ব্যর্থ বলি। এই জীবন আমাদের কারোই কাম্য নয়। কিন্তু আমি যে প্রিয় মানুষটার কথা বলছি তিনি হচ্ছেন পৃথিবীর বুকে এ যাবৎ আসা সবচাইতে সফল মানুষদের মাঝে একজন। প্রতিদিন সালাতে অন্তত পাঁচবার এই অসাধারণ সফল মানুষটার নাম আমরা উচ্চারণ করি। অসাধারণ এই মানুষটা হচ্ছেন আমাদের সবার প্রিয় ইবরাহীম আলাইহিস সালাম।

২.
পৃথিবীর বুকে সবচাইতে বড় প্রাসাদ যার ছিলো সেগুলোর মাঝে সবচাইতে অসাধারণ ছিলো তার প্রাসাদ। সে ছিলো আপাতঃদৃষ্টিতে একজন সফল শাসক। তার কথা অমান্য করার সাহসও কেউ করতো না। তার হুকুম তামিল করার জন্যে চাকর বাকর, প্রজা হতে শুরু করে এক বিশাল শক্তিশালী সেনাবাহিনী ছিলো। ধন সম্পদ আর ক্ষমতার অনন্য এক উদাহরণ ছিলো সে। আমরা এইরকম একটা সফল জীবনই চাই। অথচ দুনিয়ার বুকে বিচরণ করা সবচেয়ে ব্যর্থ মানুষদের মাঝে আমরা তাকেই স্মরণ করি। ফেরাউন কে।

৩.
বছরের পর বছর নির্মম আঘাত সইতে হয়েছিলো তাঁকে। হতে হয়েছে রক্তাক্ত। তাঁকে যারা ভালোবাসতো, যারা তাঁর কথা শুনতো, তাদেরকে খুন করে ফেলা হয়েছে একের পর এক। করা হয়েছে অকথ্য, অবর্ণণীয় নির্যাতন। সবশেষে লুকিয়ে লুকিয়ে তাঁকে নিজের ভূমি ছেড়ে যেতে হয়। কারণ, তখনও তাঁকে খুন করার জন্যে খোঁজা হচ্ছে। সব ছেড়ে, নিজের ভূমি ছেড়ে যাকে লুকিয়ে লুকিয়ে পালাতে হচ্ছে তাঁর মতো ফালতু ক্যারিয়ারের অধিকারী, আর ব্যর্থ মানুষ কে হতে পারে? আমরা এমন জীবন চাই না। আমরা এমন জীবন থেকে মুক্তি চাই, রক্ষা চাই। এইরকম ব্যর্থ হওয়ার স্বপ্ন যেন আমাদের কাউকে না ঘিরে ধরে এই হলো আমাদের কামনা। অথচ এই মানুষটা হচ্ছেন পৃথিবীতে এই পর্যন্ত যত প্রাণ এসেছে, এবং ভবিষ্যতে আসবে, তাদের সবার মাঝে সবচাইতে শ্রেষ্ঠ এবং সবচাইতে সফল। মুহাম্মাদ ইবনে আবদুল্লাহ। সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া আলিহী ওয়া সাহবিহী ওয়া সাল্লাম।

৪.
বিল গেটস না। আরেকজন। ধন সম্পদের এমন এক পাহাড় ছিলো তার যে সেইগুলো বিশাল বিশাল ভল্টে রাখতে হতো। কল্পনা করা যায়? তার অনেক অনেক ভল্ট ছিলো এইরকম। সবচাইতে বেস্ট রাইড ছিলো তার, বাড়ির কথা বাদই দিলাম। রাস্তায় টাইট টাইট গেঞ্জি পরে মানুষকে মাসল দেখিয়ে ঘুরে বেড়ানো মানুষ দেখেছেন না? শক্তিশালী মানুষ? কিংবা রেসলিং তো দেখতেন ছোটবেলায়। ইয়া বিশাল বিশাল শক্তিশালী মানুষ। অবলীলায় একজন আরেকজনকে তুলে আছাড় মারছে শুধু শুধু। মনে পড়েছে? এইরকম বিশাল বিশাল কয়েকজন মানুষ লাগতো শুধু একটা ভল্টের চাবি বহন করতে। আবারো বলছি, শুধু একটা চাবি বহন করতেই কয়েকজন মুশকো জোয়ানের ঘাম ছুটে যেতো। ভল্টটা কত্ত বড় একবার ভাবুন। এইরকম অনেকগুলো ভল্ট যার আছে সে কোন লেভেলের জিনিস তা একবার ভাবুন। এর চেয়ে সফল আর কিভাবে হওয়া সম্ভব? এইরকম লাইফ একবার পেলে আর কি লাগে? আমরাতো এমন জীবনই চাই। নিশ্চিন্ত জীবন। নাভিতে সরিষার তেল দিয়ে বীচে শুয়ে থাকবো, আর আরেকটা মানুষ এসে সরিষার তেল হাতে নিয়ে সারা গায়ে ডলে দলাই মলাই করবে চপাৎ চপাৎ করে। ফাইজলামি করলাম! আসলে, ওই মানুষটাই তো সফল। অথচ দুনিয়ার বুকে আরেকজন ব্যর্থ মানুষ হিসেবে তার নাম উঠে গেছে। কারুন তার নাম। চিনেছেন নিশ্চয়ই?

তার মানে কি গরীব হলেই সফল, আর ধনী লোক, ক্ষমতাবান লোক মানেই খবর আছে? এই কথাটা কি আমি একবারো বলেছি? তাহলে ভূল বুঝলেন যে?
ওয়েইট! আরেকজনের কথা বলি।

৫.
তাঁকেও বিশাল সাম্রাজ্য দেয়া হয়েছিলো। দেয়া হয়েছিলো অদ্ভুত কিছু সুপার পাওয়ার। চোখে দেখিনা এমন প্রাণকে করা হয়েছিলো তাঁর হুকুমের আজ্ঞাবহ। প্রাণীদের কথা বোঝার সুপার পাওয়ার দেয়া হয়েছিলো তাঁকে। এত সম্পদ আর ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও তিনি ব্যর্থদের লিস্টে নেই। বরং সফলদের লিস্টের শীর্ষে থাকা মানুষদের একজন। সুলাইমান। আলাইহিস সালাম।

৬.
ওমা!
তাহলে সফলতা আর ব্যর্থতার নির্ণায়ক কি?
আসলে আমরা সবাই, হ্যাঁ, প্রত্যেকটা মানুষই ডুবে আছি ক্ষতির ভিতরে। ডুবছি তো ডুবছিই। প্রত্যেকেই। ধনী বিজনেসম্যান, গবেষক, শিক্ষক, ঠেলাগাড়িওয়ালা, রিকশাওয়ালা, ছাত্র-ছাত্রী, গৃহিনী সবাই ডুবে যাচ্ছি ক্ষতির মাঝে। কিসের ক্ষতি? সময় হারিয়ে ফেলার ক্ষতি। ঠিক কাজ না করে ক্ষতিতে অবিরাম ডুবতে থাকার ক্ষতি। ডুবে যাচ্ছি, তবু বুঝতে না পেরে কিছুই করছি না বাঁচার জন্যে। ডুবে যেতে যেতে সবচাইতে ভয়ংকর ক্ষতিতে চিরদিনের জন্যে ডুবে যাওয়ার ক্ষতি। কেউই এই ক্ষতি থেকে বাঁচবে না। কেউ না।

শুধু সেই বাঁচবে। সেই স্পেশাল। সেই বেঁচে যাবে।
কে?
যে মাত্র চারটা কাজ ঠিকভাবে করবে।
কি সেই চারটা কাজ?
সংক্ষেপে বলি। আবারো বলে দিচ্ছি যে আমি সংক্ষেপে বলছিঃ
১. যে “পরিপূর্ণভাবে” ঈমান আনবে,
২. তারপরে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যে ভালো কাজ করতেই থাকবে,
৩. একই সাথে চারপাশের সবাইকে (হ্যাঁ, সবাইকে) আন্তরিকভাবে সত্যের উপদেশ দেবে এবং
৪. নিজের চারপাশের সবাইকেই আন্তরিকতার সাথে, ভালোবাসার সাথে সবসময় ধৈর্য্য ধরার উপদেশ দেবে।

৪টা সিম্পল কাজ। হ্যাঁ, এই চারটা সিম্পল কাজই করা এত শক্ত মনে করি আমরা। করতে পারি না। বেকুব আর কাকে বলে? কিভাবে এই চারটা কাজ পারফেক্টলি করবেন? সেটা জানতে সুরা আসরের তাফসীর পড়ুন, লেকচার শুনুন। এই সুরা আসরে মাত্র তিনটা পিচ্চি পিচ্চি আয়াত। এক বাক্যের এই সুরাটা দুই লাইনেই শেষ। কিন্তু এই সুরা আসরকে বলা যায় সমগ্র কুরআনের সারসংক্ষেপ। হ্যাঁ, সমগ্র কুরআনের। যদি শুধুমাত্র এই ছোট্ট সুরাটায় কি বলা হয়েছে ঠিকভাবে, সম্পূর্ণভাবে বুঝতে পারি, এবং সেই অনুযায়ী চলতে পারি, তাহলেই আমরা পাশ করে যাবো। গ্যারান্টিড!

আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা আমাদের সবাইকে অন্তত পাশ করার তৌফিক দিন, যাতে একফোঁটা শাস্তির ভয়াবহতাও আমাদের নাগাল না পায়। পুরস্কার হিসেবে যেন অনন্তকাল আড্ডা মারতে পারি, ঘুরাঘুরি করতে পারি আর শান্তিতে খোলা আকাশের নিচে সবুজ চাদরে ঘুমিয়ে যেতে পারি।

[কিভাবে একদম সহজেই, এমনকি মজায় মজায় জেনে যাবেন সুরা আসরে কি বলা হয়েছে? কমেন্টের লিঙ্কে দেয়া ৮মিনিটের মজার কার্টুনটা মন দিয়ে দেখুন। বুঝে যাবেন।]

————————-
রাত ১০টা ১১ মিনিট,
মুহাররামের ২০ তারিখ,
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হিজরাতের ১৪৩৬ বছর পর।

Posted in Uncategorized | Leave a comment

সুরা কাহাফের এক কণা

সুরা কাহাফের তাফসীরের লেকচার শুনছিলাম। শুধুমাত্র প্রথম ৮টা আয়াত নিয়ে আলোচনা শুনেই মুগ্ধ হয়ে গেলাম। পুরাটা শুনলে না জানি কি অবস্থা হবে!!! যাইহোক, আপনাদের সবার সাথে এইটুকু স্টাডি করার সময় আমার কি কি অনুভূতি হয়েছে সেটার সারসংক্ষেপ শেয়ার করার লোভ সামলাতে পারছি না।

সবচেয়ে অসাধারণ যে শিক্ষাটা পেয়েছি তা হলো, অবশ্যই অবশ্যই সমস্ত প্রশংসা একমাত্র আল্লাহর যিনি তাঁর বান্দার প্রতি এই কুরআন নাযিল করেছেন। এবং এই কুরআনের মাঝে তিনি কোন বক্রতা রাখেননি। একটুও না। এই কুরআন একদম স্ট্রেইট ফরোয়ার্ড। এই কুরআন একদম সোজা সাপ্টা স্ট্রেইট ফরোয়ার্ড কথা বলে দেয় আমাদেরকে। ঘুরায়ে প্যাঁচায়ে এমনভাবে কথা বলে না, যাতে সোজা পথ কোনটা তা নিয়ে আমরা কনফিউজড হয়ে যাবো। একজন সত্যপন্থী মানুষ সহজেই এই কিতাব বুঝতে পারে, এবং মেনে নিতে পারে।

শত বছর পার হয়, হাজার বছর চলে যায়। ১৯৫০ সালে যে সমকামীতাকে ঘৃণার চোখে মানুষ দেখতো, আজ সেই মানুষই সমকামীতাকে স্বীকৃতি দেয়ার আন্দোলন করে। আগে মানুষ এমন ঢোলা ব্যাগি জিন্স পরতো যে সেখানে দুই তিনজন একসাথে থাকতে পারতো, আর এখন এমন টাইট জামা পরছে যে সেখানে অক্সিজেনেরও প্রবেশ নিষেধ। মানুষ বদলায়, নিজেদের ভাবনা বদলে ফেলে। চারপাশের মানুষের চাপে নিজেকে বদলে নেয়। আদর্শ বদলে ফেলে। কম্প্রোমাইজ করে। খারাপ মানুষদের চাপে যেমন ভালো মানুষটাও আস্তে আস্তে নষ্ট হয়ে যায়, তেমনি উল্টোটাও ঘটে থাকে। এই হচ্ছে হিউম্যান নেইচার। তাই এই মানুষকে পথ দেখাতে এমন এক কিতাব আল্লাহ পাঠালেন যার সংরক্ষণের দায়িত্ব তিনি নিজেই নিয়েছেন, এবং এতে গাইডেন্স হিসেবে যা বলার সব সোজা সাপ্টা বলে দিয়েছেন। ২০১৪ তে এই কিতাব যে সত্যকে ধারণ করে, ১৯১৪ তেও তাই করতো, ১০১৪ তেও একই সত্য বলে এসেছে, এমনকি ২১১৪ তে যদি পৃথিবী থাকে, তখনও এটা একই সত্য বিবৃত করে যাবে। একচুলও বদলাবে না।

কি কি বলে এটা? সারসংক্ষেপ হিসেবে বলা যায়, এটা মানুষকে আল্লাহর শাস্তি হতে সাবধান করে দেয়। বারবার বারবার ওয়ার্নিং দেয় যাতে মানুষ আল্লাহর শাস্তিতে না পড়ে যায়। কঠিন শাস্তি হতে বারবার সাবধান করে দেয়, যাতে মানুষ সেই শাস্তি থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে চলতে পারে। পরিপূর্ণ ঈমান এনে যারা ভালো ভালো কাজ করতে থাকে, ইবাদাত করতে থাকে, মানুষের জন্যে অবিরাম ভালো কাজ করতে থাকে, মানুষের জন্যে রাহমাত হয়ে যায়, আলো হয়ে যায়, তাদেরকে এই কিতাব অসাধারণ প্রতিদান আর পুরস্কারের সুসংবাদও দিয়ে দেয়। একেবারে অনন্তকাল ধরে অসাধারণ সব পুরস্কার প্রাপ্তির ঘোষণা দিয়ে দেয় এই সত্য কিতাব।

এটা পৃথিবীর কথাও বর্ণণা করে। পৃথিবীর সৌন্দর্য, পৃথিবীর জীবনের আকর্ষণ, অবিরাম চাহিদার অতল গহ্বর এবং ক্ষণস্থায়ী দুনিয়ার বিভ্রান্তি, ধোঁকার পর ধোঁকা আর মায়ার ইন্দ্রজালের কথাও এটা ফাঁস করে দেয়। চিনিয়ে দেয় রিয়েলিটি আসলে কোনটা। কেন পৃথিবীকে এত এত সাজ সরঞ্জাম, ডিগ্রী, চাকরী, টেকনোলজি, আরাম আয়েশের ফাঁদ আর বিলাসিতার কৃষ্ণগহ্বর দিয়ে এভাবে সাজানো হয়েছে? ৭ নং আর ৮ নং আয়াতে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা সেটাও বলে দিয়েছেন। বলে দিয়েছেন, এসবই এভাবে দেয়া হয়েছে, পৃথিবীকে এভাবে সৌন্দর্য দিয়ে সাজানো হয়েছে, পরীক্ষা করার জন্যে। পরীক্ষা করার জন্যে যে, সব জেনেশুনে কারা পরিপূর্ণভাবে ঈমান আনে? কারা ভালো কাজ করে?
সুবহানাল্লাহ!

এবার চিন্তা করে দেখি একটু!
ক-ত কত্ত দয়ালু উনি! তিনি যে এখন এক্সাম নিচ্ছেন সেটা বলে দিচ্ছেন। আমরা এক্সাম হলেই বসে পরীক্ষা দিচ্ছি। পরীক্ষায় মনোযোগ না দিয়ে ঘুরছি ফিরছি, ফেইল করার দিকে নিজেকেই নিজে ঠেলে দিচ্ছি প্রতি মূহুর্তে। আর এইদিকে পরম দয়ালু তিনি পরীক্ষার হলে থাকা অবস্থাতেও বলে দিচ্ছেন যে, এটা পরীক্ষার হল। যা করতেসো, তা করলে নিশ্চিত ফেইল করবা। এইভাবে এইভাবে করো, তাইলে টেনেটুনে হইলেও পাশ করবা। এইভাবে এইভাবে করলে A grade পাবা। আর যদি আরেকটু কষ্ট করো তাইলে তোমাকে ১০০ তে ১০০ দিবো। আর যদি মিনিমাম পাশও করতে পারো তাইলে খুশি হয়ে এত এত্ত অসাধারণ পুরস্কার দিবো যে আর কক্ষণো কোন ডিস্যাটিসফেকশান থাকবে না। এমন পুরস্কার দিবো যা কোন চোখ কোনদিন দেখেনাই, কোন কান কোনদিন শুনে নাই, কোন হৃদয় কোনদিন কল্পনাও করতে পারে নাই। আর এই পুরস্কার পেতে থাকবা অনন্তকাল ধরে।

যে পৃথিবীর মোহে আমরা ডুবে গেছি, হারিয়ে যাচ্ছি, তলিয়ে যাচ্ছি, একবারও কি ভেবে দেখেছি, আজ এই মূহুর্তে আমি মরে গেলে এই পৃথিবীর কিচ্ছু যাবে না, আসবে না? যেসব জব হোল্ডার, বিজনেসম্যান, গবেষক, বা পি এইচ ডি ধারী মানুষ ২০০০সালে বিদায় নিয়েছেন, তাদের এখন কি অবস্থা একবার ভেবেছি? দুনিয়া তাদের ছাড়াই চলছে, কিন্তু তাদের এখন এই মূহুর্তে কি অবস্থা? এই অবস্থায় তো আমাকেও যেতে হবে শীঘ্রই। আমি চলে যাবো, তবু আমার অফিস চলতে থাকবে, আমার অনুপস্থিতিতে ডিপার্টমেন্টের কাজ থেমে যাবে না, আমার গবেষণা অন্য কেউ করবে, আমার স্ত্রী, স্বামী আর সন্তানের রিজিক্ব যেভাবে ছিলো সেভাবেই তারা তা পেতে থাকবে। ফ্যান্টাসি কিংডমের মজা থাকবে, নতুন নতুন টিভি সিরিয়াল, গানের এলবাম আর মুভি আসতেই থাকবে, কিচ্ছু থামবে না, কিচ্ছু না। শুধু আমার পরিপূর্ণ ঈমান আনার চান্স আর থাকবে না। সেইভাবে চলার সৌভাগ্য আর হবে না। ভালো কাজ করার সুযোগ আর থাকবে না। পরীক্ষার খাতা জমা হয়ে যাবে ঠিক নির্দিষ্ট সময়ে। আমি যে ভালো কাজ পরে করবো বলে, আজ না কাল করবো বলে যে আমল ফেলে রেখেছিলাম, সেটা আর আমি করতে পারবো না। পৃথিবী সূর্যের চারপাশে আপন গতিতেই ঘুরতে থাকবে। যে দুনিয়ার জীবনে আমরা ডুবে গেছি, হারিয়ে গেছি, সেই দুনিয়ার ফাইনাল পরিণতিও আল্লাহ আমাদের দেখিয়ে দিয়েছেন ৮নং আয়াতে। বলে দিয়েছেন,

“সবশেষে এসবকে আমি একটি বৃক্ষ-লতাহীন ময়দানে পরিণত করবো৷”

অসাধারণ! সুবহানাল্লাহ! এতই দয়ালু, এতই মেহেরবান আমাদের আল্লাহ যিনি আমাদের সবকিছু টেইক কেয়ার করেই ছেড়ে দেননি, কিভাবে সফল হতে হবে বারবার সেটাও শিখিয়ে দিয়েছেন। অথচ এতে তাঁর কোন লাভই নেই। তাঁর তো কোন কিছুরই অভাব নেই, কোন চাহিদাই নেই। তবুও অদ্ভুত এক আদরে ভিজিয়ে বারবার পথ দেখিয়ে দিয়েছেন আমাদেরকে সবচেয়ে যতন করে। সবটুকু স্নেহ, ভালোবাসা, আর রাহমাতের চাদরে জড়িয়ে। যাতে আমরা তাঁর দেখানো ইসলামে হালকা হালকাভাবে নয়, একটু একটু নয়, নিজের মতো করে নিজের মত অনুযায়ী নয়, বরং পরিপূর্ণভাবে প্রবেশ করি। পরিপূর্ণভাবে নিজেকে তাঁর কাছে সমর্পন করে, সবকিছুর দাসত্ব হতে নিজেকে মুক্ত করে সত্যিকারের স্বাধীন হতে পারি। এইখানে এবং অনন্তকালের জীবনে সফল হতে পারি। সত্যিকারের সফল।

আল্লাহ আমাদের সব্বাইকে সেই সফলতা চেনার তৌফিক দিন। সেই পথে একসাথে চলার তৌফিক দিন। আমাদের সব্বাইকে জাহান্নাম থেকে সম্পূর্ণরুপে নিরাপদ রাখুন। দশ সেকেন্ডের জন্যেও জাহান্নাম আর কবরের ভয়াবহতা আমাদের না ছুঁতে পারে। আমাদের সব্বাইকে একসাথে জান্নাতে ধুমায়ে আড্ডা মারার সুযোগ করে দিন।
আমীন।

————————–
সন্ধ্যা ৫টা ৫৪ মিনিট,
জুমু’আবার,
মুহাররামের ১৯তারিখ,
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হিজরাতের ১৪৩৬ বছর পর।

Posted in Uncategorized | Leave a comment

মধ্যবিত্ত পাথর পিতা

আজ বাবাদের কথা বলবো।
মধ্যবিত্ত পাথর পিতার কথা।

একটা ছেলে হিসেবেই জীবন শুরু হয় তাঁর। হাইস্কুলের গন্ডীতে আসতেই শুনতে হয়,

“বাবা, ভালো করে পড়াশোনা কর। তোকে নিয়ে আমাদের অনেক স্বপ্ন।”

সেই স্বপ্ন ছেলের চোখে আঁকা হয়ে যায়। অল্প কয়েকজন সেই স্বপ্নকে ছুঁয়ে দেয়। বাকিরা পারে না। বাবা মার চোখে চোখ রাখতেও লজ্জায় শতবার কুঁচকে যায় ছেলেটা। নাহ! কিছু একটা করতেই হবে। কিছু একটা খোঁজা শুরু করে সে। পায় না। খুঁজতে থাকে, খুজতেই থাকে। খুঁজে না পাওয়ার ব্যর্থতা তাকে কুরেকুরে খায় দিনরাত। মাঝরাতে কখনো ফুঁপিয়ে কান্নার মতো শব্দ পেয়ে হকচকিয়ে যায় ছেলের বালিশখানা।

ছিহ! ছেলেরা কাঁদে নাকি? কাপুরুষ কোথাকার!

কাপুরুষতার সামাজিক সংজ্ঞায় ছেলেটা কাঁদতেও পারে না। তারুণ্যের এক পর্যায়ে স্বপ্ন-টপ্নের কাঁথা পুড়ে ফেলে সে নিজ হাতে। কাঁথা পোড়া ছাই মুখে মেখে বেরিয়ে পড়ে টিকে থাকতে হবে বলে। কিছু একটা আঁকড়ে ধরে সে। নাহ! মনের মতো কিছু না। কাজ চলে যায় আর কি!

জীবনের প্রথম উপার্জনের টাকা হাতে আসে। বাবার হাতে পাঞ্জাবী আর মায়ের কোলে আলতো করে শাড়ির প্যাকেট দেখে কি যেন খোঁজে সে দুজনের মুখে। বাবার গম্ভীর মুখ থেকে বেরিয়ে আসা দু’আ আর মায়ের “টাকাগুলো নষ্ট করলি কেন” শুনে বুকের মাঝে আনন্দের সাথে সাথে কি একটা বিষাদ যেন মোচড় দিয়ে ওঠে। একগাল হাসি দিয়ে উঠে দ্রুত বাইরে বেরিয়ে আকাশ দেখে ছেলেটা।

আকাশের নীলিমায় কিছু খোঁজে, নাকি চোখ উপচে আসা কাপুরুষতার ভেজা স্পর্শ লুকাতে চায় সে?
এর উত্তর না হয় শুধু ছেলেরাই জানুক।

বন্ধুদের আড্ডায় হারানোর সময় হয় না ছেলেটার। ও বিলাসিতার সময় কোথায়? বন্ধুরা ঠাট্টা করে।
“খুব ভাব হইসে তোর না?”
“ব্যাটা কিপটা কোথাকার!”
এসব কথার কি কোন উত্তর হয়? আর বন্ধুরাওতো মীন করে কিছু বলে না। তবু বুকের ভেতর পাথর জমে। বলে ওঠে…
না থাক! নাই বা বলি।
সব কথা সবার জানতে নেই।

একটা মেয়েকে বেশ পছন্দ ছিলো ছেলেটার। ভেবে রেখেছিলো ওকেই বিয়ে করবে। মাকে বলেছিলো।
মাও বলেছিলো, “তুই চাকরীটা পেলেই আর চিন্তা নেই।”

ছেলে চাকরী পাওয়ায় মা এসে জিজ্ঞেস করে,

“বাবা, এবার বিয়েটা করে ফেল। ঐ মেয়ের ঠিকানা দে।”

ছেলের একগাল হাসি।
মা তবু চোখ দেখে ঠিক বুঝে নেয়।

তবু একটা মেয়ে ছেলেটার ঘরে জ্যোৎস্না হয়ে আসে। আসতে হয়। দুইদিন পরেই সেই জ্যোৎস্না কাকরোল, পটল আর টেংরা মাছের গন্ধে গ্রীষ্মের খটখটে রোদ্দুর হয়ে যায়। সন্তান আসে আবার এক চিলতে পূর্ণিমা হয়ে। ছেলের পড়াশোনা, রেজাল্ট খারাপের টেনশান আর এই নোংরা সমাজেই আদরের রাজকন্যা মেয়েটার বড় হয়ে যাওয়া পিতার কপালের ভাঁজের সংখ্যা বাড়িয়ে যায়। ছেলেটা পারবে তো কিছু করতে? টিকে থাকতে? মেয়েটা কারো সাথে প্রেম করছে না তো? বাসা-কারেন্ট-গ্যাসের বিল, বাজারের মোটা ব্যাগ আর চশমার পাওয়ারের সাথে সাথেই দায়িত্ব আর ব্যর্থতাগুলোকে মাউন্ট এভারেস্টের চুড়া মনে হতে থাকে। কপালের ভাঁজের চাপে মুখের হাসি হয়ে যায় ডুমুরের ফুল। ছেলে একটা ভুল করলো, দেয় ধমক! মেয়ে কথা শুনলো না, জোরসে ঝাড়ি। বউয়ের মেসেজে বাজারের লিস্ট আসে। ঘরে ঢোকার পর এটা নেই, সেটা লাগবে। আবার বেরিয়ে যাওয়া। অসুখ, বিসুখ। টেনশান। খরচ। ইনকাম নেই, খরচ বাড়ে।
বাড়ে দুরত্ব।
সবার সাথে।
জ্যোৎস্না হয়ে আসা সঙ্গিনীর সাথে।
নিজের শত আদরের ছেলেটা আর রাজকন্যার সাথে।

রাজকন্যাকে বিয়ে দিয়ে বুকের ধন হারানোর হাহাকারও বাবাকে লুকোতে হয়। বেয়ে পড়া চোখের জলটা লোকে দেখে। ভেতরের রক্তক্ষরণ?

দিন যায়।
তারপর হঠাৎ একদিন ছেলেটা এসে হাতে একটা প্যাকেট দেয়। বলে, “দেখোতো আব্বু পাঞ্জাবীটা পছন্দ হয় কি না?”

কাঁপা কাঁপা হাতে প্যাকেট খোলে মানুষটা।
মানুষটা জানেন এই প্যাকেটে পাঞ্জাবী নেই। আছে ভালোবাসা। তাঁকে জড়িয়ে ধরার জন্যে তাঁর গায়ের মাপে একটা সফেদ ভালোবাসা। আবেগে ঠোঁট কেঁপে যায় মানুষটার। ছেলেটার আগ্রহ নিয়ে তাকিয়ে থাকা মুখখানা বড্ড দেখতে ইচ্ছে করে। চোখের বেয়াদপ আর অবাধ্য নোনতা স্পর্শের ভার আজ তাঁর চোখ নিচু করে দেয়।

পাথর পিতার গম্ভীর মুখ ফুটে শুধু অনেক কষ্টে কয়েকটা শব্দ বেরিয়ে আসে,
“সুন্দর হইসে। আল্লাহ তোকে আরো অনেক বড় করুক।”

মধ্যবিত্ত পাথর পিতার মধ্যবিত্ত ছেলে বেরিয়ে যায় বাইরে।
আকাশে ঐ দু’টো উঁচু চোখ কি কেবলই নীল খুঁজে?
নাকি চোখে ভাসা কাপুরুষতার তারল্যটুকু শুধু উপরের পরম করুণাময় স্রস্টা ছাড়া আর কাউকে না দেখানোর তীব্র কোন প্রতিজ্ঞা করেছে সে?

এর উত্তর না হয় শুধু ছেলেরাই জানুক।

আর প্রিয় বাবার জন্যে সালাতের দু’আতে প্রাণ হতে বেরিয়ে আসুক,

رَّبِّ ارْحَمْهُمَا كَمَا رَبَّيَانِى صَغِيرًا
উচ্চারণঃ রাব্বির হাম হুমা কামা রাব্বায়ানি সাগীরা

“My Lord! Bestow on them Your mercy as they did bring me up when I was young.”

———————–
রাত তিনটা।
মুহাররামের ২ তারিখ।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হিজরাতের ১৪৩৬ বছর পর।

Posted in Uncategorized | Leave a comment